
‘সমাজকে জানতে হলে জানতে হবে মানুষের গল্প, আর সেই গল্পের বৈজ্ঞানিক পাঠই সমাজবিজ্ঞান।’
আমরা সমাজে বাস করি, কিন্তু সমাজকে কতটা বুঝি? কেন একজন মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে? কেন দারিদ্র্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকে? কেন নারীরা এখনও নানা বৈষম্যের শিকার? কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের আচরণ, সম্পর্ক ও মূল্যবোধকে বদলে দিচ্ছে? আবার কেন জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী মানুষই এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সমাজকে বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে হবে, আর সেই পথের নামই সমাজবিজ্ঞান।
সমাজবিজ্ঞান হলো মানুষ, সমাজ, সামাজিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন। এটি শুধু সমাজের ঘটনাগুলো বর্ণনা করে না; বরং সেসব ঘটনার অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান করে, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এবং সম্ভাব্য সমাধানের পথ নির্দেশ করে। সহজ ভাষায়, সমাজবিজ্ঞান আমাদের শেখায় মানুষ কেন নির্দিষ্ট আচরণ করে, সমাজ কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং কীভাবে একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা যায়।
যদিও সমাজবিজ্ঞান আধুনিক একটি শাস্ত্র, এর বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি প্রাচীন গ্রিসের দর্শনে নিহিত। প্লেটো ও এরিস্টটল সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছিলেন। তবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় উনবিংশ শতকে।
১৮৩৯ সালে ফরাসি দার্শনিক অগুস্ত কোঁত প্রথম ‘Sociology’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং সমাজকে বৈজ্ঞানিকভাবে অধ্যয়নের ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। এজন্য তাঁকে সমাজবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। পরবর্তীতে এমিল দুর্খেইম, কার্ল মার্ক্স ও ম্যাক্স ভেবার সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে আরও সমৃদ্ধ করেন। বাংলাদেশে ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনেস্কোর যৌথ উদ্যোগে অধ্যাপক ড. নাজমুল করিমের নেতৃত্বে সমাজবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণার যাত্রা শুরু হয়।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন, নগরায়ণ, অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এসব পরিবর্তনকে শুধু দেখলেই হবে না; এর সামাজিক প্রভাব, কারণ ও ভবিষ্যৎ পরিণতি বুঝতে হবে। আর এ ক্ষেত্রেই সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রও দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সমাজবিজ্ঞানীদের কাজের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া নীতিনির্ধারণ, সামাজিক গবেষণা, গণমাধ্যম, কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও সমাজবিজ্ঞানীদের চাহিদা বাড়ছে। দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও এ বিষয়ের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্ব আজ টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। কিন্তু উন্নয়ন কেবল রাস্তা, সেতু বা ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; উন্নয়নের মূল কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ। মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, চাহিদা, সংকট ও সম্ভাবনাকে না বুঝে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। সমাজবিজ্ঞান সেই বোঝাপড়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমান বিশ্বে নতুন নতুন সমস্যা সমাধানে সমাজবিজ্ঞানীদের বিকল্প নেই।
তাই সমাজ বিজ্ঞান এখন শুধু একটি ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজকে যারা গভীরভাবে জানতে, মানুষের জন্য কাজ করতে, গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনে অবদান রাখতে চান, তাদের জন্য সমাজবিজ্ঞান একটি সময়োপযোগী, সম্ভাবনাময় ও মর্যাদাপূর্ণ বিষয়।
সমাজকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার শিক্ষা, মানুষের জীবনকে গভীরভাবে অনুধাবনের অনুশীলন এবং পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যে সমাজকে বুঝতে পারে, সে-ই সমাজ পরিবর্তনের পথও দেখাতে পারে।
মোঃ নাহিদ সায়াদাত ফুয়াদ, শিক্ষার্থী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগ
মন্তব্য করুন