বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
৮ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১৮ জুলাই ২০২৬, ৪:৫৫ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

সাতক্ষীরার ৭ নদ-নদীর দখলদার ৩০২ জনের তালিকা প্রকাশ

ডেস্ক রিপোর্ট: কেউ প্রাচীর দিয়ে তৈরি করেছেন ফ্যাক্টরি। কেউ লাগিয়েছেন ধান, কেউ চাষ করেছেন মাছ। কেউবা তুলেছেন দালান বাড়ি, দোকানঘর। নির্মাণ করেছেন ইটভাটা। এভাবেই দখল হয়েছে সাতক্ষীরার সাতটি নদ-নদীর তীর। আর এমন দখলদারিত্বের তালিকায় রয়েছে অন্তত ৩০২ জন।

সম্প্রতি সাতক্ষীরার সাতটি নদ-নদীর ৩০২জন দখলদারের তালিকা প্রকাশ করেছে জেলা প্রশাসন। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কঠোর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে স্থানীয় সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) সরেজমিন তদন্তের ও ভিত্তিতে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নদ-নদীুগুলোর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে এবং নাব্যতা রক্ষায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে ইছামতি নদী দখলের তালিকায় ১০জন, নৌখাল দখলের তালিকায় ২৩ জন, কপোতাক্ষ নদ দখলের তালিকায় ১২২ জন, বেতনা নদী দখলের তালিকায় ১৬ জন, মরিচ্চাপ নদী দখলের তালিকায় ৭৮ জন, যমুনা নদী দখলের তালিকায় ২৪ জন ও খোলপেটুয়া নদী দখলের তালিকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভূমিগ্রাসী ২৯ জনের নাম, দখলের প্রকৃতি ও করণীয় উঠে এসেছে।

নদী অববাহিকার সরকারি জমি গ্রাস করে দখলদাররা গড়ে তুলেছে স্থায়ী ও অস্থায়ী টিনের ঘর, পাকা বাড়ি, কাঁচা বাড়ি, পাকা দোকান, বিশাল সীমানা প্রাচীর, বাণিজ্যিক মাছের ঘের, পুকুর, আমবাগান ও ফসলি জমি। এমনকি কিছু কিছু মৌজায় নদীর বুক চিরে গড়ে তোলা হয়েছে পরিবেশ বিধ্বংসী বাণিজ্যিক ইটভাটা এবং বিভিন্ন শিল্প কারখানার শেড বা ছাউনি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার রাধানগর মৌজায় ইছামতি নদীর তীরবর্তী ১০ জন দখলদারকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা বিপুল পরিমাণ নদীর জায়গা দখল করে আছেন।

অন্যদিকে, বিনেরপোতা মৌজায় বেতনা নদীর মূল সীমানা গ্রাস করে অবৈধ সীমানা প্রাচীর এবং ফ্যাক্টরির বিশাল ছাউনি নির্মাণের তথ্য মিলেছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বেতনা নদীর এই দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য ইতোমধ্যে সর্বশেষ নোটিশ প্রদান করা হয়েছে এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এছাড়া সদর উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় ‘নৌ-খাল’ দখল করে অবাধে ধান চাষ ও মাছ চাষ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বাবুলিয়া মৌজায় ‘কামরুল এসবিবি’ ও ‘মনির এসবিএল’ নামের দুটি বাণিজ্যিক ইটভাটা নদীর সীমানার ভেতরে গড়ে তোলার প্রমাণ মিলেছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পুরোপুরি উদ্ধার করার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ দিন পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করা হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নদী রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। বেতনা নদীতে উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং অন্যান্য স্থানেও দ্রুততম সময়ের মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। সামাজিক চ্যালেঞ্জ থাকলেও নদী ও পরিবেশের স্বার্থে কোনো আপস করা হবে না।

