বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
৫ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

সুন্দরবনের ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছে আগামরা রোগ, বাড়ছে উদ্বেগ

ফরহাদ হোসেন, কয়রা (খুলনা): আগামরা রোগে আক্রান্ত সুন্দরবনের ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছ। সংখ্যার হিসাবে আক্রান্ত গাছের পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ। এর মধ্যে ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার গাছ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা পরিবেশগত চাপে সুন্দরী গাছের অস্তিত্ব এখন নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের কার্বন শোষণের সক্ষমতা ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সুন্দরবনের ভূমিকা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।

২০২৪-২৫ সালে সুন্দরবনের সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা নিয়ে পরিচালিত ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার বন ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ১০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনেও গবেষণার এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বিপুলসংখ্যক সুন্দরী গাছে রোগের বিস্তার
সুন্দরবনের পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বৃক্ষপ্রজাতির মধ্যে সুন্দরী অন্যতম। বনের বৃক্ষবিন্যাস, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ গাছের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরী গাছের ওপর প্রভাব ফেলছে আগামরা বা ‘টপ-ডাইং’ রোগ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে সুন্দরী গাছের সংখ্যা প্রায় ৩৩ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ গাছ এ রোগে আক্রান্ত।

এ রোগে আক্রান্ত গাছের প্রথমে ওপরের দিকের পাতা ও কচি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে ডালপালা ও শাখা-প্রশাখা শুকিয়ে যেতে থাকে। রোগের তীব্রতা বাড়লে গাছের মূল কাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একপর্যায়ে গাছটি মারা যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক সুন্দরী গাছ আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি শুধু বৃক্ষসম্পদের ক্ষতি নয়, বরং সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক।

গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামরা রোগের সামগ্রিক প্রকোপ আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও গুরুতরভাবে আক্রান্ত গাছের সংখ্যা বেড়েছে। অর্থাৎ রোগের বিস্তারে কিছুটা পরিবর্তন এলেও ক্ষতিগ্রস্ত গাছগুলোর অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।

লবণাক্ততা ও মিঠাপানির সংকটে বিপন্ন সুন্দরী
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরী গাছে আগামরা রোগের পেছনে একাধিক পরিবেশগত কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠাপানির প্রবাহ হ্রাস,সালোক সংশ্লেষন না হওয়া, পলি জমার ধরনে পরিবর্তন, জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় উচ্চ ও মাঝারি লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় সুন্দরী গাছের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

সুন্দরবনের নদী ও খাল দিয়ে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে মাটির লবণাক্ততার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। এতে লবণাক্ততা-সংবেদনশীল সুন্দরী গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকার পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং নদ-নদীর প্রবাহে পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোও সুন্দরবনের পরিবেশগত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।

সুন্দরবন একাডেমি খুলনার চেয়ারম্যান অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, পশ্চিম সুন্দরবনের কপোতাক্ষ, মাথাভাঙ্গা, ভৈরবসহ অন্যান্য নদীর নাব্যতা হারানোর কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। আগে এসব নদী দিয়ে উজান থেকে মিষ্টি পানি সুন্দরবনে প্রবেশ করত। এই মিষ্টি পানি ও লবণাক্ত পানির সংমিশ্রণে তৈরি হতো একধরনের পানি, যাকে ‘ব্র্যাকিশ ওয়াটার’ বলা হয়। এই পানির সঙ্গে উজান থেকে আসত বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান, যা সুন্দরী গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় উজানের মিষ্টি পানির প্রবাহ অনেকাংশে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সুন্দরবনে লবণাক্ত পানির প্রভাব বাড়ছে। একই সঙ্গে জোয়ারের পানির সঙ্গে আসা অতিরিক্ত লবণাক্ত পলি সুন্দরী গাছের গোড়ায় জমছে। এই পলিতে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকায় সুন্দরী গাছ পর্যাপ্ত খাদ্য সংগ্রহ করতে পারছে না। এ ছাড়া পলি জমে গাছের শ্বাসমূল ঢেকে যাওয়ায় শিকড়ের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ ও পুষ্টি উপাদান শোষণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এর ফলে গাছের শিকড় থেকে সংগৃহীত পানি ও পুষ্টি উপাদান সারা গাছে যথাযথভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। অন্যদিকে, পাতার মাধ্যমে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরির কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। একপর্যায়ে সুন্দরী গাছের পাতার রং বিবর্ণ হয়ে যায়, ডালপালা শুকাতে শুরু করে এবং গাছের বাকলও শুকিয়ে যেতে থাকে। এভাবে গাছ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল গাছে বিভিন্ন রোগজীবাণু, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। ধীরে ধীরে গাছের আগার অংশ শুকিয়ে মারা যাওয়ার এই প্রক্রিয়াই মূলত ‘আগামরা রোগ’ হিসেবে পরিচিত।

