বাংলাদেশ, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৫ জুন ২০২৬, ৮:১৬ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

পরিবেশ বিপর্যয় ও সংকটের গল্পগুলো তুলে ধরতে আমরা কেন ব্যর্থ হচ্ছি || আশিকুজ্জামান

প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় এই দিনটি কেবল গাছ লাগানোর অনুষ্ঠান, পোস্টার লাগানো বা প্রতীকী কিছু কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ফলে পরিবেশ সংকটের মূল কারণ ও সমাধান নিয়ে গভীর আলোচনা অনেক সময়ই অনুপস্থিত থাকে।

বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ সমস্যা শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বিষয় নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, নদী দূষণ, বায়ুদূষণ এবং ভূমিক্ষয় এসব একসাথে মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে উপকূলীয় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যদিও এই সংকট সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা সবচেয়ে কম।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং মানবসৃষ্ট পরিবেশ দূষণই আজকের এই অপূরণীয় ক্ষতির জন্য দায়ী। এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠার যে ফান্ড গঠন করা হয়েছে, তা বণ্টন নিয়ে আমরা নানান নাটকীয়তা দেখছি। কার্বন নিঃসরণকারী উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুত ফান্ডের অর্ধেকও এখনও জমা হয়নি। বিশ্বজুড়ে একদল তরুণ পরিবেশ আন্দোলন ও লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডের সুষম বণ্টন নিয়ে সরব রয়েছে। বাংলাদেশও এই অ্যাক্টিভিজমে পিছিয়ে নেই। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো ফান্ড এখনও বাংলাদেশ পায়নি। পরিস্থিতি যখন এমন, তখন দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত সেসব দেশের ক্ষয়ক্ষতি নিয়েও তেমন কোনো আলাপ দেখা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সবাই সরব হয় পরিবেশ দিবসে। অথচ প্রতি সেকেন্ডে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশের মতো স্বল্পউন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলো। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলংকা জলবায়ু পরিবর্তনে অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকার করুণ চিত্র দেখলে সহজে অনুমান করা যায় যে, কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেছে, মাটি ও পানিতে লবণের আধিক্য বেড়ে চলেছে। কৃষি জমি সংকুচিত হয়ে আসছে, সুপেয় পানির উৎসগুলো নষ্ট হচ্ছে, সুন্দরবন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে বনায়ন কমে যাচ্ছে। নগর উন্নয়নের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রত্যন্ত গ্রামে।

পরিবেশ দিবস সামনে এলে পরিবেশের প্রতি আমাদের দরদ বেড়ে যায়, গাছ লাগাতে উঠেপড়ে লাগি। কিন্তু বছরজুড়ে আমরা পরিবেশধ্বংসের নানা অনুসঙ্গকে লালন করছি। উপকূলজুড়ে সহস্রাধিক বেড়িবাঁধের বেহাল দশা, তার অন্যতম কারণ বেড়িবাঁধে গাছগাছালির পরিমাণ একেবারেই কম।

সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগের নিদারুণ অভাব রয়েছে।

গত দুই দশক ধরে সংগঠিত ঘূর্ণিঝড়গুলো সুন্দরবন ও উপকূলকে করেছে বিধ্বস্ত। বাংলাদেশের মতো ছোটদেশগুলোর এই অপূরণীয় ক্ষতি বিশ্ব বৈঠকে আঞ্চলিক ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে যে ক্ষতিপূরণের প্রয়োজন, তা বিশ্ব মোড়লরা এখনও অনুভব করতে পারেনি। আর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এই ক্ষতিপূরণের অর্থ পাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

গত বছর ব্রাজিলের বেলেম শহরে অনুষ্ঠিত COP 30-তে জলবায়ু অভিযোজন বরাদ্দ তিনগুণ করার আলোচনা হলেও বাস্তবে অর্থের উৎস ও বণ্টন নিয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা চোখে পড়েনি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে ফসিল ফুয়েলের ব্যবহার কমানোর আলোচনা টেবিলে স্থান পেলেও উন্নতদেশগুলো তেমন একটা গুরুত্ব দেইনি।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নিজস্ব সক্ষমতার সর্বোচ্চটুকু ব্যবহার করে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ নেয়ার বিকল্প নেই। উপকূলজুড়ে ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সুন্দরবন উজাড় ও সমুদ্রদূষণরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততারোধে টেকসই বাঁধ ও সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় জনগণকে জলবায়ু সহনশীল আয়ের উৎস ও যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

পরিবেশ দিবসে গাছলাগানোয় উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি পরিবেশ সংকটের গল্পগুলো বিশ্ব দরবারে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। সামষ্টিক সমস্যায় সম্মিলিত মনোযোগ বাড়াতে হবে। ক্ষয়ক্ষতির শেষ দেখে তারপর ব্যবস্থা নেবার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভাষা সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতির বিষয়ে মানুষের মনোযোগ ও সচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। মিডিয়ার অগ্রাধিকার বাড়াতে হবে।
শুধু গাছ লাগানো নয়, সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন হবে। হলিউডে জলবায়ু এবং পরিবেশ সংকট নিয়ে বিগ বাজেটের সিনেমা তৈরি হচ্ছে, আর আমরা শুধু গাছ লাগানো নিয়ে ব্যস্ত, যদিও তা বহুলাংশে অরক্ষিত।

আশিকুজ্জামান, প্রতিষ্ঠাতা, ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)
asikuzzaman174@gmail.com

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আশাশুনিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মাদ্রাসা শিক্ষকের মৃ-ত্যু

১

জেলেখালি ভাই ভাই সংঘের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্বেচ্ছাসেবীদের মিলনমেলা

২

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব সাতক্ষীরার কমিটি গঠন: মুনিরউদ্দীন সভাপতি, সামাদ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত

৩

মৌতলা ইউপির ৯নং ওয়ার্ডে মা-ছেলেসহ সম্ভাব্য ১০ প্রার্থী মাঠে

৪

হাম উপসর্গে ৮ জনের মৃত্যু

৫

কয়রায় সাংবাদিকদের সঙ্গে বিএনপি নেতা নুরুল আমিন বাবুলের মতবিনিময়

৬

দুই যুদ্ধবিমানের সংঘর্ষে ফিলিপাইনের ৪ পাইলট নিহত

৭

৯ মাসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশে শীর্ষে বাংলাদেশিরা

৮

কয়রা উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সভা

৯

চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছাড়াই মামলা নেওয়ার আইন হচ্ছে: আইজিপি

১০

সাংবাদিকদের নিয়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বিরূপ মন্তব্যের প্রতিবাদে তালায় মানববন্ধন

১১

গাজীপুরে পোশাক কারখানার গোডাউনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৮ ইউনিট

১২

পশ্চিম তীর হতে যাচ্ছে আরেকটি গাজা? ইসরায়েলি অভিযান শুরু

১৩

বঙ্গোপসাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ, রূপ নিতে পারে ঘূর্ণিঝড়ে

১৪

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বাস খাদে পড়ে নিহত ৩, আহত ১৬

১৫

সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি

১৬

The Climate Watch to deploy eight journalists at COP31

১৭

ছাত্রীকে যৌন হয়রানির খবরে মহিলা মাদ্রাসায় আগুন দিল স্থানীয়রা, শিক্ষককে পুলিশে সোপর্দ

১৮

সাতক্ষীরা কমিউনিটির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান

১৯

ফের কক্সবাজারের হোটেলে আগুন, রক্ষা পেলেন ৩ শতাধিক পর্যটক

২০