বাংলাদেশ, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ | সময়:
admin
২২ জুলাই ২০২৩, ৭:৫২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

শ্যামনগরে কমছে কৃষি জমি, যে প্রভাব পড়তে পারে পরিবেশ-প্রকৃতিতে

বিলাল হোসেন: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দিনের পর দিন কমছে কৃষি জমি। এতে কৃষি উৎপাদনে টান পড়ছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে কৃষি জমি অকৃষিখাতে চলে গেলে ধীরে ধীরে খাদ্য নিরাপত্তাও সংকোচিত হবে। কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষি জমি রক্ষায় কারোরই তেমন মনোযোগ নেই। আর এ কারণেই কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে।

সরকারের কৃষি বান্ধব নীতির কারণে অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় উৎপাদন বাড়লেও কৃষি জমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও রক্ষায় সংশ্লিষ্টরা একেবারেই নির্বিকার। ফলে আহারের যোগান হয় যে জমি থেকে, সেই কৃষি জমি বহুবিধ কারণে কমে যাচ্ছে। যা মানবজাতির জন্য হুমকি স্বরূপ।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, শ্যামনগরের নদী ভাঙন ও অপরিকল্পিতভাবে লবণ পানি প্রবেশ করিয়ে মাছ চাষ, নগরায়ণ, যত্রতত্র অবকাঠামো নির্মাণ, কাঁকড়ার প্রজেক্ট গড়ে তোলা, ইটভাটা, কল-কারখানা স্থাপন, কৃষিজমিতে রিসোর্ট নির্মাণসহ নানা কারণে কমে যাচ্ছে কৃষি জমি। সবুজের সমাহারের আড়ালে উঠছে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো। যে রাস্তার দুই পাশে একসময় দেখা গেছে কেবলই ফসলের ক্ষেত, সেখানে এখন লবণ পানির মৎস্য ঘের, দোকান পাট, পাকা ঘরবাড়ি। অনেক জায়গাতেই চিরচেনা ফসলের ক্ষেত আড়াল করে ফেলছে নতুন নতুন বসতি। এদিকে, প্রতিবছরই রাস্তা-ঘাটের উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মতে, ১৯৮০ সালে দেশে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল মোট জমির ৬৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। তা কমতে কমতে ২০১৯ সালে এসে ৫৯ দশমিক ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ৩৯ বছরে কমেছে ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ।

আর ভূমি জরিপ বিভাগের তথ্য মতে, ১৯৭১ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১৭ লাখ হেক্টর। ২০০৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭০ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টরে। গত ৩২ বছরে আবাদি জমি কমেছে ১ কোটি ৪৬ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর। পরের ১৮ বছরে এর পরিমাণ আরও কমেছে।

শ্যামনগর উপজেলা ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে ৬টি ইউনিয়ন নদী ও সুন্দরবন বৈষ্টিত। এই ইউনিয়নগুলোতে কৃষিজমি তুলনামূলক বেশি থাকলেও সময় পরিক্রমায় কমে যাচ্ছে অধিক হারে।

জানা গেছে, শ্যামনগরে জলবায়ু পরিবর্তন ও নদী ভাঙনের কারণে সব চেয়ে বেশি কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে। নদী ভাঙনের ফলে পানি আটকাতে রিং বাঁধ দেওয়ায় শত শত বিঘা কৃষি জমি নদীতে চলে যাচ্ছে। এছাড়া অনেকে অধিক লাভের আশায় কৃষি কাজ বাদ দিয়ে লবণ পানির মাছ চাষ করছে।

১০ বছরে আগে শ্যামনগরে কৃষি জমির পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৭৩০ হেক্টর। বর্তমানে কৃষি জমির পরিমাণ কমে দাড়িয়েছে ১৭ হাজার ৫৩৯ হেক্টরে। এ উপজেলাতে প্রতি বছর ১% হারে কৃষি জমি কমছে। তবে উপকূলবর্তী ইউনিয়নগুলোতে কমছে ১.৫% হারে। এর কারণ প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে নদী ভাঙন ও অপরিকল্পিতভাবে লোকালয়ে লবণ পানি প্রবেশ।

শ্যামনগরে কৃষি জমি কমে যাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনে ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বৃক্ষরাজিসহ প্রাণবৈচিত্র্য কমে গেছে। দিন দিন এলাকায় বেকার সমস্যা বাড়ছে। মানুষ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছে কাজের সন্ধানে। এ কারণে অনেককে দুর্ঘটনারও শিকার হতে হচ্ছে। সম্প্রতি শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ও গাবুরা ইউনিয়নের ৪ জন কৃষক মাদারিপুর থেকে ধান কেটে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পর্যন্ত হয়েছে।

গাবুরা গ্রামের মামুন শেখ (৬৫) বলেন, ১৫-২০ বছর আগে এত ঘের ছিল না। তখন মানুষ ধান চাষ করতো। ১ বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে শ্রমিক লাগতো ৬-৭ জন। আর এখন ১০ বিঘা জমির ঘেরে শ্রমিক লাগে ১ জন। বাকি মানুষগুলো আর কাজ পায় না। এ কারণে মানুষ কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ গ্রামের কৃষক জামাল হোসেন (৫০) জানান, এখান থেকে ১০ বছর আগে এলাকায় যেসব বৃক্ষরাজি ও সবজি দেখা যেত, সেগুলো এখন কম দেখা যায়। যেমন আম গাছ, শিষ্ট ফুল গাছ, কাঁথা শাক, কলমি শাক, আদাবরণ শাক- এ ধরণের সবজি আর দেখা যায় না।

