বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
৫ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
admin
৩ মে ২০২৩, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

সাতক্ষীরা বিআরটিএ অফিস যেন দুর্নীতির আখড়া!

ইব্রাহিম খলিল:

ঘুষ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছে সাতক্ষীরা বিআরটিএ অফিস। ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে বিআরটিএ’তে। ঘুষ দিলে যে কোনো অসম্ভব কাজ মুহূর্তের মধ্যেই সম্ভব হয়ে যায় এখানে। আর ঘুষ না দিলে শুরু হয় হয়রানি। ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটরযান রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, শ্রেণী পরিবর্তন, রুট পারমিট, সরকারি প্রতিবেদনসহ সর্বক্ষেত্রে দিতে হয় রেশিও অনুসারে ঘুষ। ঘুষের টাকা ঠিকঠাকভাবে না পেলে ফাইলে ভুল আছে জানিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আবার, বিআরটিএ অফিসে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোনো ফাইল জমা নেওয়া হয় না। ফাইল জমা নেওয়া হয় শো রুম প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। শো রুম প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ফাইল জমা নিলে সহজেই নিশ্চিন্তে ঘুষের টাকা আদায় করতে পারেন তারা। প্রতিটি শোরুম প্রতিনিধি প্রতিদিন কয়টি ফাইলের কাজ করে সন্ধ্যার পর হিসাব করে ঘুষের টাকা মাস্টার রোলে কর্মরত শরিফুর রহমান শরিফের কাছে বুঝে দিয়ে আসতে হয়। শরিফ সমুদয় টাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে রেশিও অনুযায়ী বণ্টন করে থাকে। সব কিছু ছায়ার মত দেখভাল করেন সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) কে এম মাহবুব কবির ও মোটরযান পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) রামকৃষ্ণ পোদ্দার।

একাধিক শোরুম প্রতিনিধি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, গত ৭-৮ মাসের ব্যবধানে সাতক্ষীরা বিআরটিএ অফিসে ঘুষের পরিমান দিগুণ হয়েছে। আগের এডি স্যার থাকতে নতুন গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে ঘুষ দিতে হত ১০০০ টাকা। বর্তমানে দিতে হয় ২০০০ টাকা। মালিকানা পরিবর্তনে আগে দিতে হতো ১৫০০ টাকা। এখন দিতে হয় ২০০০ টাকা। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আগে দিতে হতো ২২০০ টাকা। এখন দিতে হয় ৩২০০ টাকা। ছবি তোলা ও ফিঙ্গারের জন্য ২০০ টাকা থেকে এখন ৬০০ টাকা দিতে হচ্ছে। পুরাতন সে সব গাড়ি লাইসেন্স করেনি তাদেরকে বছর অনুযায়ী ৫০০ টাকা করে দিতে হয়। রুট পারমিটের জন্য দিতে হয় ২০০০ টাকা। ফিটনেস বাবদ ঘুষ দিতে হয় ২৫০০ টাকা। এছাড়া গাড়ির স্মার্ট ড্রাইভিং কার্ড নিতে গেলে দিতে হয় অতিরিক্ত টাকা।

তারা আরও জানান, বর্তমান সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি:) কে এম মাহবুব কবির যোগদানের পর অফিস স্টাফ ও শোরুম প্রতিনিধিদের ডেকে ঘুষের রেট নির্ধারণ করে দেন। শো রুম প্রতিনিধিরা আপত্তি জানালে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দেয় রেট অনুযায়ী ঘুষের টাকা দিতে হবে। সেসময় শোরুম প্রতিনিধিরা কাজ বন্ধ করে দেয়। এরপর তাদেরকে আবার ডেকে নভেম্বর ও ডিসেম্বর পুরাতর রেট অনুযায়ী কাজ হবে এবং জানুয়ারি ২০২৩ সাল থেকে নতুন ঘুষের রেট অনুযায়ী কাজ হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত শোরুম প্রতিনিধিরা ঘুষের নতুন রেট অনুযায়ী কাজ করছে।

