বাংলাদেশ, রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
admin
৪ এপ্রিল ২০২৩, ৮:০৫ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

মফঃস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ || আবদুল ওয়াজেদ কচি

সুভাষ চৌধুরী। সাতক্ষীরার একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক, জীবন্ত কিংবদন্তী। আমৃত্যু সাংবাদিকতা করা এই মানুষটি কখনও সহকর্মী, কখনও বন্ধু, কখনও অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আগলে রাখতেন আমাদের। সাংবাদিকতায় তার কাছে সহযোগিতা চেয়ে পাননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি বিপরীত মেরুতে থাকা বন্ধুদেরও কখনো বিমুখ করেননি তিনি।
ব্যক্তিগত কর্মজীবনে সুদীর্ঘকাল শিক্ষকতা করলেও সাংবাদিকতায় তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। সংবাদ পাঠানোর ক্ষেত্রে ডাক, টেলিগ্রাম, ফ্যাক্স, ই-মেইল; যুগ সন্ধিক্ষণের কোনো কালই তাকে আটকাতে পারেনি। বরং অত্যন্ত আধুনিক মনমানসিকতা নিয়ে নিজেকে খাপ খাইয়েছেন সবমাধ্যমেই। যেখানে তার সমসাময়িককালের অনেকেই ঝরে পড়েছেন আধুনিক তথ্য প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময়ই সাদা কাগজে হাতে কলমে নিউজ লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এজন্য ডাক ও ফ্যাক্সে নিউজ পাঠানোর মাধ্যমই আমার কাছে সবচেয়ে উপযোগী মাধ্যম ছিল। কিন্তু প্রিয় সুভাষ দা ডাক, টেলিগ্রাম, ফ্যাক্স, ই মেইল; সবক্ষেত্রেই নিজেকে খাপ খাওয়াতে সক্ষম হয়েছেন। জীবনের শেষ সময়েও ছুটেছেন সংবাদের পেছনে, টগবগে তরুণ রূপে। সাংবাদিকতায় কখনও তিনি অন্যের উপর নির্ভর হয়ে থাকেননি। ছোট-বড় সহকর্মীদের সহযোগিতা করার পাশাপাশি নিজের বৃদ্ধ বয়সেও আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিয়েছেন, আমি কেমন আছি জানতে চেয়েছেন। ভাবটি এমনই যে, আমার অভিভাবক আমার খোঁজ নিচ্ছেন।
সুভাষ দা এমনই একজন মানুষ ছিলেন, যাকে উপর থেকে দেখলে মনে হতো গম্ভীর প্রকৃতির। কিন্তু তার সাথে না মিশলে বোঝা যাবে না যে, তিনি কতটা সরল ও উদার মনের অধিকারী। মানুষকে প্রাপ্য সম্মানও দিতে জানতে তিনি। নিজেকে কখনও বড় করে জাহির করেননি, যার যে সম্মান তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি ছোটরাও তার পরম স্নেহ পেয়েছেন সবসময়।
ছোট বলতে তার থেকে দু’চার বছরের কম বয়সী তা নয়, সাংবাদিকতায় আসা নতুন যে কেউ, আমাদের ক্যামেরাম্যানরা বা তার ছেলের বয়সীরাও। এক্ষেত্রে সুভাষ দাকে ব্যতিক্রম বলতেই হয়, কেননা আমি নিজেও এতোটা উদার মনোভাব কখনো প্রকাশ করতে পারিনি, আমার অন্যান্য সহকর্মীরা তো দূরে থাক। যাদের সাংবাদিকতায় আগ্রহ আছে, যারা সাংবাদিকতায় আন্তরিক তারা সুভাষ দার সহযোগিতা, স্নেহ, সম্মান ও ভালবাসা পেয়েছে। কিন্তু যারা ‘নামধারী’ সাংবাদিক, সুভাষ দা তাদের কখনই পছন্দ করতেন না। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, যারা সাংবাদিক পরিচয় দেবে- তাদের প্রকৃত সাংবাদিকতা চর্চা করা উচিত। অন্যথায় তার সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া উচিত নয়।
সুভাষ দা কে নিয়ে লিখলে দিন মাস বছর গড়িয়ে যাবে, কিন্তু শেষ হবে না।
সাংবাদিকতাকে তিনি এতটাই হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন যে, হুমকি ধামকি জেলা কোনো কিছুই তাকে আটকে রাখতে পারেনি।
তখন তিনি দৈনিক বাংলার সাতক্ষীরা সংবাদদাতা। থাকতেন তালা উপজেলার কুমিরায়। শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতার কারণে প্রতিদিন বিকালে সাতক্ষীরায় আসতেন। বসতেন রউফ বুক ডিপোতে, দৈনিক কাফেলা অফিসে। আমিও তখন কাফেলায় বসি। তার সাথে সাংবাদিকতার নানা বিষয়ে আলোচনা হতো। সাতক্ষীরার কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে সুভাষ চৌধুরীর কাছেই যেন সংবাদটি প্রথমে আসতো। তখন পত্রিকায় তাৎক্ষণিক সংবাদ পাঠানোর একমাত্র উপায় ছিল টেলিগ্রাম। সঙ্গে সঙ্গে সুভাষ দা ইংরেজিতে সংবাদটি লিখে সোজা চলে যেতেন টেলিগ্রাম অফিসে। ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে আমাকেও সংবাদটি তৎকালীন কর্মস্থলে পাঠাতে সুভাষ দার সহযোগিতা নিতে হতো।
তখন ঢাকার দৈনিক পত্রিকা সাতক্ষীরায় আসতো একদিন পর। নিজের পাঠানো সংবাদ ছাপা হলো কিনা তা খুটেখুটে দেখতেন সুভাষ দা, আমি নিজেও। সুভাষ দা তার সব নিউজই কাটিং করে সংগ্রহে রাখতেন। এ অভ্যাস সমসাময়িক কালের অন্য কারো ছিল না, এখনও নেই।
সুভাষ চৌধুরী ছিলেন একজন মিশুক ব্যক্তি। আমরা বেশির ভাগ সময়ই একসঙ্গে থাকতাম, সুদীর্ঘকাল এক সাথে সাংবাদিকতা করেছি।
একবার আমি ও সুভাষ দা এক সঙ্গে ঢাকায় গেলাম। উঠলাম দৈনিক বাংলার অফিসে। সেখানে তৎকালীন বাংলাদেশ সংবাদিক সমিতির সভাপতি মুন্সিগঞ্জ জেলার দৈনিক বাংলার সংবাদদাতা শফি উদ্দিনের সাথে পরিচয় হলো। প্রায় ৪ ঘণ্টা সাংবাদিকতার বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হলো। শফিউদ্দিন সাংবাদিকতার বিষয়ে অনেক দিকনির্দেশনা দিলেন। চা চক্র হলো।
দিন তারিখ মনে নেই। সাতক্ষীরা জজ কোর্টের এক বিচারকের ব্যাপারে একটি সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়। তখন মামলাটি নিয়ে আমার অফিস আমার প্রতি বেশ রুষ্ট ছিল। বিষয়টি নিয়ে সুভাষ দার সাথে পরামর্শ করি এবং তাকে নিয়েই ঢাকায় আমার তৎকালীন কর্মস্থলে যাই। সুভাষ দা সংবাদটি নিয়ে সম্পাদকের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেন, ব্যাখ্যা দেন। পরে অফিস আশ^স্ত হয় এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। শুধু তথ্য আদান প্রদানে নয়, সুভাষ দা এমনিভাবেই তার সহকর্মীদের পাশে থেকেছেন সবসময়।
বস্তুনিষ্ঠতা ছিল তার সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। সেই সাথে অসংখ্য ব্যক্তিকে সাংবাদিকতা শুরু, সাংবাদিকতায় টিকে থাকা, সাংবাদিকতার কৌশল ও লিখতে শিখিয়েছেন তিনি। এসবের মধ্যদিয়ে তিনি সাংবাদিকতার শিক্ষক নয়, একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। সুভাষ চৌধুরীর মতো খ্যাতিমান ও কিংবদন্তী সাংবাদিক-এর জীবনী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। আর তাহলেই কেবল সাংবাদিকতায় তার সাহসী ও নির্ভীকতার অতুলনীয় উদাহরণ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে। ছড়িয়ে যাবে যুগ থেকে যুগান্তরে।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা। সম্পাদক, দ্য এডিটরস ও স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক ইনকিলাব