ধানখালি গ্রামের কৃষক দেবাশীষ মন্ডল (৬০) বলেন, বর্ষা শুরু হলে যখন ধান লাগানোর সময় আসতো তখন বিলে গেলে কৈ মাছ, শোল মাছ, শিং মাছ এগুলো পাওয়া যেত। কিন্তু এখন আর চোখে পড়ে না। এছাড়া জোঁক, শামুক তো একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান শ্যামনগর উপকূলের কৃষি নিয়ে তার গবেষণায় উল্লেখ করেন, বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় এবং তার সাথে সম্পর্কিত ঝড়ের প্রবলতা দেখা যায় এবং এলাকাগুলো লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হয়। ১৮৭৭ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১৫৪ টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল। যার মধ্যে অনেকগুলি ঝড়ে জলোচ্ছ্বাস অন্তর্ভুক্ত যা ৭ মিটারের বেশি অভ্যন্তরীণ ছিল। অতি সম্প্রতি ২০০০-২০২০ সালের মধ্যে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং এর সাথে সম্পর্কিত ঝড়-বৃষ্টিসহ আটটি বড় ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, যা প্রায় ৩.৪৫ মিলিয়ন মানুষকে প্রভাবিত করেছে। আনুমানিক ৩৭% আবাদযোগ্য সমুদ্র উপকূলীয় জমি এই ঢেউয়ের কারণে লবণাক্ততা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। অধিকন্তু, উপকূলের এই আবাদযোগ্য জমির ১.০২ মিলিয়ন হেক্টর (প্রায় ৭০%) সাধারণভাবে মাটির লবণাক্ততার বিভিন্ন মাত্রা দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই পরিস্থিতিতে ২০ মিলিয়নেরও বেশি লোক খাদ্য এবং জলের সম্পদের মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণের ক্ষতিকারক প্রভাবের শিকার হতে পারে।

উপকূলে চিংড়ি ও চিংড়ি চাষ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এই খামারগুলি লবণাক্ততা বাড়াতে পারে, বিশেষ করে দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকায়। কৃষকরা তাদের জমিতে লবণাক্ত জলাশয়ে চিংড়ি চাষ করে যা ভূগর্ভস্থ পানি এবং মাটির লবণাক্ততায় অবদান রাখতে পারে।

শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, কৃষি জমি রক্ষায় এখনো কোনো আইন সেভাবে চালু করা হয়নি। তবে কিছুটা বিধি বিধান রয়েছে। যদি সরকারিভাবে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, শুধুমাত্র তাহলেই কৃষি জমি রক্ষা পাবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশসহ ১৪ দেশ নিয়ে সৌদির নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট

তালায় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জি.এম আব্দুল আলীর স্মরণসভা

কয়রায় দুই বেকারিকে জরিমানা

কালিগঞ্জের উত্তর শ্রীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চুরি

সুন্দরবন বাজারে মাদকবিরোধী আলোচনা

কপোতাক্ষ তীরের উপকূল রক্ষা বাধে ভাঙন, ঝুঁকিতে জনপদ

সাতক্ষীরা পৌরসভা: ঠিকাদারের চরম অবহেলা, বাঁশে দাড়িয়ে আছে প্রাচীর, দুর্ঘটনার শংকা

ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশু-কিশোরদের ৫৩% যৌন হয়রানির শিকার

জুলাইবিরোধী অবস্থান: ঢাবির ৬ অধ্যাপককে ‘অব্যাহতি’, সাদেকা হালিম বরখাস্ত

দেবহাটায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে যুগ্মসচিব আশরাফুল আলম

১০

নওয়াপাড়াকে শিশুশ্রম ও শিক্ষাবঞ্চিতমুক্ত ইউনিয়ন ঘোষণা

১১

রতনপুরে স্থানীয়দের সাথে এমপি রবিউল বাশারের মতবিনিময়

১২

সাতক্ষীরা সাংবাদিক ইউনিয়নের কমিটি গঠন: মহিদার সভাপতি, মোশাররফ সম্পাদক

১৩

শার্শায় ইউপি সদস্য ও আ’লীগ নেতা নাসির উদ্দীন গ্রেপ্তার

১৪

তালায় দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ক রচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা

১৫

তালায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা

১৬

নিখোঁজ ব্যবসায়ী হাকিমের সন্ধান চায় পরিবার

১৭

কয়রায় বীজ বাড়ির উপকরণ বিতরণ ও অনুদানের চেক হস্তান্তর

১৮

আজ ঢাকায় আসছেন ট্রা‌ম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গর

১৯

সাগরপথে ইতালি ও গ্রীসে যাওয়ার শীর্ষে বাংলাদেশ

২০
error: Content is protected !!