বাংলাদেশ, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
admin
২০ জুন ২০২৪, ১২:৫৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

একজন সমাজ সংস্কারক

বদিয়ার রহমান

লেখাটা কীভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছিলাম না-সেই চিন্তা থেকে আমাকে উদ্ধার করলেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা লায়লা পারভীন সেঁজুতি। সেঁজুতি আপা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর বাবাকে নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে লেখা একটি বাক্য আমাকে খুব আকর্ষণ করেছে। আপার বাবা ঘাতকদের হাতে শহিদ হওয়ার আগে তাঁর উত্তরসূরীদের বলেছিলেন, মৃত্যুর আগে তাঁর সবকিছু দান করে যাবেন।

যে মানুষটি এমন ‘কঠিন’ কথা সহজ-সরলভাবে বলতে পারেন; তাঁকে নিয়ে লেখার মতো যোগ্যতা কিংবা সাহস কোনোটাই আমার আছে বলে মনে করি না। তারপরও তাঁকে নিয়ে লেখার দুঃসাহস দেখাতে হচ্ছে। সেজন্যে কোনো ভুলভ্রান্তি হলে সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন বলে আশা করছি।

লায়লা পারভীন সেঁজুতি আপার নাম পড়ে পাঠক এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন- আমি কাকে নিয়ে লেখার দুঃসাহসের কথা বলছিলাম। তিনি আর কেউ নন; তিনি হলেন শহিদ স. ম আলাউদ্দীন। আমাদের সেঁজুতি আপার বাবা।

স. ম আলাউদ্দীন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মিঠাবাড়ী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্র জীবনে তিনি ছাত্রলীগ এবং পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। শিক্ষিত মেধাবী এ তরুণ শিক্ষকতার মতো মহান পেশা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। যদিও পরবর্তীতে তিনি ব্যবসাকে পেশা হিসেবে বেঁচে নিয়েছিলেন। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ফলশ্রুতিতে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের রোষানলে পড়ে সামরিক দণ্ডে দণ্ডিত হতে হয় তাঁকে।

রাজনৈতিক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে স. ম আলাউদ্দীন ১৯৭০ এর নির্বাচনে সর্বকনিষ্ঠ গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপরে অস্ত্র হাতে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে জাসদে যোগ দেন। পরে আবারও আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন তিনি। এর আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরে খন্দকার মোশতাক নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মুখে ১৯৭৬ সালে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন তিনি।

স. ম আলাউদ্দীন কেবল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কিংবা রাজনীতিবিদই ছিলেন না। তিনি একজন সমাজ সংস্কারক, সাংবাদিক এবং সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ছিল মেহনতি মানুষের কল্যাণ, সাতক্ষীরার উন্নয়ন আর সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগকে তৃণমূলে আরও শক্তিশালী করা। এজন্য তিনি জেলার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াতেন।

স. ম আলাউদ্দীন বিশ্বাস করতেন, সাতক্ষীরার উন্নয়ন করতে হলে তরুণ প্রজন্মকে কারিগরি শিক্ষায় গড়ে তুলতে হবে। বেকারত্ব ঘোচাতে হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এজন্য তিনি ভোমরা স্থলবন্দর প্রতিষ্ঠা করেন। গড়ে তোলেন একাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানও। প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও দৈনিক পত্রদূত পত্রিকা। এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন তিনি। যদিও উনার সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। কারণ আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি হয় অধুনালুপ্ত দৈনিক সাতক্ষীরা চিত্র পত্রিকায়।

যদিও এক সময় আমার সৌভাগ্য হয়েছিল স. ম আলাউদ্দীনের হাতে গড়া দৈনিক পত্রদূত পত্রিকায় কাজ করার। তখন পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন আবুল কালাম আজাদ ভাই। মাস তিনেক হবে আমি বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলাম। তখন পত্রিকাটির কার্যালয় ছিল শহিদ নাজমুল সরণির খান মার্কেটের তৃতীয় তলায়। আর স. ম আলাউদ্দীনের সম্পাদনায় যখন পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো, তখন কার্যালয় ছিল শহিদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের সামনে।

