বাংলাদেশ, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
admin
১ মে ২০২৪, ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

মহান মে দিবস: ন্যায্য মজুরি চান উপকূলের নারী শ্রমিকরা

সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: আজ মহান মে দিবস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকেরা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার কর্মদিবসের বিপরীতে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছিলেন। সেই আত্মদানের পথ ধরেই পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমজীবী মানুষ ন্যায্য মজুরি, অবকাশ, মানবিক আচরণ, স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। অনেক দেশেই শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টার কর্মদিবসের দাবি পূরণ হয়েছে। পাচ্ছেন শ্রম অধিকার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে উপকূলের নারী শ্রমিকরা। আজও ন্যায্য মজুরীর অধিকার থেকে বঞ্চিত তারা।

পুরুষের সমান কাজ করেও মজুরি বৈষম্যের শিকার তারা।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলীয় এলাকায় পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরা কাঁকড়ার খামার, মাছের ঘের, নদীতে রেণু আহরণ, সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরা, রাজমিস্ত্রির সহকারী, মাটিকাটা, গ্রামীণ রাস্তানির্মাণ ও সংস্কার ও কৃষিকাজ করে থাকেন। তবে তারা পান না ন্যায্য মজুরি।

উপকূলীয় এলাকায় দিনমজুরের চাহিদা অনেক বেশি। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে এই এলাকার অধিকাংশ পুরুষ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইট ভাটাসহ গ্রাম ছেড়ে শহরে কাজে চলে যান। এজন্য শ্রমিক সংকট কাটাতে এবং স্বল্প মূল্যে শ্রমিক পেতে হতদরিদ্র নারী শ্রমিকদের বেছে নেন মালিকপক্ষ। নারীদের পুরুষ শ্রমিকদের অর্ধেক মজুরি দেওয়া হয়।

নারী শ্রমিকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদে পুড়ে কাজ করেন। কিন্তু মজুরি পান অর্ধেক।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট এলাকার ধানক্ষেতে ধান কেটে মাড়াই করার কাজ করা শ্রমিকের প্রায় অর্ধেকই নারী। একজন পুরুষ শ্রমিক দৈনিক ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। একই কাজ করে একজন নারী শ্রমিক মজুরি পাচ্ছেন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সমান কাজ করেও অর্ধেক মজুরি পাওয়ায় নারী শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এ বৈষম্য লাঘবের দাবি জানিয়েছেন তারা।

সেখানে কাজ করা নারী শ্রমিক কুলসুম আক্তার বলেন, স্বামীর আয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। তাই স্বাবলম্বী হতে আমিও ধান ক্ষেতে কাজ করছি। কিন্তু পুরুষের সমান কাজ করেও দিন শেষে অর্ধেক মজুরি পাচ্ছি। এটা অত্যন্ত কষ্টের। এ মজুরি বৈষম্য নিরসন করা দরকার।

সোনাখালী গ্রামের নারী শ্রমিক সালেহা বেগম বলেন, একই সময়ে একই কাজ করে অর্ধেক মজুরি পাই। যখন মজুরি নিই তখন অনেক খারাপ লাগে।

চাষী রফিকুল ইসলাম বলেন, ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলাম। এখন ধান কাটে ঘরে তোলার সময় এসেছে। এজন্য আমরা জমিতে প্রতিদিন ৮ জন শ্রমিক কাজ করছে। পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরাও কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, পুরুষ শ্রমিকদের দৈনিক ৫৫০ টাকা এবং নারী শ্রমিকদের ৩০০ টাকা মজুরি দেই।

উপজেলার দাতিনাখালি বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের পরিচালক শেফালী বেগম। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে অধিকাংশ পুরুষ সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। আগে বছরে তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা থাকতো কিন্তু বর্তমানে ছয় মাস থাকে। সে কারণে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের কাজ করতে হয়। না হলে তাদের সংসার চলে না।

তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে অধিকাংশ নারীরা কাঁকড়া খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। কিছু নারী মাছের ঘেরে, নদীতে রেণু আহরণ, সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরা, রাস্তা সংস্কার ও কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। তাদের বাড়ির কাজ করতে হয় পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সমান বা তার চেয়ে বেশি কাজ করতে হয়। এরপরও পুরুষ যে মজুরি পায়, নারী পায় তার অর্ধেক। রাস্তা সংস্কারের কাজে একজন পুরুষ ৫০০ টাকা পেলে নারীকে দেওয়া হয় ৩০০ টাকা।

