বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ | সময়:
admin
২৮ জুন ২০২৪, ১১:১৮ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

স্থানীয় জাতের বিলুপ্তি রোধে অল্পনার বীজ ভাণ্ডার

ùS

তানজির কচি/এম জুবায়ের মাহমুদ: অল্পনা রানী মিস্ত্রী। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ধুমঘাট গ্রামের এই কৃষাণী নিজ বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন স্থানীয় জাতের শাক-সবজি, ওষুধি ও ফলমূলের বীজ ভাণ্ডার। তার বীজ ভাণ্ডার রয়েছে অচাষকৃত কিন্তু পুষ্টিগুণ সম্পন্ন নানা উদ্ভিদবৈচিত্র্যের বীজও। ২২ প্রকার শিম, আট প্রকার ডাটাশাক, ১০ প্রকার মরিচ, শতাধিক ওষুধি, ৫০-৬০ প্রকার সবজি, ২২ প্রকার অচাষকৃত উদ্ভিদসহ তার সংগ্রহের সংখ্যা চার শতাধিক।

ধুমঘাটের গঙ্গাধর মিস্ত্রীর স্ত্রী অল্পনা রানীর বাড়িতে ঢুকতেই দেখা যায় বীজ রাখার ঘর, যেখানে বোয়ামে, প্যাকেটে বা বস্তায় রাখা হয়েছে বীজ। এই বীজ দিয়েই চাষাবাদ করেন অল্পনা রানী, বিতরণ করেন গ্রামের অন্যান্য কৃষকদের মাঝেও।

অল্পনা রানীর মতে, স্থানীয় জাতের বীজ চাষাবাদে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক লাগে না। এই বীজ থেকে উৎপাদিত ফসলের বীজ সংরক্ষণ করা যায়। জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা যায় বলে মানুষের স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।

তিনি স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ না করলে কৃষককে কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে যেতে হবে।

এজন্য স্থানীয় কৃষকদের সাথে বীজ বিনিময়ের মাধ্যমে দেশীয় বীজ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে সাধারণ কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছেন তিনি। গড়ে তুলেছেন বিষমুক্ত সবজির খামার।

স্থানীয় বীজ সংরক্ষণে তিনি নিজে কিভাবে উদ্বুদ্ধ হলেন জানতে চাইলে অল্পনা রানী বলেন, আগে দু’একটি বীজ রাখতাম। ২০১২ সালে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) আমাকে বীজ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করে এর গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝায়। প্রশিক্ষণও দেয়। নানাভাবে সহায়তাও করে। বারসিকের উৎসাহ পেয়েই আমি বীজ সংরক্ষণ শুরু করি। যা এক যুগের ব্যবধানে বীজ ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, হাইব্রিড বীজ কিনে কৃষকরা প্রতিনিয়ত ঠকছে। হাইব্রিড বীজ চাষ করতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক লাগে, হাইব্রিড বীজের ফসল থেকে বীজ রাখাও যায় না। এখন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিয়ে উৎপাদিত ফসল খেয়ে মানুষের নানা রকম রোগ বালাই হচ্ছে। আর বীজ রাখতে না পারায় কৃষক কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে যাচ্ছে।

ùS

বিপরীতে স্থানীয় জাতের বীজ চাষ করতে কোনো রকম রাসায়নিক সার ও কীটনাশক লাগে না। জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করেই ফসল উৎপাদন করা যায়, এর বীজও রাখা যায়, মানুষের স্বাস্থ্যও ভালো থাকে- যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণের মাধ্যমেই কৃষক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারে। এর মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের পাশাপাশি পুষ্টি চাহিদাও নিশ্চিত করা সম্ভব। এজন্য কোনো বীজই আমি হারিয়ে যেতে দেই না।

অল্পনা রানীর মতে, উপকূলীয় দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় বীজ সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, প্রতিবছর শ্যামনগর উপকূলে অন্তত দুটি করে ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। এতে অনেক সময় রোপণকৃত বীজ নষ্ট হয়ে যায়। অনেক বীজ হারিয়ে যায়। এমন সময় কৃষকের হাতে বীজ থাকলে তিনি আরও রোপণ করতে পারেন। কিন্তু বীজ না থাকলে আবার কেনা ছাড়া উপায় থাকে না।

কীটনাশকের বদলে ফসলের ক্ষেতে জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি নিমপাতা ও মেহগুনির ফল দিয়ে বালাইনাশক তৈরি করি। এছাড়া সহনীয় মাত্রায় ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানি স্প্রে বা ঘুটের ছাই কিংবা তুতে ও চুন দিয়ে বৈদ্য মিকচার তৈরি করে ক্ষেতে ব্যবহার করি। বালাইনাশক হিসেবে এগুলো খুবই উপকারী।

বীজ সংরক্ষণ ও স্থায়িতশীল কৃষি চর্চার জন্য তিনি পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও। এজন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে ভোলেননি স্বশিক্ষিত কৃষাণী ও খাদ্য যোদ্ধা অল্পনা রানী মিস্ত্রী।

তিনি বলেন, নদী পার হতে গেলে যেমন সাকো লাগে, বারসিক আমার জীবনে সেই সাকো হিসেবে কাজ করেছে। আমার জীবনে আলো দিয়েছে। জ্ঞানের আলো। যদি তারা আমাকে কোনো অনুদান দিতো, হয়তো তা খেয়ে ফেলতাম। কিন্তু তারা তা না দিয়ে আমাকে দিয়েছে জ্ঞানের আলো। এই জ্ঞানের আলোয় আমার জীবন ভরে উঠেছে। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। এছাড়াও আমি ২০১৪ সালে বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক, ২০২০ সালে অন্যান্য পুরস্কার, উপজেলা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতা পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার পেয়েছি। দেশ বিদেশের টেলিভিশন চ্যানেল আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন করতে আসে। আমার জীবনে আর কী চাওয়া আছে?

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সব নাগরিকের জন্য আসছে ‘এক-আইডি’, পাওয়া যাবে স্বাস্থ্য–শিক্ষাসহ সব সেবা

সুন্দরবনের কোলে দ্য এডিটরস’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

বিডিএফ প্রেসক্লাবে দ্য এডিটরস’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

তালতলা থেকে কোহিনুরের ম-র-দেহ উদ্ধারের পেছনে অনেক গল্প

এশিয়ান গেমসে লিটনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল ঘোষণা

তালায় জলবায়ু অভিযোজন নেটওয়ার্কের অর্ধবার্ষিক সভা

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

নজরুল বর্ষে সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন করবে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ

ঘেরের বেড়িতে লাগানো ৩০০ কুমড়া গাছ কেটে সাবাড়

কালিগঞ্জের ভাড়াশিমলায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

১০

সাতক্ষীরায় জামায়াতের দাওয়াতি অভিযান

১১

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে প্রথম দিনেই টাকা ফেরত চাইলেন ১৮ হাজার গ্রাহক

১২

খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল

১৩

কওমি মাদরাসার জন্য ৬ শিক্ষা বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর

১৪

ইতিহাস গড়ে বিদেশের মাটিতে হৃদয়ের ট্রিপল সেঞ্চুরি

১৫

১৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে র‍্যাবের ১১ তলা সদর দপ্তর

১৬

দুই দেশের জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় ভারত সফর করবেন তারেক রহমান: ত্রিবেদী

১৭

কয়রায় ৫৩তম জাতীয় গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ

১৮

কমলো দাম, ১২ কেজির এলপিজি ১৫৮৫ টাকা

১৯

আশাশুনিতে সারের দোকান পরিদর্শনে কৃষি কর্মকর্তা

২০
error: Content is protected !!