বাংলাদেশ, বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
১১ ভাদ্র ১৪৩৩ | সময়:
admin
১৯ জুন ২০২৪, ২:৫৫ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

একজন ধার্মিক আলাউদ্দীন

মাওলানা আফছারউদ্দীন

যাঁর সম্পর্কে কিছু লিখবার নিয়তে কলম হাতে নিয়েছি তিনি হলেন একাধারে দৈনিক পত্রদূতের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, রাজনীতিক, আদর্শ শিক্ষক, সাংবাদিক, আদর্শ ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তা, সাতক্ষীরা জেলা শিল্প ও বণিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, বহু মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, সমাজ সেবক, ধর্মভীরু একনিষ্ঠ নামাজী প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা স. ম আলাউদ্দীন। তিনি একজন পাকা নামাজী ব্যক্তি তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমি তাকে যেভাবে দেখেছি: আমি সাতক্ষীরা থানা জামে মসজিদে প্রায় দুই যুগকাল ধরে ইমামতির দায়িত্ব পালনকালে অধিকাংশ সময়ই তাকে জামাতে শরীক হয়ে নামাজ পড়তে দেখেছি। বিশেষ করে আছর, মাগরিব ও ইশার জামাতে বেশি দেখতাম। নামাজ খুব ধীরে ধীরে পড়তেন, প্রায়ই সময় দেরি করেই মসজিদ থেকে বের হতেন। আমি তার বন্ধু বান্ধব ও পারিবারিক সূত্রে যতটুকু জানতে পেরেছি তাতে দেখা যায়, তিনি ছাত্রজীবন থেকেই নিয়মিতভাবে নামাজ আদায় করতেন। সামাজিকভাবেও তিনি সকলের কাছে একজন ধার্মিক ব্যক্তি বা নামাজী ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত। শিক্ষাঙ্গনে অবস্থানকালেও শিক্ষকবৃন্দ ছাত্রছাত্রীরা অধিকাংশই জানতো স. ম আলাউদ্দীন একজন নামাজী ব্যক্তি। সারা জেলার মধ্যে তিনি একজন নাম করা পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের একজন বিশিষ্ট নেতা ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক জনসভায় খুব বলিষ্ঠ কণ্ঠে বক্তব্য রাখতেন, যেটা শ্রোতাদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় হতো।

রাজনৈতিক জনসভায় তাকে দেখেছি, বিশেষ করে শহিদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে আওয়ামী লীগের জনসভায় স্টেজে বসে আছেন- একটু পরেই বক্তব্য রাখার জন্য তার নাম ঘোষণা করা হবে, এরই মধ্যে আছরের আযান হলো, তিনি আযান শুনে স্টেজ থেকে আস্তে আস্তে নেমে সোজা থানা মসজিদে চলে এসেছেন। অজু এস্তেঞ্জা সেরে জামাতে শরীক হয়েছেন। ধীরে ধীরে স্থিরভাবে নামাজ শেষ করে পুনরায় জনসভায় বা মিটিংয়ে উপস্থিত হতেন। মিটিং সিটিংয়ে অথবা জনসভায় হঠাৎ করে যখন ওনাকে পাওয়া যেতো না তখন যদি কোনো নামাজের ওয়াক্ত থাকতো তখন সবাই ধারণা করতো আলাউদ্দীন ভাই এখন মসজিদে, তিনি নামাজ পড়তে গিয়েছেন। তিনি মসজিদ ও নামাজ পাগল মানুষ ছিলেন।

এই ধরনের নামাজ ও মসজিদ পাগল মানুষ সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল (স.) এরশাদ করেছেন যে, আল্লাহপাক কিয়ামতের ময়দানে সাত শ্রেণির মানুষকে আরশের নিচে ছায়া দান করবেন। তন্মধ্যে এ শ্রেণির মানুষ হবে ঐ ব্যক্তি যে একবার নামাজ পড়ে মসজিদ হতে বের হয়ে পুনরায় নামাজের সময়ের অপেক্ষায় থাকে, যে ব্যক্তির মন মসজিদের সাথে টানা থাকে, এমনকি যে (পুনরায়) মসজিদে গমন করে।

