
সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: কখনো শিশুদের সাঁতার শেখানো, কখনো খাবার পানির পিএসএফ পরিষ্কারে, কখনো নদীর জরাজীর্ণ বাঁধ মেরামতে, কখনোবা গাছের চারা রোপণ- এভাবেই দিন কাটে শ্যামনগর পৌরসভার যাদবপুর গ্রামের শেখ কামরুজ্জামানের (৩০)।
কোনো প্রচার-প্রচারণা নেই, নেই নিজের কাজের বিনিময়ে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশাও। পরিবেশ রক্ষা, শিশুদের বিকাশ আর মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো- এই তিনটিকেই নিজের কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।
কৃষক বাবা শেখ হোসেন আলীর সন্তান কামরুজ্জামানের পড়াশোনা থেমে যায় এইচএসসি পাসের পরই। আর্থিক সংকটের কারণে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। ছোটবেলা থেকেই দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশসেবার স্বপ্ন, কিন্তু তা পূরণ হয়নি। তবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে নিজের মতো করে সেই স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
স্কুলজীবন থেকেই ছোটখাটো সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত ছিলেন কামরুজ্জামান। কখনো রাস্তা মেরামতে শ্রম দিয়েছেন, কখনো ফসল রক্ষায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আবার কখনো পাখি শিকার বন্ধে সচেতনতা তৈরি করেছেন। ২০০৬ সালের শেষ দিকে এক বন্ধুর বাড়িতে টেলিভিশনে সামাজিক উন্নয়নমূলক একটি অনুষ্ঠান দেখার পর তাঁর কাজে নতুন গতি আসে। এরপর নিজের গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে আশপাশের এলাকায়ও স্বেচ্ছাশ্রমে নানা কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন অন্য তরুণেরাও।
গাছ লাগানোর কাজটাও শুরু করেছিলেন সামর্থের সীমাবদ্ধতা মেনে। গাছ কেনার টাকা ছিল না। তাই বিভিন্ন জায়গা থেকে ঝরে পড়া আম, কাঁঠাল, তাল, খেজুর, নিম, বাবলাসহ নানা গাছের বীজ কুড়িয়ে আনতেন। সেসব বীজ রাস্তার ধারে, নদীর পাড়ে ও পতিত জমিতে রোপণ করতেন। কামরুজ্জামানের দাবি, গত চার বছরে এভাবে ৩০ হাজারের বেশি বীজ ও চারা রোপণ করেছেন তিনি।
তবে সব গাছ টেকেনি। গবাদিপশুতে অনেক চারা নষ্ট করেছে। মানুষের কটূক্তিও শুনতে হয়েছে। তবু থামেননি তিনি। তাঁর বিশ্বাস, আজকের একটি বীজ একদিন বড় গাছ হবে, ফল দেবে, পাখির খাদ্য হবে, পথিককে ছায়া দেবে।
শুধু নিজের হাতে গাছ লাগিয়েই থেমে থাকেন না কামরুজ্জামান। শিশুদের হাতে ফলজ গাছের চারা তুলে দেন। সাইকেলে চলাচল করে সাশ্রয় করা অর্থ দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বরেও গাছ লাগান। তাঁর লক্ষ্য, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করা।
শিশুদের নিয়ে তাঁর আরেকটি ভাবনা মোবাইল ফোনের অপব্যবহার থেকে বিরত রাখা। শিশুদের মাঠে ফেরাতে নিয়মিত খেলাধুলা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের আয়োজন করেন তিনি। ঈদ ও রমজান উপলক্ষে নামাজ শিক্ষা, টুপি বিতরণ, শিশুশ্রমবিরোধী প্রচারণা ও বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচিতেও যুক্ত থাকেন।
উপকূলীয় এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনাও ভাবায় তাঁকে। তাই শিশুদের সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর উদ্দেশ্য, অন্তত বিপদের মুহূর্তে শিশুরা যেন নিজেদের রক্ষা করতে পারে। কামরুজ্জামানের কাজ শুধু গাছ লাগানো কিংবা শিশুদের নিয়ে কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোথাও বাঁশের সাঁকো না থাকলে সেটি নির্মাণে শ্রম দেন। নদীর বাঁধ ভেঙে গেলে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মেরামতের কাজে অংশ নেন। জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল থেকে অবৈধ নেট অপসারণ, স্লুইচগেট সংস্কারের দাবিতে আবেদন এবং সুপেয় পানির উৎস পরিষ্কার রাখার কাজেও যুক্ত থাকেন।
নদী রক্ষা, প্লাস্টিক দূষণ কমানো এবং যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখার লক্ষ্যেও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালান তিনি।
শুরুর দিকে তাঁর এসব কাজ নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করেছেন। কেউ তাঁকে ‘পাগল’ বলেছেন, কেউ জানতে চেয়েছেন- এসব করে তিনি কী পান? কামরুজ্জামান অবশ্য এসব কথায় থামেননি। বরং কাজের মধ্য দিয়েই উত্তর দিয়েছেন। তাঁর কাজ দেখে এখন অনেকেই বীজ সংগ্রহ ও বৃক্ষরোপণে আগ্রহী হয়েছেন। এটিকেই নিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন তিনি।
কামরুজ্জামান বলেন, সমাজের জন্য কাজ করতে বড় কোনো পরিচয় বা পদ দরকার হয় না। প্রত্যেকে নিজের সামর্থ অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ালেই অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমি যতদিন পারি, মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই।
উপকূলজুড়ে সামাজিক বনভূমি গড়ে তোলা, পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাই এখন তাঁর স্বপ্ন। নিজের এলাকা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই কাজ ছড়িয়ে দিতে চান তিনি।
শ্যামনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থ বা প্রচারের প্রত্যাশা ছাড়াই পরিবেশ সংরক্ষণ, শিশুদের বিকাশ ও সামাজিক কল্যাণে কামরুজ্জামানের কাজ প্রশংসনীয়। তাঁর মতো তরুণেরা এগিয়ে এলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
মন্তব্য করুন