বাংলাদেশ, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭:৫৬ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

সাতক্ষীরা-৪: নির্বাচন আসে যায়, গোলাখালী দ্বীপ থাকে একই তিমিরেই

 

সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: ‘গোলাখালী’। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপের সঙ্গে সড়কপথে কোনো যোগাযোগ নেই। চুনা, মাদার আর কালিন্দী নদী ঘেরা এই দ্বীপে ৭৮টি পরিবারের বসবাস।

উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের এই দ্বীপের মৌলিক সংকট- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। দ্বীপে বসবাসকারী ভোটারদের কাছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধানই এখন মূখ্য হয়ে উঠেছে। সারা দেশের মতো এ গ্রামের মানুষের ভোট নিয়ে আগ্রহ থাকলেও শনিবার পর্যন্ত গ্রামটিতে যাননি কোনো প্রার্থী।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে কথা হয় গোলাখালী দ্বীপে বসবাসকারী জামের আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, এত বড় একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। অথচ কোনো প্রার্থী খবর নিতে দ্বীপে আসেননি। আমাদের সমস্যার কথা শোনেননি। এবার নির্বাচনের প্রার্থীদের পক্ষের লোকজন আসলেও কোনো প্রার্থীকে আমরা কাছে পাইনি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্যামনগরের রমজাননগর ইউনিয়নের গোলাখিলী এলাকায় বিএনপির প্রার্থী ড. মোঃ মনিরুজ্জামান ও জামায়াতের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলামের কয়েকটি ব্যানার ঝুলছে। এর বাইরে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মোস্তফা আল মামুন ও জাতীয় পার্টির আব্দুর রশিদের কোনো ব্যানার বা ফেস্টুনও দেখা যায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

প্রার্থী না আসার আক্ষেপ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। জানতে চাইলে জামের আলী বলেন, আমরা দ্বীপের মানুষ। তাই কেউ আমাদের ভোটার হিসেবে গোনে না। তিনি বলেন, কোনো প্রার্থী আসতে না পারলেও এখানে তাঁদের প্রতিনিধিরা এসেছেন। তাঁরা সমস্যার কথা শুনেছেন। আমাদের মূল সমস্যা আশ্রয় কেন্দ্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা।

জানা যায়, প্রায় ৪০ বছর আগে এই দ্বীপে জনবসতি শুরু হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য দ্বীপের ২২ বিঘা জমি বিক্রি করে দেন। ওই জমি কিনে এখানে বসতি শুরু করেন তারা।

স্থানীয় ভোটাররা জানান, প্রতিটি নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা দ্বীপে আসেন, আশ্বাস দেন কিন্তু ভোট শেষ হলেই গোলাখালী উন্নয়নের তালিকার পেছনে পড়ে যায়।

গোলাখালীতে লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। অধিকাংশ নলকূপ অচল, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণই ভরসা। নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রার্থীরা সুপেয় পানির প্রকল্পের কথা বললেও বাস্তবায়ন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।

দ্বীপের প্রবীণ বাসিন্দা আবিয়ার শেখ বলেন, দ্বীপে বাঁধ আছে, ঘর আছে, কিন্তু সুপেয় পানি নেই। লবণাক্ত পানি খেয়ে আমাদের বাঁচতে হচ্ছে। নির্বাচন এলেই সবাই কথা দেয়, কিন্তু ভোটের পর আর কেউ খোঁজ নেয় না।

নির্বাচনী আলোচনায় শিক্ষাব্যবস্থাও বড় ইস্যু। দ্বীপে নেই কোনো বিদ্যালয়। নেই স্বাস্থ্য কেন্দ্র। দ্বীপের ছেলে-মেয়েরা প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে লেখাপড়ায় অনেকটা পিছিয়ে। এখানকার অনেক ছেলে-মেয়েকে নদীপথে ১১ কিলোমিটার দূরে কালিঞ্চি গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে লেখাপড়া করতে হয়। পড়াশোনার জন্য নদী পাড়ি দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়মুখী হতে পারছে না।

অভিভাবকরা বলছেন, যে প্রার্থী শিক্ষা অবকাঠামো ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে পারবে, তার দিকেই তাদের ভোট যাবে।

দ্বীপে বসবাসকারী কৃষক মুজিবুর গাজী বলেন, আমাগা (আমাদের) এই দ্বীপি (দ্বীপে) কোনো স্কুল নি (নেই), বাজার নি (নেই), নি (নেই) হাসপাতাল। আমাগা (আমাদের) ছেলে-পিলেদের (ছেলে-মেয়েদের) ১০-১১ কিলোমিটার নদীপথ পাউড়ি (পাড়ি) দিয়ে পোড়াশুনো (পড়াশোনা) কত্তি (করতে) হয়। ঝুঁকির জন্নি (কারণে) অনেকেই পোড়াশুনা (পড়াশোনা) ছ্যাইড়ে (ছেড়ে) দেয়। এবার ভোট দেওয়ার সময় এসব বিষয়ই আমরা আগে দিকে (দেখে) ভোট দেব।

গৃহিণী ছকিনা খাতুন বলেন, প্রত্যেকবার (প্রতিবার) শুনি উন্নয়ন হবে, কিন্তু বাস্তবে কিচ্ছু (কিছুই) হয় না। আমার সন্তানকে নদী পার কুরে (করে) স্কুলে পাঠাতে গিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতি (থাকতে) হয়। নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা আর একটি স্কুল আমাগো (আমাদের) সবচিয়ে (সবচেয়ে) বড় দাবি।

