
আধুনিক শহুরে জীবনে প্লাস্টিকের টুথব্রাশ আর রাসায়নিক উপকরণের টুথপেস্ট আমাদের দৈনিক চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সকালে উঠে কয়েক মিনিট ব্রাশ ঘষে আমরা ভাবি, মুখের স্বাস্থ্যের বুঝি ষোলো আনা যত্ন হয়ে গেল। কিন্তু এই কৃত্রিম উপকরণের ভিড়ে আমরা কি ভুলে যাচ্ছি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী, পরিবেশবান্ধব এবং অত্যন্ত কার্যকর প্রাকৃতিক দাঁতন—নিমের ডাল? গ্রামের মেঠো পথে বা শহরের পুরোনো কোনো পাড়ায় সকালে হাতমুখ ধোয়ার সময় নিমের ডাল চিবিয়ে দাঁত মাজার যে দৃশ্য একসময় নিত্যদিনের অংশ ছিল, তা যেন আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ আধুনিক দন্তবিজ্ঞান ও পরিবেশ ভাবনা- উভয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নিমের ডালের পুনর্ব্যবহার এখন সময়ের অন্যতম দাবি।
আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসাশাস্ত্রে নিমকে বলা হয় ‘সর্বরোগ নিবারিণী’ বা সব রোগের পথ্য। আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে মুখগহ্বরের পরিচ্ছন্নতা ও রোগ প্রতিরোধে নিমের ডাল বা ‘দন্তকাষ্ঠ’ ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ছোটখাটো একটি নিম ডালের পেছনে কোনো বিশাল বিপণন কোম্পানির বিজ্ঞাপনী চমক নেই, কিন্তু এর স্বাস্থ্যগুণ কোনো দামি কেমিক্যালযুক্ত টুথপেস্টের চেয়ে কম নয়।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও নিমের কার্যকারিতা আজ প্রমাণিত। নিমের ডালে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান। মুখের ভেতরে যেসব ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দাঁতের ক্ষয় (ক্যাভিটি), মাড়ির রক্তপাত এবং দুর্গন্ধের জন্য দায়ী, নিমের নির্যাস সেগুলোকে ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকর। নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজার সময় যে প্রাকৃতিক কষ বা রস নিঃসৃত হয়, তা মুখের পিএইচ (pH) মাত্রা ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে, নিমের ডাল চিবিয়ে যে তন্তু বা ব্রাশের মতো মাথা তৈরি করা হয়, তা মৃদুভাবে দাঁতের এনামেল ক্ষতি না করেই প্লাক (Plaque) পরিষ্কার করে এবং মাড়িতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়, যা মাড়িকে করে আরও মজবুত।
স্বাস্থ্যগত সুবিধার পাশাপাশি নিমের ডাল ব্যবহারের বড় একটি দিক হলো এটি পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব। আমরা প্রতিদিন যে প্লাস্টিকের টুথব্রাশ ব্যবহার করি, তা বহু বছর ধরে মাটিতে পচে না এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের বিশাল পাহাড় তৈরি করে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা থেকে শুরু করে পরিবেশের নানা ক্ষতিতে অবদান রাখে আমাদের প্রতিদিনের ছুড়ে ফেলা এই প্লাস্টিক ব্রাশ। অন্যদিকে, নিমের ডাল শতভাগ জৈব উপাদান (Biodegradable)। এটি মাটি থেকে আসে এবং ব্যবহারের পর মাটিতেই মিশে যায়, পরিবেশের ওপর বিন্দুমাত্র ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না।
অবশ্যই, আধুনিক ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন তাজা নিমডাল সংগ্রহ করা কিংবা তা চিবিয়ে ব্রাশ তৈরি করা সবার জন্য সহজ না-ও হতে পারে। তবে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এনে অন্তত সপ্তাহে দু-একদিন বা ছুটির দিনে নিমের ডাল ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। শহুরে কাঁচাবাজারগুলোতে কিংবা নিজেদের বারান্দা বা ছাদের বাগানে ছোট একটি নিম গাছ লাগিয়ে সহজেই আমরা এই অমূল্য উপাদান পেতে পারি।
প্রকৃতির সান্নিধ্যে ফিরে যাওয়ার যে বৈশ্বিক আন্দোলন শুরু হয়েছে, তাতে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য নিমের ডাল এক অনন্য উদাহরণ হতে পারে। কৃত্রিমতার মোড়ক ছেড়ে আসুন আমাদের শিকড় ও প্রাকৃতিক চিকিৎসাপদ্ধতির দিকে আরেকবার ফিরে তাকাই। মুখের সুস্থতা, পকেটের সাশ্রয় এবং পরিবেশ সুরক্ষা—সবকিছুর সমাধান লুকিয়ে থাকতে পারে বাড়ির কাছের ওই সাধারণ নিমগাছের ছোট্ট একটি ডালেই।
তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি
মন্তব্য করুন