
প্রায় এক শতাব্দী আগে বেগম রোকেয়া সমাজের গঠন বোঝাতে লিখেছিলেন, ‘আমরা সমাজের অর্ধ অঙ্গ।’ তাঁর ‘সুলতানার স্বপ্ন’ (১৯০৫) গ্রন্থে নারীর মেধা ও শ্রমে পরিচালিত এক জনপদের চিত্র আছে। সেই স্বপ্ন আজও পূর্ণতা পায়নি। সমাজের এই অর্ধ অঙ্গের সবচেয়ে বড় ভার যে গ্রামীণ নারী বহন করেন, তিনি এখনো প্রায়ই পরিসংখ্যানের আড়ালে, নীতিনির্ধারণী আলোচনার প্রান্তে।
আগামী ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর ৬২/১৩৬ নম্বর প্রস্তাবে দিবসটি ঘোষণা করে, প্রথম পালিত হয় ২০০৮ সালে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘গ্রামীণ নারীর জাগরণ: বেইজিং+৩০ এর সঙ্গে সহনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণ’। ১৯৯৫ সালের বেইজিং সম্মেলনের তিন দশক পরে এই প্রতিপাদ্য মনে করিয়ে দেয়, দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের প্রশ্নে গ্রামীণ নারী অগ্রণী ভূমিকা রেখেও প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
জাতিসংঘের হিসাবে বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক নারীর হাতে, অথচ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে কৃষিজমির মালিকদের মধ্যে নারী ১৫ শতাংশেরও কম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ ৫০ দশমিক ৮৮ শতাংশ, শহরে ২৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ এর কিছু বিশ্লেষণে কৃষি শ্রমশক্তির প্রায় ৫৮ শতাংশই নারী। সরকারি হিসাবে জিডিপিতে নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ, কিন্তু গৃহস্থালি ও অবৈতনিক কৃষিকাজের অর্থমূল্য ধরলে প্রকৃত ছবি যে অনেক বড়, তা অর্থনীতিবিদেরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন। গবাদিপশু পালন, হাঁস মুরগির যত্ন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো কাজ আজও পূর্ণ শ্রমের স্বীকৃতি পায় না।
সাহিত্য এই অদৃশ্য শ্রমকে বহু আগেই চিনেছে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘নারী’ কবিতায় সভ্যতার সব কল্যাণকর সৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের সমান অংশের কথা বলেছেন। জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যে একটি সেলাই করা কাঁথা হয়ে ওঠে প্রেম, বিরহ ও গ্রামজীবনের দলিল। রবীন্দ্রনাথ ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পে মৃণালের চিঠির মাধ্যমে দেখিয়েছেন, সংসারের ভেতরে একজন নারী কীভাবে মূল্যহীন গণ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করেন। সাহিত্য যা বহুকাল আগে দেখেছে, অর্থনীতির খাতা তা এখনো পুরোপুরি দেখে উঠতে পারেনি।
এই অদেখাকে দেখার একটি কার্যকর ক্ষেত্র পর্যটন। জাতিসংঘ বিশ্ব পর্যটন সংস্থার ২০১৯ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী পর্যটন খাতের কর্মীদের ৫৪ শতাংশ নারী, যেখানে বৃহত্তর অর্থনীতিতে এ হার ৩৯ শতাংশ। এ খাতে নারী পুরুষের মজুরি ব্যবধানও তুলনামূলক কম, ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, বৃহত্তর অর্থনীতিতে যা ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে ব্যবধান পুরোপুরি ঘোচেনি। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন পরিষদের (ডব্লিউটিটিসি) বরাতে বাংলাদেশ মনিটর জানিয়েছে, ২০২৩ সালে দেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ১ লাখ ২ হাজার কোটি টাকা, আর কর্মসংস্থান ২১ লাখ ৪০ হাজার, যা মোট কর্মসংস্থানের ৩ শতাংশ। ২০১০ সালের জাতীয় পর্যটন নীতিতে ইকো ট্যুরিজম, কমিউনিটি ও গ্রামীণ পর্যটনের কথা আছে। সেই অভিমুখ বাস্তবে গ্রামীণ নারীর উদ্যোগে কতটা রূপ পেয়েছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রতিবেশী কেরালা এ পথে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর সেখানে রেসপনসিবল ট্যুরিজম মিশন যাত্রা শুরু করে, যার লক্ষ্য গ্রামোন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও নারীর ক্ষমতায়ন। চোদ্দটি জেলায় পাঁচ বছরে দেড় লাখ কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কুমারাকোমে নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠী কুদুম্বশ্রী ২০১০ সালে প্রায় ৩০০ একর জমিতে ধান চাষ করে। হোটেল ও রেস্তোরাঁয় সবজি সরবরাহ থেকে তাদের আয় ২৭ লাখ রুপি ছাড়িয়েছে, সঙ্গে যোগ হয়েছে হস্তশিল্প ও খাদ্যপণ্যের আয়। শিক্ষাটি স্পষ্ট: পর্যটকের ব্যয় যদি স্থানীয় নারীর উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে অর্থ গ্রামেই থেকে যায়।
