বাংলাদেশ, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ | সময়:
admin
২ জানুয়ারি ২০২৪, ৮:৪৯ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

আনিসুর রহিম, স্মরণে অমলিন || আবুল কাসেম

কয়েকমাসের মধ্যে সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতা জগতের আরেক নক্ষত্র ঝরে পড়ল। গেল বছরের ২০ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার ডায়েরিখ্যাত সাংবাদিক সুভাষ চৌধুরীর মৃত্যু হয়। তার চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে অধুনালুপ্ত দৈনিক সাতক্ষীরা চিত্রের সম্পাদক আনিসুর রহিমের মৃত্যু হলো।
সাংবাদিক আনিসুর রহিমের একাধিক পরিচয় রয়েছে। তিনি একাধারে শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও নাগরিক নেতা। আনিসুর রহিমের মৃত্যু সংবাদে যত না কষ্ট পেয়েছি, তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়েছি এই ভেবে যে, মেধাবৃত্তিক উচ্চতা সম্পন্ন লোকগুলো যেভাবে চলে যাচ্ছেন, সেভাবে তরুণদের মধ্যে কেউ আসছেন না এই পেশায়। আসবেই বা কেন? না আছে আর্থিক নিরাপত্তা, না আছে সামাজিক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। তার চেয়ে যে বিষয়টি এখন মফস্বল সাংবাদিকতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা হলো পুলিশ ও আমলাদের খবরদারি। এই সংবাদ কেন আসলো, এই সাংবাদিক নিশ্চয় বিরোধী ঘরানার, এই ধরনের মানসিক পীড়নতো রয়েছেই। রয়েছে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা খাওয়ার ভয়। সম্প্রতি এক সাংবাদিককে আটকের ঘটনায় রিপোর্টের জন্য সাংবাদিক হেনস্থা কাকে বলে প্রশাসন তা বুঝিয়ে দিয়েছে চোখে আঙ্গুল দিয়ে। অথচ আনিস ভাই সত্য ও নিরপেক্ষ তথ্য পরিবেশন করে প্রশাসনকে কাঁপুনি দিয়ে ছেড়েছেন এক সময়।
মফস্বল সাংবাদিকরা এখন মোটামুটি পাঁচ ধারায় বিভক্ত। দলবাজ, দলঘেষা, ধান্দাবাজ, পেট বাঁচানো ও সংখ্যায় অল্প হলেও কিছু দলনিরপেক্ষ ও মানসম্মত সাংবাদিক। আনিস ভাই শেষোক্ত দলের লোক ছিলেন।
সাংবাদিকদের মধ্যে প্রথম জনেরা বর্তমানে সাংঘাতিক প্রভাবশালী। তবে তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমে কাজ করেন বলে আমার মনে হয় না। দ্বিতীয় জনেরা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হয়ত ক্ষমতাসীন দলকে তোষামোদ করে চলেন। তৃতীয় দলের সাংবাদিকরা প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য বিষফোঁড়া। চব্বিশ ঘণ্টা ডট কম ও রডের মতো অনিবন্ধিত আইপি ও ইউটিউব চ্যানেলের বুমসহ কমান্ডো স্টাইলে হাজির হন এরা সাধারণ মানুষের সামনে। তাদের ঠাটবাট আর মেজাজ-উত্তেজনায় প্রথমেই ভয় পেয়ে যান নিরীহ সাধারণ মানুষ। সবশেষ টাকা দিয়ে রেহাই পেতে হয় তাদের। তাদের অপরাধ হয়ত বাড়িতে প্রাইভেট পড়াচ্ছে, মেয়ের বয়স হয়ত ১৬-প্রশাসনের অনুমতি নিতে পারেনি, উঠোনে রোদ আসার জন্য হয়ত সরকারি গাছের পাতাসহ প্রশাখা কর্তন ইত্যাদি। অথচ প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করেছে বলে মনে হয় না। কারণ তারা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কখনো কিছু লেখে না। এমনকি ছোট-খাটো কর্মকর্তাদেরও তারা স্যার স্যার বলে মুখে ফেনা তুলে দেয়। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্যাপক তেল মালিশ করতে পারে তারা। এমনকি আমি এক কর্মকর্তার কাছে শুনেছি, পদস্থ কাউকে হেয় করতে এসমস্ত বাটপার সাংবাদিকদের মাঝে মাঝে তাদের দরকার হয়।
