বাংলাদেশ, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৩ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৭ জুন ২০২৬, ৮:০৩ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

প্লাস্টিকের থাবায় বিপন্ন জীববৈচিত্র্য || সোহাগ হোসেন

প্লাস্টিক আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত—সকালের টুথব্রাশ, প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্য, পানির বোতল থেকে শুরু করে নিত্যদিনের বাজারের ব্যাগ—সবখানেই প্লাস্টিকের জয়জয়কার। কিন্তু সস্তা আর সহজলভ্যতার আড়ালে এই কৃত্রিম উপাদানটি যে এক নীরব ঘাতক হয়ে উঠছে, তা আজ আর কারো অজানা নয়। বর্তমানে প্লাস্টিক দূষণ কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি মানবসভ্যতা ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি।

প্লাস্টিকের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো এর অবিনাশী প্রকৃতি। একটি প্লাস্টিক পণ্য তৈরি হতে কয়েক মিনিট লাগলেও তা প্রাকৃতিকভাবে ধ্বংস হতে শত শত বছর লেগে যায়। ফলে আমাদের ফেলে দেওয়া পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেন, নালা ও নদী হয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশছে। এতে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এর তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১৯ থেকে ২৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য আমাদের জলজ ইকোসিস্টেমে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। রাজধানীতে উৎপাদিত মোট বর্জ্যের প্রায় ২০ শতাংশই প্লাস্টিক, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই মাত্র একবার ব্যবহারযোগ্য বা ‘সিঙ্গেল-ইউজ’ প্লাস্টিক।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ৮৭ হাজার টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য আমাদের সামুদ্রিক পরিবেশে গিয়ে মিশছে, সামুদ্রিক প্রাণীরা প্লাস্টিককে খাবার মনে করে গ্রহণ করছে এবং তিলে তিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। যা নদী ও সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। মাটি ও পানিতে মিশে যাওয়া এই কণাগুলো খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে আমাদের প্লেটে ফিরে আসছে। মাছ, মাংস এমনকি আমরা যে লবণ বা পানি খাচ্ছি, তার মধ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্লাস্টিক কণা মানবদেহে ক্যানসার, হরমোনজনিত সমস্যা এবং কিডনি বিকল হওয়ার মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ, প্রকৃতিকে আমরা যা দিচ্ছি, প্রকৃতি বিষ হিসেবে তা আমাদের কাছেই ফিরিয়ে দিচ্ছে।

এই ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী?
সম্পূর্ণ প্লাস্টিক বর্জনের স্লোগান দেওয়া সহজ, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা রাতারাতি সম্ভব নয়। তাই আমাদের টেকসই ও গঠনমূলক সমাধানের দিকে হাঁটতে হবে।

প্রথমত, ‘থ্রি-আর’ (Reduce, Reuse, Recycle) নীতির কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার কমাতে হবে, একই প্লাস্টিক বারবার ব্যবহার করতে হবে এবং বর্জ্য প্লাস্টিককে পুনরায় প্রক্রিয়াজাতকরণের আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য (Single-use) প্লাস্টিকের বিকল্প জনপ্রিয় করতে হবে। পাটের ব্যাগ, কাগজের ঠোঙ্গা, মাটির পাত্র এবং পচনশীল জৈব প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহারে সরকারিভাবে ভর্তুকি এবং প্রণোদনা দেওয়া দরকার। আমাদের সোনালী আঁশ পাট হতে পারে প্লাস্টিকের সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব বিকল্প।

তৃতীয়ত, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন জরুরি। আইন করে ক্ষতিকর প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় বর্জ্য পৃথকীকরণ (উৎসস্থলেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করা) বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চতুর্থত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের সাহায্যে প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করে সাধারণ মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শামিল করতে হবে।

পঞ্চমত, ক্ষতিকর প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর উচ্চহারে ‘সবুজ কর’ (Green Tax) ধার্য করতে হবে। পাশাপাশি, কোম্পানিগুলো যেন তাদের উৎপাদিত পণ্যের প্লাস্টিক মোড়ক নিজেরাই ফেরত নেওয়ার (Extended Producer Responsibility) ব্যবস্থা করে, তা বাধ্যতামূলক করা দরকার।

সর্বোপরি প্রয়োজন গণসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন। শুধু সরকারের দিকে চেয়ে থাকলে এই সংকটের সমাধান হবে না। বাজারে যাওয়ার সময় নিজের সাথে একটি কাপড়ের বা পাটের ব্যাগ রাখার অভ্যাস আমাদের নিজেদেরই করতে হবে।

“আমি একা প্লাস্টিক বর্জন করলে কী হবে?”—এই মানসিকতা পরিহার করে প্রত্যককে নিজের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

প্লাস্টিক দূষণমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং আমাদের এবং আগামী প্রজন্মের বেঁচে থাকার ন্যূনতম গ্যারান্টি। প্রকৃতিকে বিষাক্ত করে আমরা সুস্থ থাকতে পারি না। তাই আসুন, প্লাস্টিকের লাগাম টেনে ধরি, পৃথিবীকে আবার সবুজে ও সুনিবিড় প্রাণের স্পন্দনে ফিরিয়ে আনি।

সোহাগ হোসেন, পরিবেশ কর্মী

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি ক্লোজড

উপনির্বাচনে সেনা মোতায়েন, জুনের আগেই ইউপি নির্বাচন : ইসি

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কাদের সিদ্দিকীর সাক্ষাৎ

শ্যামনগরে জাল টাকা দিয়ে পণ্য কেনার সময় কিশোর আটক

দেবহাটায় জিআইএসভিত্তিক গ্রামীণ সড়কের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে কর্মশালা

দেবহাটায় শিশুশ্রম প্রতিরোধে সভা, শিক্ষায় ফিরেছে ৮৭ শিশু

বেনাপোল স্থলবন্দর পরিদর্শনে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মানজারুল মান্নান

তালায় যুব অ্যাডভোকেসি সভা

কালিগঞ্জে প্লাস্টিক-পলিথিন প্রতিরোধে শিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় সভা

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে মিয়াওয়াকি বনায়ন কর্মসূচি উদ্বোধন

১০

বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন

১১

ধামরাইয়ে পিকআপ-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ৩

১২

বিয়ের প্রস্তাব দিতেই যোগাযোগ বন্ধ!

১৩

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৫ জনের মৃত্যু

১৪

নভেম্বর-ডিসেম্বরে ইউপি ভোটের ‘স্লট’ এখন খুঁজে পাচ্ছে না ইসি!

১৫

প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আইনি ক্ষমতা পেল এপিবিএন

১৬

সেভেন আপের বোতলে ঘাসমারা ওষুধ, খেয়ে প্রাণ গেল ব্যবসায়ীর

১৭

লিগ্যাল এইডের মামলা পরিচালনার বিল ছাড়াতে ঘুষ!

১৮

জবির বাসে সিট দখল বন্ধে নতুন সিদ্ধান্ত, র‍্যাগিং বন্ধে কঠোর নিদর্শনা

১৯

সবুজ বাংলাদেশ বিনির্মাণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে গুরুত্ব দিতে হবে

২০
error: Content is protected !!