আমাদের সম্পদ কম নয়। ইউনেস্কো স্বীকৃত জামদানি (২০১৩), রাজশাহীর রেশম, মণিপুরি তাঁত, সিলেটের চা বাগান, শীতের খেজুর রস ও বিচিত্র পিঠা, সবকিছুর পেছনে নারীর হাত। উপকূলের গল্প আরও অনন্য। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলে নারীরা লবণাক্ত পরিবেশে বস্তা ও মাচায় সবজি ফলিয়েছেন, বৃষ্টির পানি ধরে রেখেছেন, সংসার টিকিয়ে রেখেছেন। জলবায়ু সংকটের যুগে এই অভিজ্ঞতা কেবল সহানুভূতির বিষয় নয়, শেখার বিষয়। কোনো গবেষক বা পর্যটক যখন তাঁর উঠানে বসে সেই কৌশল শিখবেন, তখন গ্রামীণ নারীর পরিচয় হবে ‘দুর্গত’ নয়, ‘শিক্ষক’।
তবে সম্ভাবনার পথে প্রধান অন্তরায়গুলোকেও স্বীকার করতে হবে। জিএসএমএর মোবাইল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী (প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার) বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী পুরুষ ৪০ শতাংশ, নারী মাত্র ২৪ শতাংশ। স্মার্টফোনের মালিকানায় পুরুষ ৪০ শতাংশ, নারী ২২ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ ব্যবধান বাংলাদেশেই সর্বোচ্চ। অনলাইন বুকিং ও ডিজিটাল বিপণনের যুগে এই ফারাক রেখে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাকে প্রতিযোগিতার মাঠে নামানো যায় না।
এই বাস্তবতায় আমার কয়েকটি প্রস্তাব আছে। প্রথমত, ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে নারী নেতৃত্বাধীন সমবায়ের মাধ্যমে ‘নারী পর্যটন পাড়া’ গড়ে তোলা, যেখানে হোমস্টে, গ্রামীণ খাবার, হস্তশিল্প ও গাইডিং একসঙ্গে পরিচালিত হবে। দ্বিতীয়ত, শীত মৌসুমে ‘পিঠা পথ’ নামে এমন একটি পর্যটন পথ, যেখানে প্রতিটি গ্রামের নিজস্ব পিঠা ও তার ইতিহাস পর্যটকের সামনে উপস্থাপিত হবে। তৃতীয়ত, পর্যটকের ব্যয়ের নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি নারীর নিজস্ব মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে জমা হওয়ার ব্যবস্থা। চতুর্থত, জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ। পঞ্চমত, পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আতিথেয়তা, খাদ্য নিরাপত্তা, গাইডিং ও ডিজিটাল বিপণনের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রামের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। ষষ্ঠত, নারীর জন্য নিরাপদ যাতায়াত ও পর্যটন এলাকায় প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করা।
একই সঙ্গে সতর্কতাও জরুরি। পর্যটন যেন গ্রামীণ নারীর ওপর আরেকটি অবৈতনিক বোঝা না হয়। আতিথেয়তা যেন ‘ঘরের কাজ’ বলে আবারও আড়ালে চলে না যায়, আয়ের নিয়ন্ত্রণ যেন নারীর হাতেই থাকে। নারী যেন প্রদর্শনীর বস্তু না হয়ে সম্মানিত আয়োজক হন, সংস্কৃতি যেন বাণিজ্যের নামে বিকৃত না হয়, আর গ্রামের প্রকৃতি যেন অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে ক্লান্ত না হয়।
বেগম রোকেয়া সমাজের যে অর্ধ অঙ্গের কথা বলেছিলেন, তাকে সচল করা শুধু ন্যায়ের দাবি নয়, অর্থনৈতিক বিবেচনাও। যেদিন কোনো বিদেশি অতিথি গ্রামের উঠানে বসে নারীর হাতের পিঠা খাবেন, তাঁর কাছ থেকে জলবায়ুর সঙ্গে টিকে থাকার গল্প শুনবেন আর আয়ের হিসাবে লেখা থাকবে তাঁরই নাম, সেদিন ‘সুলতানার স্বপ্ন’ আর কল্পকাহিনি থাকবে না, হয়ে উঠবে বাংলার গ্রামের বাস্তবতা।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
মন্তব্য করুন