বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
২১ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
shimulsheikh862@gmail.com
৬ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৩২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

পাকিস্তানে ক্ষমতার নতুন লড়াই, প্রদেশ ভাঙার উদ্যোগ সেনাপ্রধানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পাকিস্তানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই নতুন এক ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়েছে। দেশটির চারটি প্রদেশকে ভেঙে আরও ছোট প্রদেশ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই পরিকল্পনার নেপথ্যে রয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে পাঞ্জাব ও সিন্ধুর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআইয়ের সমর্থকদের বিক্ষোভ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই উত্তেজনা চলছে।

ইমরান খান বর্তমানে কারাগারে। তাকে সমর্থন জানাতে রাজধানী ইসলামাবাদে মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছিল তার দল।

তবে সরকার বিক্ষোভ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেয়। ইসলামাবাদের বিভিন্ন সড়কে দুই হাজারের বেশি কনটেইনার বসিয়ে রাস্তা বন্ধ করা হয়।

৪ অক্টোবর শেষ পর্যন্ত পিটিআইয়ের সমর্থকরা মিছিল শুরু করেন। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের লাক্কি মারওয়াত থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ যাত্রা শুরু করেন।

তাদের লক্ষ্য ছিল পথে আরও সমর্থক জড়ো করা। তবে শেষ পর্যন্ত তারা ইসলামাবাদে যাবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত তখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ইমরান খানকে ঘিরে এই রাজনৈতিক উত্তেজনার আড়ালেই পাকিস্তানের ক্ষমতার কাঠামো বদলের উদ্যোগ চলছে। প্রধান পরিকল্পনাটি হলো বর্তমান চারটি প্রদেশকে আরও ছোট কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করা।

সমর্থকদের যুক্তি, বর্তমান প্রদেশগুলো আয়তন ও জনসংখ্যায় অনেক বড়। ফলে স্থানীয় প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, এর আসল উদ্দেশ্য প্রশাসনিক সংস্কার নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে প্রদেশগুলোতে প্রভাব ধরে রাখা রাজনৈতিক পরিবারগুলোর ক্ষমতা কমানো।

পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোর একটি পাঞ্জাব। দেশটির সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার এই প্রদেশে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস করেন।

দীর্ঘদিন ধরে পাঞ্জাবের রাজনীতিতে প্রভাবশালী শরীফ পরিবার। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এই পরিবারের সদস্য। তার ভাই নওয়াজ শরিফও একাধিকবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বর্তমানে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ।

অন্যদিকে সিন্ধু প্রদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ভুট্টো পরিবার। পাকিস্তান পিপলস পার্টি বা পিপিপির মাধ্যমে এই পরিবার সিন্ধুর রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

বর্তমানে দেশটির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি এই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। তার ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকেও ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতা হিসেবে দেখা হয়।

পরিকল্পনার সমর্থকরা বলেন, বড় প্রদেশে প্রশাসন পরিচালনা কঠিন। দুর্নীতি ও দুর্বল স্থানীয় সরকারব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়ছেন। পাঞ্জাবের গ্রামীণ এলাকার অনেক মানুষকে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হয়।

তবে সমালোচকরা বলছেন, ছোট প্রদেশ তৈরি করলেই এসব সমস্যা সমাধান হবে না। তাদের আশঙ্কা, নতুন প্রদেশ তৈরি হলে নতুন প্রশাসনিক পদ সৃষ্টি হবে। এতে সরকারি ব্যয় বাড়তে পারে এবং রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের জন্য নতুন পদ তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গত দুই বছরে পাকিস্তানের সংবিধানে দুই দফা বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এছাড়া নতুন ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট বা এফসিসি গঠন করা হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই আদালতে সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রভাব রয়েছে।

পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর বাইরেও প্রভাব বেড়েছে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে অনেকেই সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল নেতা হিসেবে দেখেন।
অর্থনৈতিক সংকটও বড় কারণ

রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটও এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। গত সেপ্টেম্বরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ।

ঋণ পরিশোধ ও সরকারি ব্যয়ের পর কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে উন্নয়ন বা অন্যান্য খাতে ব্যয়ের জন্য খুব বেশি অর্থ থাকছে না। জ্বালানি ও কর বাড়ানো নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তান কিছু সাফল্য পেলেও দেশের ভেতরে বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই সাফল্য ধরে রাখতে পারছে না।
বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব

পাকিস্তানের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, কোনো প্রদেশ ভাগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। এ কারণে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সহজ নয়।

পাঞ্জাবের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি হয়তো শেষ পর্যন্ত এতে সম্মত হতে পারে। কিন্তু সিন্ধুর পিপিপির জন্য বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সিন্ধু প্রদেশই দলটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি।

এরই মধ্যে সিন্ধু বিধানসভা প্রদেশ ভাগের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাবও পাস করেছে।
ইমরান খানের জনপ্রিয়তা বড় চ্যালেঞ্জ

সেনাপ্রধানের প্রভাব বাড়লেও তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ইমরান খান।

কারাগারে থাকলেও ইমরান এখনো পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যাপক জনপ্রিয়। পিটিআইয়ের সমর্থকরা তাকে মুক্ত করার দাবিতে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করছেন।

ফলে প্রদেশ পুনর্গঠন বা ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের মতো বড় সিদ্ধান্ত নিতে গেলে নতুন করে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে প্রদেশ পুনর্গঠনের বিতর্ক পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকারের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কমেছে বৈশ্বিক সহায়তা, সংকটে ২ হাজার ২০০ এনজিও

১

তর্কে হেরে গিয়ে জীবনে জেতার আনন্দ || তারিক ইসলাম

২

‘রূপে আছে নেশা, চোখে ছলনা’

৩

পাকিস্তানে ক্ষমতার নতুন লড়াই, প্রদেশ ভাঙার উদ্যোগ সেনাপ্রধানের

৪

হামের উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১ হাজার ৩৯৩

৫

‘জাস্টিস ফর জাকারিয়া’র কমিটি গঠন

৬

‘সকালবেলা নায়িকা, বিকেলবেলা ভিলেন’, দলবদল নিয়ে কোয়েলকে কটাক্ষ

৭

আগামীকাল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ, যেভাবে দেখবেন

৮

দক্ষিণ কাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ইউনিফর্ম ও খাতা বিতরণ

৯

সৌদির দুই বিমানবন্দরে হামলা

১০

জাতীয় কন্যা শিশু দিবস উদযাপনে স্বদেশ’র র‌্যালি ও সমাবেশ

১১

কয়রার ২০ বিদ্যালয়ে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার ক্লাস নিয়ে বিড়ম্বনা!

১২

পাইকগাছায় অবৈধ বন্দোবস্ত বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন

১৩

ইচ্ছে পূরণ হয়নি, যে আক্ষেপ পরীমণির

১৪

বুড়িয়া মণ্ডপে ৩৫ হাজার মুক্তায় সেজেছে ‌‘দুর্গা প্রতিমা’, দর্শনার্থীদের ভিড়

১৫

আবরার হত্যার ৭ বছর: চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে যে উদ্যোগ নিচ্ছে রাষ্ট্র

১৬

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপনে কেন্দ্রীয় কমিটির সভা

১৭

একদিনে ডেঙ্গুতে ১০ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৯৬

১৮

দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক

১৯

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জিতলেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন

২০