মসজিদ হলো এমনই এক পবিত্র স্থান, মোমেনগণ সেখানে গিয়ে শান্তি লাভ করে। এ সম্পর্কে এক হাদিসে রাসুল করীম (স.) ফরমাইয়াছেন : মোমেন মসজিদে প্রবেশ করিয়া এমনই শান্তি লাভ করে ও আনন্দিত হয় যেমন মাছকে পানিতে ছাড়িয়া দিলে সে শান্তি লাভ করে ও আনন্দিত হয়। আর মোনাফেক মসজিদে প্রবেশ করিয়া এমনি অস্বস্তিবোধ করে এবং তাড়াতাড়ি মসজিদ হতে বের হওয়ার জন্য ছটফট করে, যেমন কোনো পাখিকে খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখিলে সে বের হওয়ার জন্য শুধু ছটফট করে। এই হাদীসে মোমেনের খাছলত বা স্বভাবের সহিত মরহুম স. ম আলাউদ্দীনের মিল পাওয়া যায়।

তিনি একজন ‘ইংরেজি শিক্ষিত’ মানুষ হলেও নামাজের জামাতের গুরুত্ব সম্পর্কে ভালোই জানতেন। বাসায় একা নামাজ পড়ার থেকে জামাতে নামাজ পড়া ২৭ গুণ সওয়াব বেশি। মসজিদে জুম্মাহর এক রাকায়াত নামাজ ৫শত রাকায়াতের সওয়াব, মসজিদে নববীতে এক রাকায়াত পঞ্চাশ হাজার রাকায়াতের সওয়াব, কাবা শরীফের মসজিদে অর্থাৎ হেরেম শরীফে এক রাকায়াত নামাজ এক লক্ষ রাকায়াত সওয়াবের সমান। এই সওয়াবগুলি অর্জন করার সৌভাগ্য লাভ করে ছিলেন স. ম আলাউদ্দীন।

তিনি ১৯৯৬ সালে হজ¦ ও ওমরাহ পালনের মধ্যদিয়ে আল্লাহর সম্মানিত মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। তিনি ঐ সময় পৃথিবীর প্রাচীনতম পুতঃ পবিত্র ঘর কাবা একাধিকবার তাওয়াফ, সাফা মারওয়ায় ‘সায়ী’, আরাফা, মোজদালেফা ও মিনায় অবস্থান, কোরবানি, মাথামু-ন, পরিশেষে বিদায়ী তাওয়াফ সমাপ্ত করে মদিনার মসজিদে নববীতে হুজুর পাক (স.) এর রওজাপাক জিয়ারত, জান্নাতুল মোয়াল্লা ও জান্নাতুল বাকিতে জিয়ারত শেষে বিশেষ বিশেষ স্থানে নামাজ আদায়সহ ৪০ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে নববীতে আদায় করে সর্বশেষে রওজা শরীফে বিদায়ী জিয়ারত শেষে দেশে ফিরে আসেন। তিনি পবিত্র হজ¦ থেকে বাড়ি এসেই প্রথম যেদিন জোহর অথবা আছর নামাজে থানা মসজিদে পাই, আমার ইমামতিতে উনি নামাজ আদায় করেন এবং আমি মোনাজাতের পর সব মুসল্লী ভাইদের বলে দেই, আলাউদ্দীন ভাই এইমাত্র হজ্ব করে ফিরে আসছেন, তার থেকে সালাম কালামের মাধ্যমে দোয়া নিন। হজ্ব থেকে ফিরে আসার ৪০ দিন পর্যন্ত হাজীদের দোয়া আল্লাহপাক স্বাভাবিকভাবে কবুল করেন। আমি গোনাহগারসহ অনেকেই ঐ দিন সুন্নত তরিকার মাধ্যমে সালাম, মোসাফাহ ও মোয়ানাকার মাধ্যমে দোয়া চেয়ে নিই।

