বাংলাদেশ, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ | সময়:
admin
২ জানুয়ারি ২০২৪, ৮:২০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

পাটিগণিতের হিসাব নিকাশে যেমন ছিলেন আনিসুর রহিম || অধ্যাপক এস.এ.এম আব্দুল ওয়াহেদ

চলার পথে অনেকের সাথে দেখা হয়, পরিচয় হয়। কেউ স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়, আবার অনেকে স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকে। যারা স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাকে তাদের চিরবিদায়ে আমরা ভাবি। তাদের চলে যাওয়াটা কোথাও একটা ক্ষত তৈরি করে এবং সেখান থেকে মনে হয় অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও পীড়াদায়ক।
বন্ধু আনিসুর রহিম এর না ফেরার দেশে চলে যাওয়াটা আমার কাছে খুব বেদনার। তার সাথে আমার পরিচয় একটি আড্ডার আসরে। ১৯৮৮ সালে বদলিজনিত কারণে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে যখন যোগদান করি তখন অসিত কুমার মজুমদার স্যার কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি থাকতেন দীঘির পাড়ে অধ্যক্ষের জন্য নির্ধারিত বাসভবনে এবং সেখানে প্রত্যহ একটি সান্ধ্যাকালীন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ একত্রিত হতেন। সেখানে কেউ ক্যারাম, কেউ দাবা খেলতেন। কিন্তু বেশির ভাগই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। যেহেতু আমি নতুন অতিথি তাই আমি ছিলাম নির্ভেজাল শ্রোতা। ঐ আসরে অধ্যক্ষ মহোদয় আমার সাথে আনিসুর রহিমের পরিচয় করিয়ে দেন। একই বিষয় ও একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ায় অচিরেই দুজনের মধ্যে একটি বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয় এবং যা পরবর্তীতে কোনো হোঁচট না খেয়েই অকৃত্রিমভাবে ক্রম অগ্রসরমান ছিল এবং আনিসুর রহিমের চির বিদায়ের আগ পর্যন্ত অটুট ছিল।
আমরা সবাই মানুষ হিসেবে জন্ম নিই কিন্তু সবাই সামাজিক মানুষ হতে পারিনা। কিছু মানুষ তাদের নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে নিজেকে এমনভাবে বিকশিত করে যা তাদেরকে সামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। আনিসুর রহিম সেই মানুষ যে সামাজিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। সমাজের যে কক্ষে তিনি বিচরণ করেছেন সেখানেই তিনি নিজ মহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছেন। তিনি প্রমাণ করে গেছেন- মানুষ মানুষের জন্য।
আনিসুর রহিম শিক্ষকতা করেছেন একজন সফল শিক্ষক হিসেবে। তিনি পত্রিকা সম্পাদন করেছেন একজন সফল সম্পাদক হিসেবে। তিনি নাগরিক সমাজের নেতৃত্বে দিয়েছেন একজন সফল সংগঠক হিসেবে। তিনি শিশুদের জন্য বিদ্যাপীঠ তৈরি করেছেন একজন সফল শিক্ষা অনুরাগী হিসেবে। তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে কৃষি কাজও করেছেন। বলা যায় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তিনি বিচরণ করেছেন।
আনিসুর রহিমের স্মৃতিচারণ করতে গেলে প্রতিষ্ঠানের স্মরণাপন্ন না হলে লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানটির কথা আমাদের অনেকের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে সেটি হলো- জাহান প্রিন্টিং প্রেস। এর দুজন সত্ত্বাধিকারী যথাক্রমে জলিল ভাই ও ফজলুর রহমান স্যার আমাদেরকে যেভাবে সমর্থন করতেন তা ভোলা যায় না। প্রেসের পিছনে একটি ছোট্ট ঘর ছিল, যা আমাদের বসার জন্য ছেড়ে দিয়ে ছিলেন। সেখানে প্রত্যহ একটি সান্ধ্যাকালীন আড্ডার আসর বসতো। আমরা স্কুল কলেজের শিক্ষকরা নানাবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। অধ্যক্ষ অসিত কুমার মজুমদার ছিলেন আমাদের মধ্যমনি। আনিসুর রহিম ঐ আসরের একজন বস্তুনিষ্ঠ আলোচক ছিলেন। সেখানে অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ, দর্শন, নাগরিক জীবন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। অনেকেই ভালো বলতেন। তবে, আনিসুর রহিমের বলার ধরনটা আমার ভালো লাগতো। তিনি ভালো জানতেন। ভালো বলতেন। ঐ আসরের আমি ছিলাম গুণমুগ্ধ শ্রোতা। পরবর্তীতে প্রেস সম্প্রসারিত হওয়ায় আমরা খান মার্কেটে পত্রদূত অফিসের পাশে একটিকক্ষে একত্রিত হতাম। সেখানে খেলাধূলা হতো। পবিত্র মোহন দাসের জিরো পেইন ক্লাবে আড্ডার আসর বসতো। কিন্তু তখন আসরটা আগের মতো নিয়মিত ছিল না।
মোঃ আনিসুর রহিমের বড় গুণ ছিল এই যে, তিনি বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতেন। যেহেতু তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন, কাজেই সময়ে অসময়ে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে তার কাছে কোনো সহযোগিতা চাইলে কখনো খালি হাতে ফিরিয়ে দেননি।