স্বাস্থ্যসেবার অভাবও নির্বাচনী বিতর্কে গুরুত্ব পাচ্ছে। গোলাখালীতে কোনো স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় সাধারণ অসুস্থতাও বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জরুরি রোগী, প্রসূতি নারী ও শিশুদের নিয়ে রাত-বিরাতে নদী পার হওয়ার অভিজ্ঞতা ভোটারদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। তারা নির্বাচনী ইশতেহারে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জরুরি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার স্পষ্ট অঙ্গীকার চান।

দ্বীপের বসবাসকারী গৃহিণী আয়শা বেগম বলেন, পানি আর চিকিৎসা আমাগা (আমাদের) সবথিকে (সবচেয়ে) বড় সমস্যা। অসুখ হলে মদ্দিরাত্রি (মাঝরাতে) নৌকায় কুরে (করে) নদী পার হতি (হতে) হয়। পোয়াতি বৌ-মেয়েগা জন্নি (গর্ভবতী মেয়েদের জন্য) ভয় লাগে। আমরা চাই, যে প্রার্থী এই সমস্যাগুলোর সমাধান করবে, তাকেই ভোট দেব।

এছাড়াও স্থানীয়দের ভাষ্য, গোলাখালীর মানুষ এবার আবেগে নয়, হিসাব করে ভোট দিতে চায়। দল নয়, কে বাস্তব সমস্যার সমাধান করবে—সেই বিবেচনায় ভোট দেওয়ার মনোভাব তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক ও সমাজকর্মীদের মতে, উপকূলীয় ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলের মতো এলাকাগুলোর সমস্যা নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পেলে সেটি শুধু ভোটের ফলাফলই নয়, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

সব মিলিয়ে, গোলাখালী দ্বীপের ভোটারদের কাছে এবারের নির্বাচন ক্ষমতার পালাবদলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব সুপেয় পানির সংকট সমাধানের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক নাগরিক অধিকার আদায়ের এক নির্ণায়ক মুহূর্ত।

এ প্রসঙ্গে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চল শ্যামনগরের জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। উপকূলে বসবাসরত মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিরসনে পরিকল্পিতভাবে সার্বিক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন করা হবে।

এছাড়া এলাকার সাড়ে চার লক্ষ জনগণের জন্য শ্যামনগরে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা নেই উল্লেখ করে বলেন, আগামীতে নির্বাচিত হলে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। একইসঙ্গে যুগান্তকারী উন্নয়ন, সংস্কার এবং নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও উপকূলীয় গাবুরা ও পদ্মপুকুরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও সুপেয় পানি সংকট নিরসনসহ জনগণের মৌলিক অধিকারসমূহ যথাযথভাবে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

বিএনপির প্রার্থী ড. মোঃ মনিরুজ্জামানের ভাষ্য, শ্যামনগর একটি উপকূলবর্তী এলাকা এবং এখানে সাতটি ইউনিয়ন অত্যন্ত দুর্যোগ প্রবণ এলাকা। এখানকার মানুষের প্রাণের দাবি টেকসেই বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানি, চিকিৎসা সেবাসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। নির্বাচিত হলে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে এলাকার উন্নয়ন করব ইনশাল্লাহ।

এছাড়াও তিনি নির্বাচিত হলে সুন্দরবনকে বিশ্বমানের পর্যটন শিল্পে পরিণত করবেন। পাশাপাশি এলাকার তরুণ সমাজের আয় বাড়াতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে চান। এ জন্য এই জনপদকে তিন বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক জোনে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা, আবেদন যেভাবে

১

নতুন দায়িত্বে ৬ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী

২

মাদক ইভটিজিং জুয়া ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

৩

পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ অনুষ্ঠানে প্রত্যাশা: বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় এগিয়ে যাক হৃদয় বার্তা

৪

এনসিপিতে যোগ দিতে যাওয়া ফারজানা আমার স্ত্রী নন: রনি

৫

‘ডিসেম্বরেই মালয়েশিয়ায় বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ফ্লাইট শুরু’

৬

ডা. এম আর খানের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

৭

৭ নভেম্বর দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি

৮

ঢাবিতে ভর্তি আবেদন শুরু ১১ নভেম্বর

৯

সাংবাদিকদের সঙ্গে কুশুলিয়ার জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী সিরাজুলের মতবিনিময়

১০

ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা

১১

কালিগঞ্জে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন

১২

চুলে নজরকাড়া সাজ, পূর্ণিমা যেন অষ্টাদশী তরুণী!

১৩

৭ নভেম্বরকে সামনে রেখে কালিগঞ্জে কৃষকদলের প্রস্তুতি সভা

১৪

পারুলিয়ায় শিশু পাচার ও শোষণ প্রতিরোধে সভা

১৫

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তায় সামরিক সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার

১৬

এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন

১৭

২৪ সিনেমার ১৯টিতে ফ্লপ পরীমনি, ৫টিতে গড়পড়তা

১৮

সাংবাদিকের ফোন কেড়েছেন, ট্রাইপড ভেঙেছেন পরীমনি

১৯

অতিরিক্ত সময়ে ২ গোল হজম করেও পাকিস্তানকে হারাল ভারত

২০