এই এলাকার অধিকাংশ নারী তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। কর্মপরিবেশ, কর্মঘণ্টা বিষয়ে অধিকাংশই জানেন না। অনেকে জানলেও কাজ হারানোর ভয়ে এ বিষয়ে মুখ খুলতে চান না। সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা সম অধিকারের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছি।

শ্যামনগর উপজেলা জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান মিসেস শাহানা হামিদ বলেন, বলেন, পুরুষের পাশাপাশি নারীও অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাদের পেছনে রেখে উন্নয়ন অগ্রযাত্রার কথা ভাবা যায় না।

তিনি আরও বলেন, নারী-পুরুষদের মজুরি বৈষম্য থাকলে নারীরা কাজে অনুৎসাহী হবেন এবং দেশ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে যাবে। তাই মজুরি বৈষম্য নিরসনে প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে।

শ্যামনগর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক বলেন, সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপকূলীয় এ এলাকায় নারী শ্রমিক বেড়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও পরিবারের উন্নয়নে এগিয়ে আসছে। তবে এখানে নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য রয়ে গেছে। নারীদের মজুরি বৈষম্য নিরসনে নারীরা যেন তাদের ন্যায্য মজুরি পায় সে বিষয়ে মালিক ও শ্রমিকদের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে সচেতনতা কার্যক্রম করা হয়। এছাড়া নারীর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনিসহ সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ নাজমুল হুদা বলেন, পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকরা মাঠে কাজ করছেন এটা ভালো লক্ষণ। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হলে নারী-পুরুষ সমানতালে এগোতে হবে। তবে কোনোভাবেই মজুরি বৈষম্য করা যাবে না। এতে নারী শ্রমিকরা কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। তবে আগের তুলনায় নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য অনেকটা কমে আসছে বলে দাবি করেন তিনি।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গুড়পুকুর মেলার বর্জ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও পৌর দীঘিতে নিঃসরণ বন্ধের দাবি

১

তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ আরও দুই অনুচ্ছেদে গণভোট চায় বিএনপি

২

ডেঙ্গুতে ৬ জনের মৃত্যু, একদিনে সর্বোচ্চ রোগী ভর্তির রেকর্ড

৩

দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি

৪

পাইকগাছা মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার বিদায় সংবর্ধনা

৫

ইউপি সদস্যের হাত ধরে পালালেন গৃহবধূ, মায়ের শোকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে অর্ক

৬

কয়রায় আ’লীগ থেকে ফেরদাউসুরের পদত্যাগ, সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন শাহিন

৭

নলতায় প্রাইম ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম উদ্বোধন

৮

কালিগঞ্জে স্বর্ণের দোকানের লকার ভেঙে সোনা-রূপা ও নগদ টাকা চুরি

৯

আন্তর্জাতিক অর্থোপেডিক কংগ্রেসে অংশ নিতে জাপান যাচ্ছেন ডা. মাহমুদুল হাসান পলাশ

১০

একদিনে হাম উপসর্গে ৯ জনের মৃত্যু

১১

শ্যামনগরে গাছ থেকে পড়ে ব্যবসায়ীর মৃত্যু

১২

বাংলাদেশ থেকে অস্কারে যাচ্ছে ‘রইদ’

১৩

সুপারিশ পেয়েও নিয়োগপত্র পাননি প্রাথমিকের ‘আড়াই হাজার’ প্রার্থী

১৪

ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ

১৫

মোংলা নদীতে ভালোবাসার ফুল ছিটিয়ে বিশ্ব নদী দিবস পালন

১৬

সুন্দরবনঘেঁষা কয়রায় পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

১৭

দারিদ্র্য বিমোচনে রোকেয়া মাইনুল আল রাহমা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ

১৮

ঢাকা পড়ছে শ্যামনগরের পর্যটন সম্ভাবনা

১৯

পর্যটন বদলে দিতে পারে সুন্দরবন নির্ভরশীল মানুষের ভাগ্য

২০