
ডেস্ক রিপোর্ট: চার বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছিল অনন্যা চক্রবর্তী। এরপর মা সীমা ভট্টাচার্য অনেক কষ্টে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন। সেই অনন্যাই এবার এসএসসিতে ১ হাজার ১৩৯ নম্বর পেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের দক্ষিণ শ্রীপুর কুশুলিয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন এখন চিকিৎসক হয়ে মানবসেবার। তার ইচ্ছা ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ার।
রোববার সকালে সাতক্ষীরা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে অনন্যা বলে, ‘আমার বাবা যখন মারা যান, তখন আমার বয়স মাত্র চার বছর। মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ার ইচ্ছা আছে।’
অনন্যার মতো সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর থেকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অভিজিৎ রায়। নকিপুর সরকারি হরিচরণ পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে ১ হাজার ৬৩ নম্বর পেয়েছে সে। সাতক্ষীরা–শ্যামনগর সড়কের দুরবস্থার কারণে সময়মতো অনুষ্ঠানে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। তাই দিদা সুষমা গায়েনকে সঙ্গে নিয়ে আগের রাতেই শহরে দাদার বাড়িতে চলে আসে।
অভিজিৎ বলল, ‘সড়কের অবস্থা ভালো না থাকায় অনুষ্ঠানে সময়মতো আসতে পারব কি না, সেই চিন্তা ছিল। তাই দিদাকে সঙ্গে নিয়ে আগের রাতেই শহরে দাদার বাড়িতে চলে এসেছি। ভালো ফল করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই।’
রোববার সকালে সাতক্ষীরার রাজ্জাক পার্কের গুড়পুকুরের মেলার স্টলগুলো যখন জমজমাট, তখন সেই ভিড় পেরিয়ে একে একে সাতক্ষীরা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে হাজির হচ্ছিল জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা। কারও সঙ্গে বাবা-মা, কেউ এসেছে ভাই-বোনকে নিয়ে। কারও হাতে মুঠোফোন, কেউ আবার পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে জড়িয়ে ধরছে। সবার চোখেমুখে এসএসসিতে ভালো ফলের আনন্দ।
‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানে শিল্পকলা একাডেমিতে বসেছিল শিখো–প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি সংবর্ধনা ২০২৬।
জেলার সাত উপজেলার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়। দূরের উপজেলা থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থী সংবর্ধনার পাশাপাশি রাজ্জাক পার্কের গুড়পুকুর মেলাও ঘুরে দেখেছে।
সকাল সাড়ে আটটার আগেই শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণ শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। কেউ স্কুলের পুরোনো বন্ধুকে পেয়ে জড়িয়ে ধরছে, কেউ দল বেঁধে ছবি তুলছে। প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা সকাল সাতটা থেকেই হলুদ টি-শার্ট পরে তাঁদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিলেন।
কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের ভাদিয়ালি গ্রামের মাশরিয়া জামান এসেছে ভাদিয়ালি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে। এসএসসিতে তার প্রাপ্ত নম্বর ১ হাজার ৭৫। সঙ্গে বড় বোন এরিন জামান। মাশরিয়ার বাবা ওহিদুজ্জামান সেনাবাহিনীতে সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাশরিয়ার স্বপ্ন আর্মি অফিসার হওয়ার।
মাশরিয়া বলল, ‘ভবিষ্যতে আর্মি অফিসার হতে চাই। আজকের এই সংবর্ধনা পেয়ে খুব ভালো লাগছে। আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’
তালার কুমিরা ইউনিয়নের দাদপুর গ্রামের ইশরাত জাহান আহোনা পেয়েছে ১ হাজার ১৯৯ নম্বর। কুমিরা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছে। ২০২০ সালে স্কাউটস শাপলা কাপ অ্যাওয়ার্ড এবং ২০২৩ সালের জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের রচনা প্রতিযোগিতায় খুলনা বিভাগে প্রথম ও জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় হয়েছিল সে। ভবিষ্যতে বুয়েটে পড়তে চায় আহোনা।
আহোনা বলল, ‘ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। এসব প্রতিযোগিতা আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। ভবিষ্যতে বুয়েটে পড়াশোনা করে ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই।’
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। বন্ধুসভার সদস্য শেখ শরীফ হোসেনের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি ইমতিয়াজ উদ্দীন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর বাসুদেব বসু বলেন, জিপিএ-৫ জীবনের শেষ সাফল্য নয়, এটি নতুন পথচলার শুরু। শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য ঠিক করে নানা বাধা ও চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। শুধু ভালো শিক্ষার্থী নয়, সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবুল হাসেম বলেন, ভালো ফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দেশ ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। সংবাদপত্র পড়া, সাহিত্য ও সাধারণ জ্ঞানের চর্চা করতে হবে। মোবাইল ও ইন্টারনেট পড়াশোনার কাজে ব্যবহার করতে হবে। জিপিএ-৫ পাওয়ার পরের পথ আরও কঠিন, সেখানে পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে কৃতি শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলতে শপথ করান প্রথম আলোর ডেপুটি নিউজ এডিটর তুহিন সাইফুল্লাহ।
তিনি বলেন, এসএসসির পর শুরু হচ্ছে শিক্ষাজীবনের আরও প্রতিযোগিতামূলক অধ্যায়। বন্ধু ও পরিবেশ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে সচেতনভাবে এবং সাইবার অপরাধের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থনির্ভরতা থেকে দূরে থাকতে হবে।
পরে কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ১০ শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন তুহিন সাইফুল্লাহ। অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন সাতক্ষীরা বন্ধুসভার সাংস্কৃতিক সম্পাদক শিরিনা আক্তার। নৃত্য পরিবেশন করেন তনয়া মেধা শায়নী। জিপিএ-৫ পাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী নিজেদের অনুভূতি তুলে ধরেন। সবশেষে চৈতালী মুখার্জি ও আবু আফফান রোজ বাবুর গানে আনন্দে মেতে ওঠেন শিক্ষার্থীরা।
শিখো–প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি সংবর্ধনা ২০২৬ দেশের ৬৪ জেলায় আয়োজন করা হচ্ছে। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগানের এ আয়োজনের পৃষ্ঠপোষক শিক্ষাবিষয়ক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখো, পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, স্যাভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ ক্যাম্পাস, অ্যাম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
মন্তব্য করুন