পেট বাঁচানো সাংবাদিকরা মনে করেন, সাংবাদিকতা তাদের রুটি-রুজির অবলম্বন। অহেতুক ঝামেলায় না জড়িয়ে এড়িয়ে চলায় ভালো। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ঝামেলায় রয়েছেন দলনিরপেক্ষ ও মানসম্মত কিছু সাংবাদিক। তারা না পারেন কাউকে তেল-মর্দন করতে, না পারেন বিবেকের সাথে বেঈমানী করতে। তারাই বর্তমানে বেশি লাঞ্ছিত হচ্ছেন।
আনিস ভাই কতটা উদার মানুষ ছিলেন, একটি ঘটনা উল্লেখ করলে পরিষ্কার হবে। এক সাংবাদিক সহকর্মী প্রেসক্লাবের নির্ধারিত জায়গায় ধুমপান করছিলেন। সে সময়ে হঠাৎ করে সেখানে হাজির আনিস ভাই। সাংবাদিক সহকর্মী সিগারেটটা লুকিয়ে রাখতেই তিনি বললেন, আমার সামনে সিগারেট টানলে আমাকে মান্য করা হচ্ছে না, বিষয়টি এমন নয়। শ্রদ্ধা ভেতর থেকে আসে। এরপর তাকে সিগারেটটি না লুকানোর পরামর্শ দেন তিনি। এঘটনার পর থেকে তার সম্পর্কে অন্যধরণের একটা শ্রদ্ধাবোধ কাজ করতে থাকে আমার।
বিভিন্ন নাগরিক সমস্যার বিষয়ে রিপোর্ট করতে আনিস ভাইয়ের বক্তব্য নিতে আমি খুবই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। প্রথমত, প্রত্যেকটি বিষয়ে তার অগাধ পা-িত্য ছিল। দ্বিতীয়ত, যখনই দরকার হতো, তখনই তাকে পেতাম।
আনিস ভাইয়ের মৃত্যুর খবর যখন আমার পরিবারে আলোচনা হচ্ছিল, তখন আমার বড় মেয়ে কেঁদে ফেলেছিল। একটা স্মৃতি তার মন থেকে কখনো মুছে যায়নি। সুন্দরবন ভ্রমণে আনিস ভাই শিশুদের মাতিয়ে রেখেছিলেন। এমনকি শিশুতোষ গানও গেয়েছিলেন তিনি। জনৈক সমাজবিজ্ঞানী ভালো মানুষের সংজ্ঞা দিতে যেয়ে বলেছেন, যারা শিশুদের ভালোবাসে, তারা মানবিক মানুষ, ভালো মানুষ। আনিস ভাই প্রতিষ্ঠিত কিন্ডারগার্টেনে শিশুদের সাথে তার নির্মল ও মানবিক সম্পর্ক তাকে অনন্য উচ্চতায় তুলেছে।
ফেলে আসা দিনগুলোতে আনিস ভাইয়ের স্মৃতি আমার মানসপটে ভেসে উঠলে ভাবাবেগে আক্রান্ত হই আমি। তিনি যে কলেজে শিক্ষকতা করতেন, সেটা একপর্যায়ে জাতীয়করণ হয়। রাজনীতি ও সাংবাদিকতা চালিয়ে যাবেন বলে প্রথম শ্রেণির একটি চাকরি হাসতে হাসতে ছাড়তে পারেন যিনি, তিনিই আনিস ভাই।
অন্যায় ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আনিস ভাইয়ের প্রতিবাদ ছিল সর্বক্ষণ। সমাজের অপরাধী ব্যক্তিরা প্রতিবাদী হতে পারেন না। প্রতিবাদী তারাই হন, যারা বিবেক, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন। রাজনৈতিকভাবে আনিস ভাই এগিয়ে যেতে পারেননি, হয়ত যাওয়ার চেষ্টাও করেননি। তিনি সিপিবি করতেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণও করেছেন। যারা বামদল করতেন, তাদের আদর্শ ও নির্মোহ চরিত্রের কারণে সমাজে তারা সম্মানিত ছিলেন। একটা সময় বামেরাও বুর্জোয়াদের সাথে মিশে গেল। ত্যাগের পরিবর্তে ভোগের মায়ায় পেয়ে বসল তাদের। মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতার পরিবর্তে নিজের আখের গোছানো তাদের প্রধান ব্রত হয়ে গেল। আনিস ভাই সেই ক্ষোভেই বোধ হয় সকল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে আর অগ্রসর হননি। তিনি সমাজ পরিবর্তনের জন্য বেছে নিলেন সাংবাদিকতা। এক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছিলেন।
আনিস ভাই প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন। কথা ও কাজ দিয়ে তিনি বারবার সেটা প্রমাণ করেছেন। তিনি আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। রেখে গেছেন তার প্রতিবাদী চরিত্রের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। পৃথিবী থেকে রাজা-বাদশা হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় লাখো কোটি টাকার মালিকেরা। তবে রয়ে যায়, আনিস ভাইয়ের মতো প্রতিবাদী মানুষের আপোষহীন কণ্ঠ। হয়ত ঘুনে ধরা সমাজ যখন ক্ষয়ে যাবে, এসব জনপদ যখন শ^াপদ-সংকুল অরণ্যে পরিণত হবে, আমি নিশ্চিত, বারবার ফিরে এসে কাঁপিয়ে দেবে আনিস ভাইয়ের সেই প্রতিবাদী কণ্ঠ।