শোরুম প্রতিনিধিরা আরও জানান, মাস্টার রোলে কর্মরত শরিফ যেন অফিসের প্রধান বস। সে প্রত্যেকের সাথে খারাপ আচরণ করে। অফিসের নির্ধারিত ঘুষ ছাড়া নিজস্ব কারিশমায় অতিরিক্ত টাকা আদায় করে সে। যারা ২০১৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স পাননি তাদেরকে বলে আপনাদের বাড়তি আরও দুই থেকে তিন হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দিতে হবে। তা না হলে কার্ড পাবেন না। এভাবে সে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। ১০-১২ বছর বিআরটিএ অফিসে মাস্টার রোলে কাজ করে সে আজ অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে গেছে।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, নতুন গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে সাতক্ষীরার শো-রুম থেকে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (বিএসপি) করা হলে ফাইল প্রতি দিতে হয় পাঁচশত টাকা এবং বাহিরের ফাইল হলে দিতে হয় আরও এক হাজার টাকা। একই সাথে সকল প্রকার স্মার্ট কার্ডে আঙ্গুলের ছাপ দেওয়ার সময় একশ টাকা এবং কার্ড গ্রহণের সময়ে দিতে হয় আরও একশ টাকা।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, মোটরযানের শ্রেণী পরিবর্তন বা সংযোজন/ধরণ পরিবর্তন/অন্তর্ভুক্তি/পিএসভি/করতে হলে প্রতি ফাইলে দিতে হয় কমপক্ষে এক হাজার টাকা। টাকা না দিলে ফাইলে ভুল আছে জানিয়ে ফেরত দেওয়া হয়।

আরও জানা যায়, গ্রাহক মোটরযানের ফিটনেস ইস্যু/নবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে মোটরযান পরিদর্শক সরেজমিনে মোটরযানটি দেখে এক বছরের জন্য ফিটনেস ইস্যু/নবায়ন করেন। যেসব গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া হয় তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয় এক হাজার পাঁচশত থেকে তিন হাজার টাকা। গাড়ির রুট পারমিট নিতে হলেও দিকে হয় একই পরিমান টাকা।
আরও জানা যায়, কোন সরকারি দপ্তর থেকে গাড়ির প্রতিবেদন চাইলে নানাভাবে গাফিলতি করা হয়। এরপর টাকা নিয়ে দেওয়া হয় প্রতিবেদন।

এ ব্যাপারে মাস্টার রোল কর্মচারী শরিফুর রহমান শরিফের ব্যবহৃত ০১৭১৪ ৯৬২১৩৬ নাম্বারের মোবাইলে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি:) কে এম মাহবুব কবিরের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সাতক্ষীরা বিআরটিও অফিসে লোকবল সংকট আছে। সে জন্য মাস্টার রোলে কিছু লোক কাজ করে।

এসময় বিআরটিএ অফিসে মোটরযান এনডোর্সমেন্ট, মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সার্টিফেকেট, স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটরযানের শ্রেণী পরিবর্তন বা সংযোজন/ধরণ পরিবর্তন/অন্তর্ভুক্তি/পিএসভি/তথ্য সংশোধন, ডুপ্লিকেট সার্টিফিকেট, রুট পারমিট, ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ কি পরিমান ঘুষ দিতে হয়- এমন প্রশ্ন করলে তিনি কিছুটা রাগান্বিত হয়ে বলেন আমার অফিসে কাজ করতে হলে কোন ঘুষ লাগে না। সরকার শোরুম প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ফাইল জমা নিতে বলেছে সেটাই করা হয়। এটার সারকুলার আছে আপনি দেখতে পারেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে? কত টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন- বলে তিনি মোবাইলের সংযোগ বিছিন্ন করে দেন।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় মাঠে নীলডুমুর ১৭ বিজিবি

১

দেবহাটায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনে আনসার-ভিডিপির কর্মকর্তারা

২

সাতক্ষীরায় অনূর্ধ্ব-১৪, ১৬ ও ১৮ বয়সভিত্তিক ক্রিকেটার বাছাই ২৫ অক্টোবর

৩

কালিগঞ্জে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ

৪

ইশরাকের পদত্যাগ: বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কর্মীরা

৫

আশাশুনিতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে শাড়ি ও অনুদানের চেক বিতরণ

৬

পাইকগাছায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের শাড়ি বিতরণ

৭

মুন্সিগঞ্জে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে কৃষ্ণপদ পরমান্য

৮

তালায় পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে বিএনপি নেতা রেজাউল ইসলাম

৯

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড: নজরুল-সুইটির সম্পর্ক নিয়ে যা জানালো পরিবার

১০

৪০০ রানে ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় ব্যাটার

১১

পদত্যাগ করলেন ইশরাক

১২

‎ফররুখ আহমদের কবিমানস ও বাঙালি মুসলিম নবজাগরণ || ‎তারিক ইসলাম

১৩

তালায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে শাড়ি ও নগদ অর্থ বিতরণ

১৪

লালনের আখড়াবাড়িতে টাইম বোমা, বিজিবি মোতায়েন

১৫

১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু

১৬

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ল ‘নিশি’

১৭

ইশরাক পদত্যাগ করবেন দুপুরে

১৮

শ্যামনগরে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে বিএন‌পি নেতা সৈয়দ ইফতেখার আলী

১৯

মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

২০