বাংলাদেশ, বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
১১ ভাদ্র ১৪৩৩ | সময়:
admin
১৯ জুন ২০২৪, ৩:১৫ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

একজন সম্পাদকের তৃতীয় নয়ন ও স. ম আলাউদ্দীন

মিজানুর রহমান

সময়টা ১৯৯৬ সালের প্রথম দিকে। দৈনিক পত্রদূত সবে সূতিকাগার থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর আলো দেখতে শুরু করেছে। লেটার প্রিন্টের ছাপাখানায় কাঠের ছোট ছোট খটুপড়ি থেকে এক একটি অক্ষর বেছে নিয়ে সেটি সাজিয়ে একটি শব্দ তৈরি আর এক একটি শব্দ সাজিয়ে একটি বাক্য গঠন করে একটি পত্রিকার পৃষ্ঠা সাজানো যে কত কঠিন ছিল সেটি বুঝতেন পত্রিকার কম্পোজিটর এবং এর সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা এডিটর। এরপর হেডলাইন তৈরি, আবার প্রয়োজনে সেটি ভেঙ্গে নতুন করে অক্ষর সাজিয়ে আবার ক্যাপশন তৈরি- এ যেন সমুদ্রতীরে বালু দিয়ে ঘর তৈরির মতো।

এখন সময় পাল্টেছে। ছাপাখানার যুগে এখন অফসেটের রাজত্ব। সংবাদ লিখতে এখন আর কাগজ কলম লাগে না। ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের মনিটরে ভেসে ওঠা শব্দ সম্ভার একবার সাজাতে পারলেই সেই লেখা দিয়ে বেরিয়ে আসে শত শত কপি। ইচ্ছা মতো কাঁটা ছেঁড়া আর পরিবর্তন করার সুযোগ আধুনিক সাংবাদিকতায় এনে দিয়েছে যুগান্তকারী বিপ্লব। এরপরও একজন পত্রিকা সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে প্রতিদিনের পত্রিকা প্রকাশনায়। আর এই ভূমিকা রাখতে সহায়তা করে সেই সম্পাদকের তৃতীয় নয়ন।

স. ম আলাউদ্দীনের সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক পত্রদূতের প্রকাশনা লগ্নে এর রিপোর্টিং ও ছাপা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সব দায়িত্ব ছিল প্রয়াত সাংবাদিক সুভাষ চৌধুরী ও আমার উপর। সকালে একদফা অফিসে বসে খবরগুলো রেকর্ড করে সেগুলো হাতে লিখে কপি করে প্রেসে পাঠানোর কাজগুলো সারতে হতো। সন্ধ্যার পরে আবার বিবিসির খবর রেকর্ড করে সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো নির্বাচন করে সেগুলো হাতে লিখে প্রেসে পাঠিয়ে প্রুফ কপি বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার পালা ছিল আমাদের। পেজ গেট আপ মেক আপ হতে সময় লাগতো রাত ১২টা থেকে ১টা। এর পর বাড়ি ফেরার পালা। মধ্য রাতেই সাতক্ষীরা থেকে পাটকেলঘাটা ফেরা ছিল নিত্যদিনের কাজ।

আলাউদ্দীন ভাই পত্রিকা অফিসে বসতেন কোনো দিন সকালে আবার সন্ধ্যায়। সন্ধ্যায় বসাটা ছিল নিয়মিত। কোনোদিন সন্ধ্যায় বসতে না পারলে দেরিতে হলেও পত্রিকার ফাইনাল প্রুফ দেখার সময় এসে হাজির হতেন জাহান প্রিন্টিং প্রেসে। কোন খবরটি ব্যানার লিড হচ্ছে সেটি দেখে তিনি বাসায় যেতেন। সেবার এফবিসিসিআই এর নির্বাচনে একটি গ্রুপ বিজয়ী হয়। আমরা যথারীতি হেডলাইন তৈরি করে প্রুফ ফাইনাল করি। আলাউদ্দীন ভাই এসে প্রুফ কপি দেখে বললেন হেডলাইন বদলাতে হবে। ডেকোরাম অনুযায়ী নাম বসেনি। একজন সম্পাদকের তৃতীয় নয়ন দিয়ে দেখা শিরোনামটি সংশোধন করে পুনরায় সাজানো হয় সেদিনের কাগজটি।

ভারত শ্রীলঙ্কার মধ্যে বিশ^কাপ ক্রিকেটের ফাইনাল খেলা চলছে। খেলা শেষ না হলে আমরা পত্রিকার লিড নিউজের হেডলাইনটি তৈরি করতে পারছি না। প্রেসের সামনে রাস্তার উপর টিভিতে খেলা দেখছি। রাত তখন সাড়ে ১২টা বাজে প্রায়। এমন সময় সেখানে এলেন আলাউদ্দীন ভাই। আমাদের অপেক্ষা দেখে তিনিও উৎফুল্ল হলেন। কম্পোজিটর মতিয়ার ভাই হাতে শব্দ সাজানোর ট্রে নিয়ে আমাদের সাথেই অপেক্ষা করছেন। খেলা শেষে বিজয়ী হয় শ্রীলঙ্কা। আমরা নিউজ শেষ করে প্রেসে দিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলে তিনিও বাসায় চলে যান।