কেন না রাসূলুল্লাহ (স.) হাজীদের জন্য আল্লাহ পাকের দরবারে দোয়া করেন এবং দেশে ফিরে আসার সময় সমস্ত হাজীদের লক্ষ্য করে উপদেশ দেন। হুজুর (স.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন : হায় আল্লাহ, হাজীদের ও হাজীগণ যাদের জন্য মাগফিরাত চায়, তাদের ক্ষমা কর। হাজীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, হে হাজীগণ। তোমাদের একান্তভাবে উপদেশ দিতেছি যে গোনাহ দ্বারা তোমাদের হজ¦ দূষিত করিও না, যেহেতু আমি ওয়াদা করেছি যে, যারা আমার কবরকে জিয়ারত করবে, আমার জন্য ওয়াজিব হবে কিয়ামতের ময়দানে তাদের জন্য শাফায়াত করা।

স. ম আলাউদ্দীন হজ্ব থেকে ফিরেই কিছুদিনের মধ্যেই আততায়ীর গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন। তিনি আমার একজন নিয়মিত মুসল্লী ছিলেন। কেননা তার পত্রদূত অফিস ছিল মসজিদের অতি নিকটে সদর থানার দক্ষিণ পাশে। শহিদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের মেইন গেটের সামনের বাড়ি, মরহুম অ্যাড. তোফাজ্জেল হোসেন সাহেবের বাড়ির নীচ তলায়। তিনি জীবনের শেষ নামাজ ইশার জামাতে পড়তে পারেননি। কারণ ঐদিন এশার নামাজের সময় প্রবল ঝড় বৃষ্টির কারণে পত্রদূত অফিস থেকে ইশার জামাতে আসতে পারেননি। সম্ভবত, অফিসের মধ্যেই নামাজ আদায় করে অফিসের কাজ করছিলেন। আনুমানিক রাত ১০টার পরপরই তিনি আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। মুহূর্তের মধ্যেই সারা শহরে শোকের ছায়া নেমে আসে। মানুষ হতবাক হয়ে চারিদিকে ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে। এক নজরে স. ম আলাউদ্দীনকে দেখার জন্যে, সবার মুখে একই কথা আলাউদ্দীন ভাই আর নেই, কে বা কারা আলাউদ্দীন ভাইকে হত্যা করল, কারা তাঁর স্ত্রীকে বিধবা করল, কারা তাঁর সন্তানদেরকে ইয়াতিম বানালো এর বিচার আল্লাহ অবশ্যই করবেন, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। যারা আলাউদ্দীন ভাইকে নামাজের জামাতে দেখতো তারা আফসোস করেছে এবং আল্লাহ পাকের দরবারে তার জন্য মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেছে।

তিনি আমাকে একজন আলেম ও ইমাম হিসেবে ভীষণ মহব্বত করতেন। আমি তাকে নামাজী ও চরিত্রবান ব্যক্তি হিসেবে শ্রদ্ধা করতাম। তাঁর সাথে আমার দ্বীনি সম্পর্কই বেশি ছিল। এ সম্পর্কে রাসুল (স.) এরশাদ করেছেন : হযরত আবু হুরায়রা (র.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (স.) বলেছেন, দুই ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ মহীয়ান গরীয়ানের উদ্দেশ্যে একে অপরকে ভালোবাসে, তন্মধ্যে একজন প্রাচ্যে বাস করে এবং অপরজন পাশ্চাত্যে বাস করে, আল্লাহপাক তাদের উভয়কে কিয়ামতের দিন একত্র করে বলবেন যে, এই সে ব্যক্তি যাকে তুমি আমারই কারণে ভালোবাসতে।

আর এই পরিচয়ের উদ্দেশ্য হলো তাদের দুনিয়ায় বন্ধুত্বের কারণে কিয়ামতের ভয়াবহ দিনেও যেন একে অপরের জন্য সুপারিশ করতে পারে।

