বাংলাদেশ, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

কন্যাশিশুর নিরাপত্তা মানেই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা || খান মোঃ আবু হাসান

‘কন্যা’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মায়া, ভালোবাসা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের অসংখ্য সম্ভাবনা। একটি কন্যাশিশু শুধু একটি পরিবারের সন্তান নয়, সে আগামী দিনের মা, শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক, উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী কিংবা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল নাগরিক। তাই কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা নয়, বরং একটি সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিশালী করা।

প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত হয়। কন্যাশিশুর অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরিই এই দিবসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বর আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন নতুন করে আসে, আমরা আমাদের কন্যাশিশুদের জন্য কেমন সমাজ ও ভবিষ্যৎ তৈরি করছি?

কন্যাশিশুর নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়
আমাদের সমাজে প্রায় প্রতিটি মানুষের জীবনেই কোনো না কোনো কন্যার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমার মা একজনের কন্যা, আমার স্ত্রী একজনের কন্যা, আমার বোন একজনের কন্যা। আজ যে মা আমাদের জন্য সারাজীবন ত্যাগ স্বীকার করছেন, তিনিও একদিন কারো আদরের কন্যা ছিলেন। যে স্ত্রী আমাদের জীবনের সঙ্গী, তিনিও কোনো বাবা-মায়ের স্বপ্ন ও ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা একজন কন্যা। আমাদের বোন, মেয়ে, সহকর্মী কিংবা প্রতিবেশী, প্রত্যেক নারী ও কন্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি গল্প এবং অসংখ্য স্বপ্ন।

তাই কন্যাশিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের প্রশ্ন নয়, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব।

আমরা এমন একটি সামাজিক পরিবেশ চাই, যেখানে একটি কন্যাশিশু স্কুলে যাওয়ার সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না। রাস্তায় চলার সময় তাকে ইভটিজিং বা হয়রানির শিকার হতে হবে না। গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কোথাও যেন তার সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে না হয়।

একজন কন্যা যেন নিজের স্বপ্নের কথা বলতে পারে। নিজের পছন্দের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে। সামাজিক কুসংস্কার, বৈষম্য কিংবা নিরাপত্তাহীনতা যেন তার সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

দিবসটি আমাদের কী মনে করিয়ে দেয়?
জাতীয় কন্যাশিশু দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়। এটি আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি একটি দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

কন্যাশিশুর জন্মকে যেন কোনো পরিবার বোঝা হিসেবে না দেখে, বরং তাকে সম্ভাবনা হিসেবে দেখে। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে শিক্ষার সুযোগ, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা ভালোবাসার ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য যেন না থাকে। প্রতিটি কন্যা যেন তার মেধা ও যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ পায়।

বাল্যবিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ইভটিজিং ও বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে পরিবার থেকেই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে একটি কন্যাশিশু যখন কোনো ধরনের হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তাকে দোষারোপ না করে তার পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

কন্যার স্বপ্ন থেমে যাবে কেন?
একটি মেয়ের জন্মের সঙ্গে তার স্বপ্নও জন্ম নেয়। সে পড়াশোনা করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, পরিবারকে সহযোগিতা করবে, সমাজের জন্য কাজ করবে, এমন অসংখ্য স্বপ্ন তার চোখে থাকে।

কিন্তু অনেক সময় সামাজিক বাধা, নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য, বাল্যবিবাহ কিংবা হয়রানির কারণে সেই স্বপ্নগুলো অকালেই থেমে যায়।

আমাদের দায়িত্ব হলো সেই স্বপ্নগুলোকে নিরাপদ রাখা।

একটি কন্যা যেন সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরার সময় আতঙ্কিত না হয়। রাস্তায় হাঁটার সময় তাকে যেন অবাঞ্ছিত মন্তব্য বা হয়রানির শিকার হতে না হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সে যেন নিরাপদ থাকে। কর্মক্ষেত্রে যেন সম্মানের সঙ্গে কাজ করতে পারে। নিজের মতামত প্রকাশ করার অধিকার যেন তার থাকে।

জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট 
কন্যাশিশুর অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ একটি মানবিক ও সামাজিক বিষয়।

সেপ্টেম্বর মাসের চতুর্থ রবিবার বিভিন্ন দেশে ও সামাজিক পরিসরে ‘Daughters Day’ বা কন্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়। ২০২৬ সালে সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবার ছিল ২৭ সেপ্টেম্বর। তবে এটি জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক দিবস নয়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালন করা হয়। আর জাতিসংঘ ঘোষিত ‘International Day of the Girl Child’ বা আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালিত হয় প্রতিবছর ১১ অক্টোবর। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর ৬৬/১৭০ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০১২ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