লেখক: সাতক্ষীরা প্রতিনিধি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন ও আজকের পত্রিকা

সূত্র: স্মারকগ্রন্থ অনন্য আনিস

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিক-শিল্পীদের বিরুদ্ধে অভিযোগে উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি

প্রতি টনে ১০ ডলার কমে বাংলাদেশের কাছে ইউরিয়া সার বেচতে চায় রাশিয়া

জাপানে ভূমিকম্পে ধসে পড়েছে শপিংমল, বহু হতাহতের শঙ্কা

৯ বছরের ছোট ক্রিকেটারের সঙ্গে প্রেম করছেন ম্রুণাল?

কালিগঞ্জ উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক কমিটির সভা

কালিগঞ্জে সঞ্জীব সরকার হত্যা: ধরাছোয়ার বাইরে মূল আসামিরা

জুলাই পদযাত্রায় হামলা, সারজিস-পাটওয়ারী আহত

সাতক্ষীরায় ভারী বর্ষণ ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিজিবি’র ত্রাণ বিতরণ

জাতীয় যুবনীতি হালনাগাদে মতামত দেওয়ার সুযোগ পেল তরুণরা

কোন অভিনেতার সঙ্গে রোমান্স করতে ‘সমস্যা’, জানালেন জয়া

১০

আহসান রাজীবকে সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের অভিনন্দন

১১

অতীতের কোনো সিদ্ধান্ত বদলাতে চাই না, ভুল থেকেই শিখেছি: সাকিব

১২

আলিম চেয়ারম্যানের আল্টিমেটামে নড়ে চড়ে বসেছে শৈলকুর বিলের মৎস্য ঘের মালিকরা

১৩

দ. আফ্রিকায় আগুনে ৬ বাংলাদেশি নিহত

১৪

শ্যামনগরে মাদকসহ যুবলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আটক

১৫

জরুরি সতর্কবার্তা দিল পুলিশ

১৬

কয়রায় জলবায়ু সংকটে কিশোরীদের সুরক্ষায় আমাল ফাউন্ডেশনের ব্যতিক্রম কর্মসূচি

১৭

উপকূলের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে ১০ লক্ষ বীজ রোপণ কর্মসূচি উদ্বোধন

১৮

শ্যামনগরে নিরাপদ পানীয় জল সংরক্ষণ ও প্লাস্টিক দূষণ হ্রাসে মেটে বিতরণ

১৯

এনটিআরসিএ’র মৌখিক পরীক্ষা দ্রুত নেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি

২০
error: Content is protected !!