তাছাড়া তিনি আলেম, ওলামাদেরকে ভালোবাসতেন, তাদের সাথে খাওয়া দাওয়া উঠাবসাও করতেন।

পাটকেলঘাটার কওমিয়া সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসার জন্য তাঁর বিশেষ অবদান ছিল। তিনি সমাজসেবক হিসেবে প্রত্যেকের নিকট খুব প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। তার প্রমাণ জানাজা নামাজে, দোয়া অনুষ্ঠানে মানুষের ঢল নামতো। তাঁর জানাজায় ও কুলখানিতে, আলেম ওলামায়ে কেরাম, মসজিদের ইমাম ও মুসল্লি, প্রশাসন থেকে শুরু করে সকল শ্রেণির মানুষকে সেখানে দেখা যেতো।

রাসুলে করীম (স.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে থেকে যখন কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করবে, তার জন্য দোয়া ও মাগফিরাত কামনা কর, কারণ মোমেনের বড় হাতিয়ার হলো দোয়া করা। এই দোয়া বা মাগফিরাত হবে এক মুসলমান আরেক মুসলমানের জন্য, সন্তান সন্ততি করবে তাদের পিতামাতার জন্য, বিধবা স্ত্রী করবে তার মরহুম স্বামীর জন্য। এই দোয়া ও মাগফিরাত হবে সব সময়ের জন্য।

আসুন, আমারা মরহুম আলাউদ্দীনের জন্য মাগফিরাত কামনা করি, আল্লাহপাক যেন তাকে বেহেশতবাসী করেন। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে যেন দুনিয়া ও আখিরাতে কামিয়াবী দান করেন। আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক : সাবেক পেশ ইমাম, সদর থানা জামে মসজিদ, সাতক্ষীরা ও পরিচালক, মাদ্রাসা লাইব্রেরি, সাতক্ষীরা

 

 

 

 

 

(তানজির কচি সম্পাদিত স্মারকগ্রন্থ দীপ্ত আলাউদ্দীন থেকে উদ্ধৃত)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ রাজ্যেশ্বর দাস গ্রেপ্তার

সাতক্ষীরায় মানবাধিকার আইনজীবী ফোরামের ত্রৈমাসিক সভা

সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদলের আনন্দ মিছিল

কালিগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক কমিটির মাসিক সভা

দেবহাটায় যুব ও শিশু ফোরামের বার্ষিক সমাবেশ

দেবহাটায় দারুস সালাম প্রি-ক্যাডেট একাডেমির ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ

বুশরা গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রি ঠেকাতে ডিসির কাছে আমানতকারীদের আবেদন

পাইকগাছা প্রেসক্লাবসহ ২১৮ প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ

তালায় প্রতিবন্ধিতা সনাক্তকরণ জরিপ

১০

গাঁজা ও ইয়াবাসহ কালিগঞ্জ শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সম্পাদক আটক

১১

বঙ্গোপসাগরে ইঞ্জিন বিকল, ১৬ জেলেকে উদ্ধার নৌবাহিনীর

১২

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন: আইনমন্ত্রী

১৩

যৌথসভা ডেকেছে বিএনপি

১৪

গরুর মাংসের সঙ্গে কাঁচা কলা! সুস্বাদু আয়োজনেই জমছে ‘রান্না ভালো হোটেল’

১৫

২ মন্ত্রী ও ১ প্রতিমন্ত্রীর কাঁধে নতুন দায়িত্ব, প্রজ্ঞাপন জারি

১৬

হাম উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ মৃত্যু

১৭

মোটরসাইকেলপ্রেমীদের জন্য আসছে সুখবর

১৮

একরামুল হত্যা: শেখ হাসিনাসহ ৭ জনকে আত্মসমর্পণে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ

১৯

জাতীয় পতাকার আদলে পোশাক, বিতর্কে উর্বশী

২০
error: Content is protected !!