
শ্যামনগর প্রতিনিধি: ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয়ে যায় কাজ। মাটির ঘ্রাণে ভরে ওঠা ছোট্ট কর্মশালা। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একের পর এক প্রতিমা। কারও হাতে রঙ, কারও তুলিতে দেবীর চোখ—সবাই ব্যস্ত, অথচ মুখে এক ধরনের শান্ত তৃপ্তি।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিদ্যার দেবী সরস্বতী পূজার আর মাত্র একদিন বাকি। দেবীর আগমনে প্রস্তুতির শেষ ব্যস্ততায় দিন-রাত এক করে কাজ করছেন শ্যামনগরের মৃৎশিল্পীরা।
শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, প্রতিমার কাঠামো তৈরি ও মাটি শুকানোর কাজ শেষ। এখন চলছে রঙ করা, অলঙ্করণ আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব—চোখ আঁকা। মৃৎশিল্পীরা একে বলেন ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’। চোখ আঁকার সময় চারপাশে নেমে আসে এক ধরনের নীরবতা। ভুলের কোনো সুযোগ নেই। এক ফোঁটা এদিক-ওদিক হলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে পুরো প্রতিমা।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে শ্যামনগর পৌরসভার বাদঘাটা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মৃৎশিল্পী সুনীল চক্রবর্তী ও কালীদাস মন্ডল সরস্বতী প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজে ব্যস্ত।
এ সময় মৃৎশিল্পী সুনীল চক্রবর্তী তুলির আঁচড় থামিয়ে বলেন, ‘চোখ আঁকার সময় মনটা খুব স্থির রাখতে হয়। এই চোখেই তো দেবীর প্রাণ। আমরা বিশ্বাস করি, এই কাজটা ঠিকঠাক হলে পূজাটাও সুন্দর হয়।’
তার পাশেই বসে অলঙ্করণে ব্যস্ত কালীদাস মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘আগের মতো সহজ নেই কাজ। মাটির দাম বেড়েছে, রং-তুলির খরচ বেড়েছে, শ্রমিকও পাওয়া যায় না। তবুও সরস্বতী পূজার কথা ভেবে সব কষ্ট ভুলে কাজ করি।’
সরস্বতী পূজা মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক হলেও এর প্রস্তুতির বড় একটি দায়িত্ব এই মৃৎশিল্পীদের কাঁধেই। আগামী ২৩ জানুয়ারি বিদ্যার দেবীর আরাধনা হবে। সেই উৎসবের নেপথ্যের কারিগররা এখনো আলো-হাওয়া ভুলে মাটির সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন।
এদিকে, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা জানাচ্ছেন, প্রতিমা স্থাপন, মণ্ডপ সাজানো ও নিরাপত্তাসহ সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ। ছাত্রছাত্রীদের মাঝে নতুন বই, খাতা আর আশীর্বাদের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে আনন্দের অপেক্ষা।
মৃৎশিল্পীদের কর্মশালায় সন্ধ্যা নামলেও আলো জ্বলে থাকে। প্রতিমার চোখে ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে আসে, রঙে রঙে ফুটে ওঠে বিদ্যার দেবীর স্নিগ্ধ রূপ। হয়তো পূজার দিন কেউ আর খোঁজ নেবে না তাদের। তবুও মাটির মানুষগুলো জানেন—এই মাটির হাত ধরেই আসে জ্ঞান, আসে উৎসব, আসে আনন্দ।

মন্তব্য করুন