তারিখ ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও এই দিবসগুলোর মূল বার্তার জায়গায় রয়েছে কন্যাশিশুর অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি।

শুধু দিবস নয়, প্রয়োজন বাস্তব পরিবর্তন
আমরা যদি সত্যিই কন্যাশিশুদের ভালোবাসি, তাহলে শুধু দিবস উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। আমাদের পরিবার ও সমাজের ভেতর থেকেই পরিবর্তন শুরু করতে হবে।

ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বৈষম্য না করা, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা, যৌতুক ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, এসবই কন্যাশিশুর জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশ।

একটি কন্যা যখন জন্ম নেয়, তখন তার পরিবার যেন তাকে বোঝা হিসেবে না দেখে। তাকে যেন দেখা হয় পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও সম্ভাবনার অংশ হিসেবে।

আমরা কেমন পৃথিবী রেখে যেতে চাই
আমাদের প্রত্যেকেরই ভাবা উচিত, আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন পৃথিবী রেখে যেতে চাই?

এমন একটি পৃথিবী, যেখানে একটি মেয়ে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত থাকবে, নাকি এমন একটি পৃথিবী, যেখানে সে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে, নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবে?

আমার মা, আমার স্ত্রী, আমার বোন, তারা প্রত্যেকেই কারও না কারও কন্যা। পৃথিবীর প্রতিটি নারীই কোনো না কোনো পরিবারের ভালোবাসার মানুষ। তাই কোনো কন্যার নিরাপত্তাহীনতা বা হয়রানিকে শুধু অন্য কারও সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো কন্যাকে হয়রানি, ইভটিজিং, নির্যাতন কিংবা বৈষম্যের শিকার হতে হবে না। তারা যেন নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে, নিজের স্বপ্ন পূরণের স্বাধীনতা পায় এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে।

প্রতিটি কন্যার জন্য তৈরি হোক নিরাপদ পরিবার, নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, নিরাপদ পথঘাট এবং সর্বোপরি একটি মানবিক সমাজ।

কারণ আজকের কন্যাই আগামী দিনের মা। আজকের কন্যাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, প্রশাসক ও সমাজের নেতৃত্বদানকারী নাগরিক।

তাই কন্যার স্বপ্নকে নিরাপদ রাখা মানে আমাদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখা।

আসুন, আমরা একটি অঙ্গীকার করি।

কোনো কন্যা যেন অবহেলার শিকার না হয়।
কোনো নারী যেন হয়রানির শিকার না হয়।
কোনো মেয়ের স্বপ্ন যেন নিরাপত্তাহীনতা ও বৈষম্যের কারণে থেমে না যায়।
প্রতিটি কন্যা যেন সম্মান, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বেড়ে উঠতে পারে।

কন্যারা নিরাপদ থাকুক, কন্যাদের স্বপ্ন বেঁচে থাকুক।
কন্যার নিরাপত্তাই হোক আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।

লেখক: সমাজ কর্মী

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কালিগঞ্জের মথুরেশপুরে বিএনপির কর্মী সম্মেলন

১

কন্যাশিশুর নিরাপত্তা মানেই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা || খান মোঃ আবু হাসান

২

সেনা নিরাপত্তায় রূপপুরের পথে ইউরেনিয়ামের বিশেষ চালান

৩

লঙ্কানদের কাছে ৬৩ রানে হার, হাতছাড়া হলো ব্রোঞ্জও

৪

সাতক্ষীরায় চায়ের দোকানে ঝগড়া থামাতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত

৫

সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জলবায়ু পরিবর্তন || আসাদুজ্জামান সরদার

৬

বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী লন্ডনে মারা গেছেন

৭

দেবহাটায় অস্ত্রের মুখে পোল্ট্রি খামার লুট!

৮

মিষ্টিকে এবার বিএনপি থেকে পদত্যাগের নির্দেশ

৯

মিথিলা এখন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক

১০

ময়মনসিংহে বাস-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ৭

১১

বিমানবন্দরের ইডিকে হুমকি: জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার

১২

শ‌্যামনগ‌রে বজ্রপাতে কাঠমিস্ত্রির মৃ/ত্যু

১৩

শ্রীধরকাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমপি রবিউল বাশারের মতবিনিময়

১৪

খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে শিক্ষার অপরিহার্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে কাজ চলছে: জবি উপাচার্য

১৫

সাতক্ষীরায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে চ্যানেল আই’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

১৬

কলারোয়ায় পানিতে ডুবে ২ সহোদর শিশুর মৃ/ত্যু

১৭

বড়দলে পুষ্টি বিষয়ক প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ

১৮

অনিশ্চয়তায় কাটছে শারমিনের জীবন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সহায়তার আহবান

১৯

তালায় রাস্তার গাছ কাটার ঘটনায় তদন্ত

২০