
ডেস্ক রিপোর্ট: সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মূল উস্কানিদাতা ও মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকা থেকে পুলিশ ও এসআরবি যৌথ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে। এর আগে এই মামলার দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
মামলার এজাহার ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বচসায় জড়িয়ে গালিগালাজ করেন মানসিক রোগাক্রান্ত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি সেই কথাবার্তার অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। অডিওতে ধর্ম নিয়ে কটূক্তি রয়েছে দাবি করে স্থানীয় ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভ করে ‘তৌহিদী জনতা’কে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানান।
এরপর উত্তেজিত জনতা শামীমের বসতবাড়ির গেট ভাঙচুর করে তাকে বাজারে এনে মারধর করে। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে ফিরে তিনি বিষপান করেন। রাতে স্থানীয় কুলিয়া এলাকার এক গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে তার পাকস্থলী ওয়াশ করানোর পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে ফজলুল হক আমিনী ও তার অনুসারীরা চিকিৎসাধীন শামীমকে ওই চেম্বার থেকে বের করে আবারও গণপিটুনি দেয়।
খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। তবে হামলা থামেনি; আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি লোক হাসপাতালে গিয়ে হামলা চালায় এবং চিকিৎসাধীন শামীমকে দেয়ালে আছাড় মেরে বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শামীম হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করা হয়।
এদিকে, স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এর আগেও একের পর এক মব তৈরি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন ফজলুল হক আমিনী।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ তুলে মব সৃষ্টি করে পারুলিয়ার শহিদুল ইসলাম নামে এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। এখানেই ক্ষান্ত হননি তিনি; একই বছরের অক্টোবর মাসে সোহাগ হোসেন নামের আরেক যুবকের বাড়িতে মব তৈরি করে তাকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, পারুলিয়া ইউনিয়নের এক সদস্যের বিরুদ্ধেও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও গণপিটুনির মতো জঘন্য ঘটনা ঘটানো হয়। এসব ঘটনায় মূল নেতৃত্ব বা উস্কানিদাতা হিসেবে ফজলুল হক আমিনীর নামই বারবার উঠে এসেছে।
এই ঘটনায় মানবাধিকার কর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোনো ব্যক্তি কখনোই রাষ্ট্রের আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। ফজলুল হক আমিনী যে দুঃসাহস ও ঔদ্ধত্য দেখিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
মন্তব্য করুন