১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে স. ম আলাউদ্দীনের দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ১৯ জুন রাতে কয়েকটি গোলোযোগ পূর্ণ নির্বাচনী এলাকার ভোটের ফলাফল নিজ পত্রিকা দৈনিক পত্রদূত অফিসে বসে টেলিভিশনে শুনছিলেন। সেদিন ছিল আষাঢ়ের বৃষ্টিমূখর রাত, ঘাতকের বুলেটের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বুলেট স. ম আলাউদ্দীনের বুক ভেদ করতে পারেনি। কিন্তু ঘাতকরা তাকে গুলি করে হত্যা করল। এরমধ্য দিয়ে ঘাতকরা তাদের স্বার্থসিদ্ধ করলেও সাতক্ষীরাবাসী হারায় একজন অভিভাবককে। একজন প্রাণপ্রিয় নেতাকে।

লেখাটি শুরু করেছিলাম সেঁজুতি আপার সামাজিক মাধ্যমে দেয়া একটি স্ট্যাটাসের বাক্য ধরে। তাই শেষও করছি তাঁর স্ট্যাটাসের লেখা দিয়ে। সেদিন সেঁজুতি আপা তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লিখেছিলেন, ‘আমরা পাঁচ বোন হওয়াতে আমার ‘মা’ আব্বাকে প্রায়ই বলতেন, তোমার এতগুলা মেয়ে, ওদের বিয়ের সময় কত টাকা লাগবে তোমার ধারণা আছে, কিছু ডিপোজিট তো করতে পারো। আব্বা তাঁর স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলতেন, ওদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করবো, ওরা নিজের পায়ে দাঁড়াবে এটাই হবে ওদের সম্পদ, আর কী চাই? মৃত্যুর আগে আমার সবকিছু দান করে যাবো।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘আব্বা তাঁর সব কাজ শেষ করবার আগেই একদিন হুট করে চলে গেলেন, ঠিক চলে গেলেন না বলে, বলা যায়, তাঁকে চলে যেতে বাধ্য করা হলো। এখন বুঝি কেন আব্বা ওভাবে বলতেন। এখন আমরাও চেষ্টা করি আমাদের বাচ্চাদের এমনি আদর্শ নিয়ে বড় করতে।’

স. ম আলাউদ্দীন অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করতেন। তিনি মানুষের সুখে দুঃখে সঙ্গী হতেন। নিরহংকার এই মানুষটিকে সাতক্ষীরাবাসী হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন। আপন করে নিয়েছিলেন তাঁকে। তাই তো তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তাঁর রেখে যাওয়া কর্মযজ্ঞের মধ্যে।

লেখক : সহকারী বার্তা সম্পাদক, বৈশাখী টেলিভিশন, ঢাকা

(তানজির কচি সম্পাদিত ও ম্যানগ্রোভ প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থ দীপ্ত আলাউদ্দীন থেকে উদ্ধৃত)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কালিগঞ্জে কাপড়ের দোকান লুট, ২৩ বস্তা মালামাল উদ্ধার

১

জবি হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার সোসাইটির সভাপতি লাবিব-সম্পাদক রাকিবুল

২

নেপালে আকস্মিক বন্যায় ভেসে গেল ৪০ বাড়ি

৩

সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা

৪

মুশফিক-শান্তর সেঞ্চুরি মিস, তবু চালকের আসনে বাংলাদেশ

৫

‘আমার কোনো সঞ্চয় নেই, মেয়েরাই আমার সঞ্চয়’

৬

মাটির কন্যারা জাগলে সহনশীল হবে আগামী || মো: মামুন হাসান

৭

কালিগঞ্জে ড্রিংকিং ওয়াটার প্ল্যান্ট মালিক সমিতির সাধারণ সভা

৮

বাংলাদেশ জাসদ সাতক্ষীরা শাখার কাউন্সিল: ইদ্রিস সভাপতি, দিদারুল সম্পাদক

৯

আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত

১০

জবি ছাত্রী হলে চুরি

১১

জনবল সংকটে কয়রা শিক্ষা অফিসে অচলাবস্থা!

১২

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি, মুখ্যমন্ত্রী গ্রেফতার

১৩

কালিগঞ্জে সড়কের মাঝখানে কালভার্ট ভেঙে দুর্ঘটনার শংকা!

১৪

গদাইপুরের চারার কদর দেশজুড়ে

১৫

কালিগঞ্জে মণ্ডপে মণ্ডপে দুর্গোৎসবের আমেজ, আমিয়ানে ব্যতিক্রমী আয়োজন

১৬

সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

১৭

আশাশুনিতে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে পুলিশ সুপার

১৮

এসএসসি অকৃতকার্যদের ৩ মাসের মধ্যে পরীক্ষা

১৯

আশাশুনিতে ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা, বৃদ্ধ আটক

২০