বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
২৯ জুলাই ২০২৫, ২:৩২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

বাঘে খেয়েছে স্বামীকে, মর্যাদা কেড়েছে সমাজে

সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর

সুন্দরবন কেবল একটি বনই নয়, উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু জীবিকার সন্ধানে বাদায় গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন উপকূলের অসংখ্য মানুষ, পরিবার প্রধান। এতে বিধবা হয়েছে তাদের স্ত্রী । যাদেরকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘বাঘ-বিধবা’।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলে এমন হাজারো ‘বাঘ-বিধবা’ রয়েছেন, যাদের হিসাব নেই সরকারি খাতায়।

শ্যামনগর উপকূলের গাবুরা, মুন্সীগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালী, রমজাননগর, আটুলিয়াসহ উপকূলঘেঁষা গ্রামগুলোতে এমন শত শত নারী আছেন, যাদের অনেকের স্বামী সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের শিকার হয়েছেন, কেউবা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে।

এতে কোন ভূমিকা না থাকলেও এসব বিধবা নারীর কপালে জুটেছে অপয়া, অলক্ষ্মী, স্বামীখেকো আর ডাইনির মতো অপবাদ। তাদের জন্য নেই কোনো সহানুভূতি, সান্ত্বনা, কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জ জেলেপাড়ার আলোচিত নাম সোনামণি দাসী (৬৮)। তার জীবনের গল্পের প্রতিটি পাতা যেন বিষাদে ভরা। ১৯৯৯ সালে সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মারা যান তার প্রথম স্বামী রাধাকান্ত সরদার। সঙ্গীরা তার লাশও খুঁজে পাননি। স্বামী হারানোর শোকে যখন তিনি মুহ্যমান, তখন তার কোলে ছিল এক মাস বয়সী সন্তান। অথচ শাশুড়ি তাকে অপয়া অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। বাবার বাড়িতেও ঠাঁই হয়নি তার। অপমান আর চোখের অশ্রুকে সঙ্গী করে থাকতে হয়েছে দেবরের ঘরে। এরপর দেবর ভূবেন সরদারের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তখন কিছুটা আশার আলো দেখেছিলেন। কিন্তু ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার পরপরই ভূবেনও সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। তার লাশও পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয়বার বিধবা হয়ে সোনামণি অকুল পাথারে পড়েন। পেট চালাতে তিনি নিজেই কাজে নামেন। মাছ ধরেন, মানুষের বাড়িতে কাজ করেন, মাটি কাটেন। মেয়েদের বিয়ে দেন। এখন বয়সের ভারে এসব কাজ আর করতে পারেন না। বলেন, ‘এ জীবন তো মৃত্যুর মতোই। স্বামী বাঘের পেটে গেল, আমাকেও রেখে গেল মরার মতো।’

এখন তিনি স্থানীয় মুন্সীগঞ্জ বাজারে দোকানিদের ছোটখাটো কাজে সাহায্য করেন। বিনিময়ে মেলে সামান্য চাল-ডাল-পেঁয়াজ। বর্তমানে সংসার কীভাবে চলে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার আর সংসার! একলা জীবন! আগে গাঙে (নদীতে) জাল টেনে মাছ-কাঁকড়া ধরে, ঘেরে মাটি কাটার কাজ করে খেতাম। এখন আর শরীরে পেরে ওঠে না। তাই মুন্সীগঞ্জ বাজারে দোকানদারদের একটু কাজ করে দিই। তাতে তারা একটু ঝাল-পেঁয়াজ দেয়।’

সোনামণির অভিযোগ, সরকার থেকে তাকেসহ তার প্রতিবেশী আরও তিনজনকে কোনো সহযোগিতা করা হয়নি।

মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের জেলেপাড়ায় বাসিন্দা বলি দাশী। তার অবস্থাও সোনামণির মতো। ২০০২ সালে তার স্বামী অরুণ মণ্ডল বাঘের আক্রমণে মারা যান। তাকেও স্বামীর মৃত্যুর পর ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আমাকে শ্বাশুড়ি ঘর থেকে তাড়িয়ে দিল। ভাইয়ের বাড়িতে জায়গা পেলাম ঠিকই, কিন্তু সে জীবন বড় যন্ত্রণার। পরে নদীতে রেণুপোনা ধরে সন্তানদের বড় করেছি। আজও একই কাজ করে জীবন চালাই।’ তার দেবরও একইভাবে বাঘের আক্রমণের শিকার হন।

