বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ | সময়:
admin
১৯ জুন ২০২৪, ৩:০৮ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

মানুষ আলাউদ্দীন

শেখ আজহার হোসেন

স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই রক্ত ঝরা দিনগুলিতে অকুতোভয় সৈনিক স. ম আলাউদ্দীন এর শরীরে হানাদার বাহিনীর বুলেটের স্পর্শ লাগেনি। স্বাধীনতার ২৫ বছর পর তার নিজস্ব পত্রিকা অফিসে কর্মরত অবস্থায় ১৯ জুন ’৯৬ তারিখ রাত ১০টা ২৩ মিনিটে একটি বুলেট তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে। ’৭১ এর প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য স. ম আলাউদ্দীন ইচ্ছা করলে সরাসরি যুদ্ধ না করেও অন্যভাবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ রেখেছেন শ্রেষ্ঠ মানসিকতার। সুবিধাবাদিতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি রণাঙ্গনের সাহসী যোদ্ধা হিসাবে ইতিহাসে যেমন স্থান করে নিয়েছেন, তেমনি রেখে গেছেন মানবিক গুণাবলীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বহুবিধ প্রতিভার অধিকারী, তুলনাহীন মানবিক গুণে সমুজ্জ্বল স. ম আলাউদ্দীন ব্যবহারিক জীবনের সর্বক্ষেত্রেই যে বিবেক দ্বারা পরিচালিত হতেন তার উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। মানুষ আলাউদ্দীন তার ব্যক্তিগত জীবনকে সম্পূর্ণভাবে মানবিক মূল্যবোধে পরিচালনা করতেন। তিনি তার ভাইবোনদের সবার বড় হিসাবে পিতার মৃত্যুর পর পিতার দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিবেশীদের সাথে তার ব্যবহার ছিল যেমন মধুর তেমনি দায়িত্বশীল। তিনি তার ফ্যাক্টরিতে কর্মচারী নিয়োগদানের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দুখী মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে তার প্রমাণ রেখেছেন। প্রমাণ করেছেন তার গ্রামেই শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ পেশাভিত্তিক স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তাইতো আমরা দেখলাম তাকে হত্যার পর তার প্রতিবেশীদের হৃদয় ছেড়া আহাজারি, দেখলাম প্রতিশোধের দৃঢ়তায় তাদের আপোষহীন ভূমিকা। সুনির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক আদর্শ তার মধ্যে থাকলেও তিনি তার প্রতিবেশী, তার এলাকার মানুষকে কখনো দলীয়ভাবে দেখেননি। দেখেছেন প্রতিবেশী হিসেবে, মানুষ হিসেবে। দলীয় চেতনার চেয়ে মানবিক চেতনায় তিনি জীবনকে পরিচালিত করতে পেরেছেন বলে তাঁকে হত্যার প্রতিবাদে দলীয় ভূমিকার চেয়ে সর্বদলীয় ভূমিকা প্রাধান্য বিস্তার করেছে। গড়ে উঠেছে সম্মিলিত জনতার ঐক্য।