(নিবন্ধটি খ্যাতিমান সাংবাদিক সুভাষ চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ ‘সুবাসিত সুভাষ’ থেকে নেওয়া)

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মা হারালেন সাংবাদিক এম শাহীন গোলদার, সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের শোক

১

সাংবাদিক এম শাহীন গোলদারের মা আর নেই, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের শোক

২

সাতক্ষীরায় শিখো–প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি সংবর্ধনা: মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলার শপথ

৩

ঘেরের বেড়িতে গাঁজা চাষ, আটক ১

৪

দেবহাটায় পোল্ট্রি খামারে হামলা-লুটের মূলহোতা গ্রেপ্তার

৫

ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২০৮৯

৬

না জানিয়ে অন্য শহরে ভ্রমণ, বড় শাস্তি পাচ্ছেন বাংলাদেশের ৩ ক্রিকেটার

৭

এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়ল এলপিজির দাম

৮

বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দে‌বে যুক্তরাজ্যg

৯

নয় মাস পর শুটিংয়ে ফিরছেন তানিয়া বৃষ্টি

১০

এফবিআইয়ের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় বাংলাদেশি চিকিৎসক জাহিদুল

১১

ক্রীড়াবিদদের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

১২

যানজট নিরসনে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণ কাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

১৩

কোন সময় বলব আলহামদুলিল্লাহ, মাশাআল্লাহ ও বারাকাল্লাহ

১৪

সরকারি সফরে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে সেনাপ্রধানের ঢাকা ত্যাগ

১৫

বুরকিনা ফাসোকে ৭ গোলের বন্যায় ভাসাল আর্জেন্টিনা

১৬

ভারতের বিপক্ষে ব্রাজিলের ‘এক হালি’

১৭

সন্ধ্যার মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির আভাস

১৮

মধ্যরাতে তিনবার ভূমিকম্পের পর ফের কাঁপলো দেশ

১৯

সাতক্ষীরা জেলা বাকশিস নির্বাচন: খলিলুর রহমান সভাপতি, নূর মোহাম্মদ পাড় সম্পাদক

২০