শুধু এ দুজনই নয়- শ্যামনগরের প্রতিটি গ্রামে এমন অনেক সোনামণিদের দেখা মেলে। একেকটি মুখ যেন একেকটি গল্প। তাদের সবার জীবন কাটছে অপবাদ আর দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে।

জানা গেছে, সাতক্ষীরা উপকূলের দেড় লক্ষাধিক মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু ২০০৯ সালে ১২০ জন বনজীবী মারা গেছেন বলে সরকারি হিসাবে বলা হলেও স্থানীয়রা বলছেন, এ সংখ্যা অনেক বেশি। অনেকে পাস ছাড়াই বা অন্যের নামে বনে যান, ফলে তাদের মৃত্যুর ঘটনা সরকারি খাতায় ওঠে না।

বেসরকারি সংস্থা লিডার্স জানিয়েছে, উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ১৬৩ জন ‘বাঘ-বিধবা’ আছেন। এর মধ্যে গাবুরায় ১০৯ জন, বুড়িগোয়ালিনীতে ৩৯ জন, মুন্সীগঞ্জে ১০৭ জন, রমজাননগরে ৪১ জনসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বাঘ-বিধবারা থাকেন। অন্যদিকে সরকারি হিসাবে স্বীকৃত ‘বাঘ-বিধবা’র সংখ্যা মাত্র সাতজন।

পীযুষ বাওয়ালিয়া পিন্টু। তিনি বাঘ-বিধবাদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তার মতে, আগে আহতদের ৫০ হাজার আর নিহতদের ক্ষতিপূরণ ১ লাখ টাকা ছিল। এখন সেটা ৩ লাখ হয়েছে। আহত হলে ১ লাখ। কিন্তু যারা অন্যের পাসে বা অবৈধভাবে বনে যান, তারা কোনো ক্ষতিপূরণ পান না।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. রনী খাতুন জানান, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় যেসব বাঘ-বিধবা আছেন তাদের ভাতার ব্যাপারে আগে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। ইতোমধ্যে তাদের ১৭ জন বাঘ বিধবাকে সুপেয় পানি নিশ্চিতে ৩ হাজার লিটারের পানির ট্যাংকি দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও সরকারের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসন তাদের পুনর্বাসনে উদ্যোগ নেবে। তা ছাড়া কিছু এনজিও তাদের নিয়ে কাজ করছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

একই জায়গায় আটকে থাকতে চাই না

চলন্ত স্লিপার বাসে আগুন, ঘুমের মধ্যেই পুড়ে মরল ৯ যাত্রী

বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তি

এশিয়ান গেমসে শ্রীলঙ্কাকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিল বাংলাদেশ

বিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বিশ্ব গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

দুপুরের মধ্যে ১১ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির আভাস

আশাশুনির নয়াবাদে স্বামীর নির্মম নির্যাতনে হাসপাতালে স্ত্রী

কালিগঞ্জ সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভা

কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভূমি অফিস পরিদর্শনে এমপি রবিউল বাশার

ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ

১০

পাইকগাছায় কৃষকদলের বিক্ষোভ মিছিল

১১

কালিগঞ্জে যুবদলের আনন্দ মিছিল

১২

চাঁদা না পেয়ে নির্মাণাধীন বাড়ি ভাঙচুর ও মারপিটের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

১৩

সাতক্ষীরায় এবি পার্টির কমিটি গঠন: আহ্বায়ক শাকিল, সদস্য সচিব শাহীন

১৪

সাতক্ষীরা জেলা শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদের কমিটি গঠন: সভাপতি রাসেল, সম্পাদক গাজী বাবু

১৫

গাছের ডালে ঝুলছিল ১১ ফুটের অজগর, উদ্ধারের পর সুন্দরবনে অবমুক্ত

১৬

৬ লাখ মানুষের জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম চান সাতক্ষীরার যুবরা

১৭

দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে সাতক্ষীরায় স্বেচ্ছাসেবক দলের বিক্ষোভ মিছিল

১৮

সাতক্ষীরায় মানবাধিকার সাংবাদিক নেটওয়ার্ক’র সভা

১৯

দেবহাটায় যুবদলের আনন্দ মিছিল

২০