দেশ স্বাধীনের কয়েক বছর পর থেকে তিনি সপরিবারে আমাদের পাড়াতে এসে প্রথমে ভাড়া বাড়িতে, পরে নিজস্ব বাড়ি করে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিবেশী হিসাবে আমি তাঁর দায়িত্বশীলতার যে পরিচয় পেয়েছি তা আমাকে শুধু অভিভূত করেনি চিরকাল স্মরণে থাকবে বলে আশা করি। বিভিন্নমুখী কাজের সাথে জড়িত এই মানুষটির জীবনে সময়ের যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা থাকলেও তিনি প্রতিবেশীদের সমস্যা সমাধানে সব সময়ই অগ্রণী ছিলেন। নিজের অনেক প্রয়োজনীয় কাজ বাদ দিয়ে প্রতিবেশীদের জন্য সময় দিতে, তাদের জন্য বিভিন্ন কাজে দৌড়াতে আমরা দেখেছি। প্রতিবেশীদের সাথে ব্যবহারে তাকে কখনো ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ করতে দেখিনি। বরং তিনি গরীব প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আন্তরিক ছিলেন। সদা হাসি খুশি চালচলনে সাদাসিধা এই মানুষটির মধ্যে কখনো দেমাগ দেখিনি। সবার সাথে আন্তরিক ব্যবহার করাই ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এলাকার প্রতিটি কর্মকা-ে তিনি তার নির্দিষ্ট ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে কৃপণতা প্রদর্শন করেছেন এমন কখনো আমরা দেখিনি। সৎ পরামর্শ দেওয়া ছাড়া অসৎ পরামর্শ তিনি কাউকে দিয়েছেন এমন নজিরও আমরা পাইনি। কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর আদর্শ, তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার তিনি নিজ কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে গেছেন। অনন্য সাধারণ দেশ প্রেমিক, সাহসী প্রতিবাদী মানুষ স. ম আলাউদ্দীন ছিলেন অত্যাচারী কায়েমী স্বার্থবাদিতার শত্রু। শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁর চেয়ে সাহসী ভূমিকা রাখতে আমি খুব কম লোককে দেখেছি। নিপীড়িত মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু আর অত্যাচারীদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলেন স. ম আলাউদ্দীন। তাইতো তাঁকে অসময়ে হারিয়ে যেতে হয়েছে। নিষ্ঠুর ঘাতকেরা সময়ের চাহিদা পূরণের আগেই তাঁকে হত্যা করেছে। অনেক পরিচয়ে আলাউদ্দীন ভাইয়ের পরিচিতি থাকলেও আমার দৃষ্টিতে তার পরিচয় মানুষ আলাউদ্দীন হিসাবে। সময়ের সবচেয়ে সাহসী প্রতিবাদী মানুষ হিসাবে।

লেখক : সভাপতি, সাতক্ষীরা জেলা জাতীয় পার্টি ও প্রাক্তন সভাপতি, সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স

(তানজির কচি সম্পাদিত স্মারকগ্রন্থ দীপ্ত আলাউদ্দীন থেকে উদ্ধৃত)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গাছে গাছে পেরেক ঠুকে প্রচারপত্র, দেখবে কে?

দৃষ্টিপাত সম্পাদকের মৃত্যুতে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের শোক

২০৩০-এ বিশ্বের ৩২তম অর্থনীতি হবে বাংলাদেশ: আইএমএফ

নেপালে নিহত বেড়ে ৫৪৭, এখনো ৫১৭ বিদেশি নিখোঁজ

বীর উত্তম সি.আর দত্ত ও রঞ্জন কর্মকারের স্মরণসভা

জানুয়ারিতে বাংলাদেশে আসতে পারে ভারত

দৃষ্টিপাত সম্পাদক জিএম নুর ইসলামের মৃত্যুতে জাতীয় পার্টির শোক

বেতনা তীরে ০৭০৯’র বৃক্ষরোপণ, নদী ও পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার

হাম উপসর্গে পাঁচজনের মৃত্যু, নতুন রোগী ১১৭০

দেবহাটায় যাত্রীবাহী বাসের সাথে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, মৎস্য ব্যবসায়ী নিহত

১০

সাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা

১১

শার্শা সীমান্তে বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগজিন উদ্ধার

১২

চাঁপাইনবাবগঞ্জে নদীতে ডুবে ৫ শিশুর মৃত্যু

১৩

গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন দৈনিক দৃষ্টিপাত সম্পাদক নুর ইসলাম

১৪

সাতক্ষীরার দায়িত্ব পেলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান

১৫

এখন জামিন চাই না, বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই: ট্রাইব্যুনালে দীপু মনি

১৬

সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল: সিইসি

১৭

সালিশে পুলিশের উপস্থিতিতে হত্যার হুমকির অভিযোগ

১৮

কালিগঞ্জে গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধ ও খামারিদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে উঠান বৈঠক

১৯

কালিগঞ্জে সার ব্যবস্থাপনা আইন লঙ্ঘনে জরিমানা

২০
error: Content is protected !!