সরকারি এই প্রতিবেদনে সবচেয়ে ভয়াবহ দখলদারিত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে তালা উপজেলার মাগুরা, জগদানন্দকাটি, পুটিয়াখালী, রাজেন্দ্রপুর ও জালালপুর মৌজায় কপোতাক্ষ নদের অববাহিকায়। এখানে শতাধিক ব্যক্তি নদীর মূল জায়গা দখল করে স্থায়ী ও অস্থায়ী টিনের ঘর তুলে বসবাস করছেন। জেলা প্রশাসন কপোতাক্ষ নদের দখলদারদের সরাতে ‘ভ্রাম্যমাণ উচ্ছেদ অভিযান’ বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কপোতাক্ষ নদের উচ্ছেদ পরিকল্পনার পথে বড় দুটি অন্তরায় বা চ্যালেঞ্জ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। প্রথমত, মাঠ পর্যায়ে উচ্ছেদ অভিযান জোরালো ও একযোগে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে তীব্র ‘জনবলের অভাব’ ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সংকট রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই নদী অববাহিকা দখল করে যারা বসবাস করছেন, তাদের একটি বড় অংশই প্রকৃত ‘ভূমিহীন পরিবার’। ফলে মানবিক দিক বিবেচনা এবং তাদের পুনর্বাসনের জটিল বিষয়টি উচ্ছেদ অভিযানের অন্যতম মূল সামাজিক বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর সাতক্ষীরা জেলা সম্পাদক এবং নদী সুরক্ষা বিষয়ক জাতীয় কমিটির সদস্য মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, আমাদের যে নদী আইন এবং পরবর্তীতে সংশোধিত যে নদী আইনটি হয়েছে, সেটা গুরুত্ব দিয়ে সঠিকভাবে পালন করলে মানুষজন নদী দখল ও দূষণ থেকে পিছিয়ে আসবে। তবে তার আগে যেটি সবচেয়ে বেশি দরকার, সেটি হচ্ছে জনগণকে সচেতন করা। নদী আসলে একটি জীবন্ত সত্তা; নদী না বাঁচলে সাতক্ষীরা বাঁচবে না, নদী না বাঁচলে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি বাঁচবে না। ফলে নদীকে কখনো ব্যক্তিগত সম্পদ বা সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করলে হবে না; এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা বিধিবদ্ধ। যারা দখল ও দূষণ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ করলেই নদী সুরক্ষিত হবে। রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে যদি কোনো বাধা-বিঘ্ন আসে, তবে প্রশাসনকে অত্যন্ত কঠোর হাতে সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে আমরা প্রশাসনের কাছে এটাই জোর দাবি জানাচ্ছি।

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল ইসলাম মইন বলেন, জেলা প্রশাসনের এই উচ্ছেদ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা ইতোমধ্যেই পুরোদমে কাজ শুরু করেছি। প্রথমত, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় বাজেট বা বরাদ্দ চাওয়া হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলেই ক্রমান্বয়ে সব দখলদারদের উচ্ছেদে মূল অভিযান শুরু হবে। তবে শনিবার (১৮ জুলাই) থেকেই আমরা নেটপাটার বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযান শুরু করছি, এর পরপরই বড় দখলদারদের হাত থেকে নদীর জায়গা উদ্ধার করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে সরাসরি মনিটর বা তদারকি করা হচ্ছে, তাই উচ্ছেদের ক্ষেত্রে ছোট-বড় বা প্রভাবশালী কেউ কোনো ছাড় পাবেন না। এছাড়া নদী রক্ষা ও পুনঃদখল ঠেকাতে উদ্ধারকৃত জায়গাগুলোতে বনায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তালিকা দেখুন

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আশাশুনিতে মাদ্রাসাছাত্রকে যৌন নিপীড়ন, প্রধান শিক্ষক গ্রেপ্তার

১

ভাটায় কাজে যাওয়ার শর্তে দাদন নিয়ে পালিয়েছে ছেলে, সর্দার তুলে নিয়ে গেল মাকে

২

খুলনায় নারীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা

৩

সুন্দরবনে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিলের দাবি

৪

১১৪ বলে ডাবল সেঞ্চুরি, ওয়ানডেতে বিশ্ব রেকর্ড ব্রুকের

৫

বঙ্গোপসাগরে ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আশঙ্কা, দেশজুড়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা

৬

প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে ঢাকায় ফেরানো হলো জাপানের রাষ্ট্রদূতকে

৭

তালা থানার নতুন ওসি আব্দুল আলিম

৮

মুন্সীগঞ্জ বাজারে জামায়াত নেতার গণসংযোগ

৯

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন দরদির নতুন কমিটি গঠন: সভাপতি নয়ন পাল, সম্পাদক রাকিব

১০

মোংলা বন্দর পরিদর্শন করে যেসব নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

১১

সুন্দরবনের গোলখালী থেকে হরিণের পা মাথা চামড়া ও মাংস উদ্ধার

১২

হরিনগর অনির্বান ক্লাবের উদ্যোগে ১৬ দলীয় কেরাম প্রতিযোগিতা উদ্বোধন

১৩

তালা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মন্তব্যের প্রতিবাদে সভা

১৪

কয়রা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে চিকিৎসক না থাকার অভিযোগ, শিশুর মৃত্যু

১৫

পাটকেলঘাটায় ৮শ লিটার নারকেল তেল জব্দ, যাচাই হচ্ছে ভেজাল কি না

১৬

কয়রায় সরকারি জমি নিয়ে সংঘর্ষ, চিকিৎসাধীন পল্লী চিকিৎসকের মৃত্যু

১৭

বন্ধ হচ্ছে টুজি, চাপে বাটন ফোন

১৮

কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে গোসলে নেমে তিন পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ ২

১৯

কালিগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

২০