তিনি আরও বলেন, মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সুন্দরবনে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে সুন্দরী গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিপরীতে, লবণাক্ততা সহিষ্ণু গেওয়া, বাইন, কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বিস্তার বাড়ছে। এভাবে সুন্দরবনের উদ্ভিদবৈচিত্র্যে পরিবর্তন ঘটছে এবং সুন্দরী গাছ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।

কার্বন শোষণ কমায় বাড়ছে পরিবেশগত উদ্বেগ
সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ নয়, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে কার্বন সঞ্চয়ে সহায়তা করে। কিন্তু গবেষণায় সুন্দরবনের কার্বন শোষণের সক্ষমতা ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য উঠে আসায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সুন্দরী গাছের স্বাস্থ্যহানি, গাছের বৃদ্ধি ও পুনর্জন্মের পরিবর্তন এবং বনের সামগ্রিক প্রতিবেশগত অবস্থার অবনতি কার্বন সঞ্চয়ের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা আরও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ সুন্দরবনের পরিবেশগত সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

বদলে যেতে পারে বনের বৃক্ষবিন্যাস
সুন্দরী গাছের সংখ্যা, স্বাস্থ্য ও বিস্তারে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ঘটলে সুন্দরবনের সামগ্রিক বৃক্ষবিন্যাসে প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি বনের ওপর নির্ভরশীল বন্য প্রাণীর আবাসস্থল, খাদ্যশৃঙ্খল এবং অন্যান্য উদ্ভিদপ্রজাতির বিকাশেও পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে। কোথাও কোথাও সুন্দরীর পরিবর্তে অন্য প্রজাতির গাছের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ মোকাবিলায় প্রথমেই প্রয়োজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, রোগাক্রান্ত গাছের অবস্থা নিরূপণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা। একই সঙ্গে মাটির লবণাক্ততা, মিঠাপানির প্রবাহ, নদী-খালের নাব্যতা, পলি জমার ধরন ও প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের পরিবর্তন নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা জোরদার করা দরকার।

এ ছাড়া সুন্দরবনের প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, বন ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক তথ্যের ব্যবহার এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। রোগাক্রান্ত গাছের অবস্থা ও নতুন চারার বিকাশ নিয়মিত মূল্যায়ন করা গেলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হতে পারে।

সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের এই সংকট তাই শুধু একটি বৃক্ষপ্রজাতির রোগের বিষয় নয়,এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বনের পরিবেশগত স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে সুন্দরী গাছের ক্ষয় এবং বনের স্বাভাবিক পুনর্জন্মে পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কালিগঞ্জে দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে শাড়ি বিতরণ

১

সুন্দরবনের ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছে আগামরা রোগ, বাড়ছে উদ্বেগ

২

নাটোরে বাস-বালুবোঝাই ট্রাক সংঘর্ষে প্রাণ গেল ১৪ জনের 

৩

পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় মাঠে নীলডুমুর ১৭ বিজিবি

৪

দেবহাটায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনে আনসার-ভিডিপির কর্মকর্তারা

৫

সাতক্ষীরায় অনূর্ধ্ব-১৪, ১৬ ও ১৮ বয়সভিত্তিক ক্রিকেটার বাছাই ২৫ অক্টোবর

৬

কালিগঞ্জে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ

৭

ইশরাকের পদত্যাগ: বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কর্মীরা

৮

আশাশুনিতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে শাড়ি ও অনুদানের চেক বিতরণ

৯

পাইকগাছায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের শাড়ি বিতরণ

১০

মুন্সিগঞ্জে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে কৃষ্ণপদ পরমান্য

১১

তালায় পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে বিএনপি নেতা রেজাউল ইসলাম

১২

সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড: নজরুল-সুইটির সম্পর্ক নিয়ে যা জানালো পরিবার

১৩

৪০০ রানে ইতিহাস গড়লেন ভারতীয় ব্যাটার

১৪

পদত্যাগ করলেন ইশরাক

১৫

‎ফররুখ আহমদের কবিমানস ও বাঙালি মুসলিম নবজাগরণ || ‎তারিক ইসলাম

১৬

তালায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে শাড়ি ও নগদ অর্থ বিতরণ

১৭

লালনের আখড়াবাড়িতে টাইম বোমা, বিজিবি মোতায়েন

১৮

১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু

১৯

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ল ‘নিশি’

২০