আলাউদ্দীন ভাই শহিদ হয়েছেন ২৭ বছর। পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এখন তার কন্যা লায়লা পরভীন সেঁজুতি। লেটার প্রিন্ট থেকে পত্রিকা এখন অফসেটে প্রকাশিত হয়। পত্রিকার পরিধি, প্রচার আর গ্রাহক বেড়েছে। সাতক্ষীরায় প্রকাশিত দৈনিকগুলোর মধ্যে পত্রদূতের অবস্থান এখন অনেক মজবুত।

শহিদ স. ম আলাউদ্দীন ভাইকে একজন সাংবাদিক কাম সম্পাদক হিসাবে অনেক কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। স্কুল শিক্ষক বাবার ছাত্র হিসাবে আলাউদ্দীন ভাই এর সাথে আমার বড় ভাই ছোট ভাইয়ের মতো সম্পর্ক ছিল। ৯০ এর দশকের প্রথম দিকে দৈনিক সংবাদে কাজ করার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণমূলক রিপোর্ট করতে যেয়ে একজন সংবাদকর্মী হিসাবে আলাউদ্দীন ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। পরে এই রিপোর্টটি আগামী প্রকাশনীর একটি বইতে প্রকাশিত হয়। মূলত, পত্রদূত পত্রিকা প্রকাশনার আগে থেকে নিউ মার্কেটের দোতলায় চেম্বার অব কমার্স এর কার্যালয়ে বসে সুভাষ দা, আমি ও আরো কয়েকজন মিলে দীর্ঘ পরিকল্পনার পর সেদিনের লেটার প্রিন্টের পত্রদূত প্রকাশনা আজ একটি প্রতিষ্ঠিত দৈনিক। পত্রদূতের প্রকাশনা লগ্ন থেকে একজন সম্পাদক হিসাবে আলাউদ্দীন ভাইয়ের তৃতীয় নয়ন ছিল খুবই ধারালো।

আলাউদ্দীন ভাই হজ্বে যাওয়ার আগে একদিন সন্ধ্যায় অফিসে এসে আমাদেরকে একটি করে কলম উপহার দিয়ে আর মিষ্টি মুখ করিয়ে বলেছিলেন, হজ্ব থেকে ফিরে তিনি নিজে প্রেস কিনবেন। পত্রিকার সাইজ বড় করবেন। তার সেই ইচ্ছা তিনি পূরণ করে যেতে না পারলেও পাঠকের কাছে পত্রদূত শহিদ স. ম আলাউদ্দীনের স্বপ্নপূরণের একটি মাইল ফলক হিসেবে এখন দাঁড়িয়ে।

লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক জনকণ্ঠ, সাতক্ষীরা

(তানজির কচি সম্পাদিত স্মারকগ্রন্থ দীপ্ত আলাউদ্দীন থেকে উদ্ধৃত)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ রাজ্যেশ্বর দাস গ্রেপ্তার

সাতক্ষীরায় মানবাধিকার আইনজীবী ফোরামের ত্রৈমাসিক সভা

সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদলের আনন্দ মিছিল

কালিগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক কমিটির মাসিক সভা

দেবহাটায় যুব ও শিশু ফোরামের বার্ষিক সমাবেশ

দেবহাটায় দারুস সালাম প্রি-ক্যাডেট একাডেমির ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ

বুশরা গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রি ঠেকাতে ডিসির কাছে আমানতকারীদের আবেদন

পাইকগাছা প্রেসক্লাবসহ ২১৮ প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ

তালায় প্রতিবন্ধিতা সনাক্তকরণ জরিপ

১০

গাঁজা ও ইয়াবাসহ কালিগঞ্জ শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সম্পাদক আটক

১১

বঙ্গোপসাগরে ইঞ্জিন বিকল, ১৬ জেলেকে উদ্ধার নৌবাহিনীর

১২

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন: আইনমন্ত্রী

১৩

যৌথসভা ডেকেছে বিএনপি

১৪

গরুর মাংসের সঙ্গে কাঁচা কলা! সুস্বাদু আয়োজনেই জমছে ‘রান্না ভালো হোটেল’

১৫

২ মন্ত্রী ও ১ প্রতিমন্ত্রীর কাঁধে নতুন দায়িত্ব, প্রজ্ঞাপন জারি

১৬

হাম উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ মৃত্যু

১৭

মোটরসাইকেলপ্রেমীদের জন্য আসছে সুখবর

১৮

একরামুল হত্যা: শেখ হাসিনাসহ ৭ জনকে আত্মসমর্পণে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ

১৯

জাতীয় পতাকার আদলে পোশাক, বিতর্কে উর্বশী

২০
error: Content is protected !!