
সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: সুন্দরবন সংলগ্ন চুনকুড়ি নদীর দুইপাড়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ইতোমধ্যে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের হরিনগর স্লুইসগেট সংলগ্ন ঋষিপাড়া এলাকার একটি বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনের কারণে হুমকিতে রয়েছে আরো কয়েকটি বসতবাড়ি। ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হরিনগর বাজারসহ বিস্তীর্ণ জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশংকা করছেন গ্রামবাসী।
স্থানীয়রা জানান, মালঞ্চ ও চুনকুড়ি নদীর মিলনস্থল হরিনগর বাজারের স্লুইসগেট সংলগ্ন এলাকায় তীব্র স্রোতের কারণে নদী তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ঝুঁকিতে রয়েছে হরিনগর বাজারের শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের হরিনগরের ঋষিপাড়া এলাকায় নদী তীরের মানুষ ঘরবাড়ি ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ নদীতীরে বাঁশ ও গাছ দিয়ে বাঁধ তৈরি করে বসতবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করছেন। ভাঙনের ঝুঁকি থাকায় আশপাশের লোকজন তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসহ সেখানকার বাসিন্দারা বসতভিটা ভেঙে নিয়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন।
এছাড়াও ভাঙন কবলিত ওই এলাকার মানুষ সহায় সম্বল হারিয়ে চরম সংকটের মধ্যে পড়েছেন। নদীর এমন ভয়াল রূপে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন স্থানীরা। পরিবারগুলো নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, দুই সপ্তাহে এই চুনকুড়ি নদীর দুটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়; কিন্তু এখনো স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হরিনগরের ঋষিপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দা হামিদা খাতুন ঘরের কিছু জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, গত ৪০ বছর যাবত তার পরিবার এই চুনকুড়ি নদীর তীরে বসবাস করে আসছে। প্রায়ই নদী ভাঙ্গনের শিকার হন তারা। দুই সপ্তাহ আগে তাদের ঘর সংলগ্ন এলাকায় ফাটল দেখা দেয়। আস্তে আস্তে সেটি বড় আকার ধারণ করেছে। একটি ঘরও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রাতে বাড়িতে থাকতে পারেন না তারা। জোয়ারের পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ভাঙন শুরু হয়। তাদের আশপাশে আরও তিনটি পরিবারের বাড়ি ও বেশ কিছু গাছের বাগান ছিল। হঠাৎ বাড়িঘরের সঙ্গে নদীভাঙনে গাছপালাও বিলীন হয়ে গেছে। তার ঘরের বেশির ভাগ অংশ নদীতে চলে গেছে। যেকোনো সময় পুরো বাড়ি নদীতে চলে যেতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।
একই গ্রামের নেসার গাজী বলেন, হঠাৎ ভাঙনের শিকার হয়ে পরিবারগুলো বাজারের মানুষের দোকানের বারান্দায় আশ্রয় নিচ্ছেন। তাদের অনেক দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে; কিন্তু এখানে স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাই মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে চারটি পরিবারের মানুষ গৃহহারা হয়েছেন। চোখের সামনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে গেছে। তারা কিছুই করতে পারছেন না। তাদের যেন দেখার যেন কেউ নেই।
চনকুড়ি নদীর তীর ঘেষে বসবাস করছেন বাক্কার গাজী, বিল্লাল গাজীসহ অনেকে। তারা জানান, তারা বাঁশ-গাছ দিয়ে ছোট ছোট বাঁধ নির্মাণ করে নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করছেন কিন্তু কিছুতেই তা টিকছে না।
তারা আরও বলেন, আমরা গরীব মানুষ, কয়েকবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছি। আবার নদীতে বসত ঘরটা ভাঙলে কোথায় আশ্রয় নিবো, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এখানকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ জেলে ও কৃষক। তাদের অনেককের নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য নেই।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেকশন অফিসার প্রিন্স রেজা বলেন, হরিনগরের স্লুইসগেট সংলগ্ন ঋষিপাড়া এলাকায় নদীভাঙনের ওই স্থান পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছাঃ রনী খাতুন বলেন, খবর পেয়ে শুক্রবার সকালে পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। হরিনগর স্লুইসগেট সংলগ্ন ঋষিপাড়া এলাকায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে একটি পরিবারের বসতঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ওই স্থানের চারটি পরিবারকে সরিয়ে একটি নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেছি। এছাড়াও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুতই ভাঙ্গন রোধে কাজ করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
মন্তব্য করুন