পৃথিবীতে আমাদের আসা যাওয়াটা পাটিগণিতের কিছু চিহ্নের (+, -, ×, ÷) হিসাব নিকাশের কারসাজি। আমরা যখন পৃথিবীতে আসি তখন যোগ (+) চিহ্ন আমাদের পৃথিবীর সাথে সংযোগ ঘটায়। এরপর আমৃত্যু গুণ (×) এবং ভাগ (÷) চিহ্ন দ্বারা আমাদের জীবনের উত্থান পতনের অধ্যায়গুলো রচিত এবং আবর্তিত হয়। জীবনের এই অধ্যায়ে আনিসুর রহিমের জীবনটা শুধু গুণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। তিনি তার বিচক্ষণ পদচারণার এই অধ্যায়ে সবার কাছে একজন গ্রহণযোগ্য মানুষ হয়ে উঠে ছিলেন। গণিতের বিয়োগ (-) চিহ্ন টি আচমকাই তাকে না ফেরার দেশে নিয়ে গেল। এটি প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের পরিণতি যা আমাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। যে কারিগর এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন তার কাছে প্রার্থনা- মোঃ আনিসুর রহিমকে তিনি যেখানেই রাখেন যেন ভালো রাখেন। আমিন।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ

সূত্র: স্মারকগ্রন্থ অনন্য আনিস

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

তালায় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জি.এম আব্দুল আলীর স্মরণসভা

কয়রায় দুই বেকারিকে জরিমানা

কালিগঞ্জের উত্তর শ্রীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চুরি

সুন্দরবন বাজারে মাদকবিরোধী আলোচনা

কপোতাক্ষ তীরের উপকূল রক্ষা বাধে ভাঙন, ঝুঁকিতে জনপদ

সাতক্ষীরা পৌরসভা: ঠিকাদারের চরম অবহেলা, বাঁশে দাড়িয়ে আছে প্রাচীর, দুর্ঘটনার শংকা

ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশু-কিশোরদের ৫৩% যৌন হয়রানির শিকার

জুলাইবিরোধী অবস্থান: ঢাবির ৬ অধ্যাপককে ‘অব্যাহতি’, সাদেকা হালিম বরখাস্ত

দেবহাটায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে যুগ্মসচিব আশরাফুল আলম

নওয়াপাড়াকে শিশুশ্রম ও শিক্ষাবঞ্চিতমুক্ত ইউনিয়ন ঘোষণা

১০

রতনপুরে স্থানীয়দের সাথে এমপি রবিউল বাশারের মতবিনিময়

১১

সাতক্ষীরা সাংবাদিক ইউনিয়নের কমিটি গঠন: মহিদার সভাপতি, মোশাররফ সম্পাদক

১২

শার্শায় ইউপি সদস্য ও আ’লীগ নেতা নাসির উদ্দীন গ্রেপ্তার

১৩

তালায় দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ক রচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা

১৪

তালায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা

১৫

নিখোঁজ ব্যবসায়ী হাকিমের সন্ধান চায় পরিবার

১৬

কয়রায় বীজ বাড়ির উপকরণ বিতরণ ও অনুদানের চেক হস্তান্তর

১৭

আজ ঢাকায় আসছেন ট্রা‌ম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গর

১৮

সাগরপথে ইতালি ও গ্রীসে যাওয়ার শীর্ষে বাংলাদেশ

১৯

বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে মিয়ানমার, জানালেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী

২০
error: Content is protected !!