বাংলাদেশ, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৩ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৮ জুন ২০২৬, ৭:২২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

বিপন্ন ‎বিলাই-নখা || ‎তারিক ইসলাম

‎গ্রামীণ পথের ধারে, ঝোপঝাড়ে বা ফেলে রাখা পতিত জমিতে একসময় অনাদর-অবহেলায় বেড়ে উঠতো এক দারুণ উদ্ভিদ। শৈশবে গ্রামের ধুলোবালি মেখে বড় হওয়া মানুষ একে চেনেন— ‘বিলাই-নখা’ বা ‘বিলাই-আঁচড়া’ নামে। শহুরে যান্ত্রিকতায় অভ্যস্ত বর্তমান প্রজন্মের কাছে নামটি কিছুটা অদ্ভুত ও অচেনা মনে হলেও, আমাদের লোকজ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে এই উদ্ভিদের উপস্থিতি বেশ পুরনো। তবে নির্বিচারে ঝোপঝাড় পরিষ্কারের মহোৎসবে আজ এই চেনা উদ্ভিদটি আমাদের চারপাশ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।

‎‎উদ্ভিদটির এমন নামকরণের পেছনে রয়েছে এর দারুণ এক শারীরিক বৈশিষ্ট্য। বিলাই-নখার বৈজ্ঞানিক নাম Capparis brevispina এবং ইংরেজিতে একে Flinders Rose বা Indian Caper নামে ডাকা হয়। এই গাছের ডালপালা এবং পাতার গোড়ায় ছোট ছোট, তীক্ষ্ণ ও বাঁকানো কাঁটা থাকে। এই কাঁটাগুলো দেখতে হুবহু বিড়ালের বাঁকানো নখের মতো মনে হয়। অসাবধানতাবশত এই ঝোপের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় জামাকাপড় বা শরীরে আটকে গেলে এটি ঠিক বিড়ালের আঁচড়ের মতোই দাগ কেটে দেয়। মূলত এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই গ্রামবাংলায় এর নাম হয়ে উঠেছে ‘বিলাই-নখা’।

‎বিলাই-নখা মূলত একটি বহুবর্ষজীবী, গুল্ম বা লতাজাতীয় ঝোপালো উদ্ভিদ। এটি শক্ত প্রকৃতি এবং শুষ্ক পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। এর পাতাগুলো বেশ চমৎকার এবং গাঢ় সবুজ রঙের হয়ে থাকে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো এর ফুল। সাদা বা হালকা রঙের পাপড়ির ওপর অসংখ্য লম্বা পুংকেশর (Stamens) ছড়ানো থাকে, যা ফুলটিকে এক অনন্য রূপ দেয়। ফুলগুলো থেকে পরে ছোট ছোট ফল হয়, যা পাখিদের বেশ প্রিয় খাবার।

‎আমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে খুব ভালো করে চিনতেন। কেপারিডি (Capparaceae) পরিবারের এই উদ্ভিদটির নানাবিধ ঐতিহ্যগত ব্যবহার রয়েছে।

‎ঐতিহ্যগত চিকিৎসা: লোকজ চিকিৎসায় এর ছাল এবং শিকড় বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ ও বাতের ব্যথা উপশমে ব্যবহার করার চল রয়েছে।

‎জীববৈচিত্র্য রক্ষা: এই ঝোপালো উদ্ভিদটি ছোট ছোট পাখি, কীটপতঙ্গ এবং সরীসৃপদের জন্য চমৎকার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। এর ফুলগুলো মৌমাছি ও প্রজাপতির খাদ্য জোগায়, যা পরাগায়নে সাহায্য করে।

‎আজকের দিনে আমরা তথাকথিত আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরির নামে চারপাশের দেশীয় ঝোপঝাড় ছেঁটে ফেলছি। রাসায়নিক আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে বিলাই-নখার মতো অসংখ্য উপকারী ও চেনা উদ্ভিদ আমাদের প্রকৃতি থেকে নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে।

‎‎প্রকৃতির কোনো উপাদানই অপ্রয়োজনীয় নয়। বিলাই-নখা শুধু একটি কাঁটাঝোপ নয়, এটি আমাদের দেশীয় জীববৈচিত্র্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের চারপাশের এই চেনা প্রকৃতিকে অচেনা হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে হবে। বাড়ির আনাচে-কানাচে বা রাস্তার ধারে বেড়ে ওঠা এই লোকজ উদ্ভিদগুলোকে আগাছা মনে করে উপড়ে ফেলার আগে আমাদের ভাবা উচিত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ সবুজ পৃথিবী রেখে যেতে চাইলে, এই হারিয়ে যাওয়া উদ্ভিদগুলোকে পরম মমতায় টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।


তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি ক্লোজড

উপনির্বাচনে সেনা মোতায়েন, জুনের আগেই ইউপি নির্বাচন : ইসি

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কাদের সিদ্দিকীর সাক্ষাৎ

শ্যামনগরে জাল টাকা দিয়ে পণ্য কেনার সময় কিশোর আটক

দেবহাটায় জিআইএসভিত্তিক গ্রামীণ সড়কের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে কর্মশালা

দেবহাটায় শিশুশ্রম প্রতিরোধে সভা, শিক্ষায় ফিরেছে ৮৭ শিশু

বেনাপোল স্থলবন্দর পরিদর্শনে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মানজারুল মান্নান

তালায় যুব অ্যাডভোকেসি সভা

কালিগঞ্জে প্লাস্টিক-পলিথিন প্রতিরোধে শিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় সভা

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে মিয়াওয়াকি বনায়ন কর্মসূচি উদ্বোধন

১০

বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন

১১

ধামরাইয়ে পিকআপ-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ৩

১২

বিয়ের প্রস্তাব দিতেই যোগাযোগ বন্ধ!

১৩

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৫ জনের মৃত্যু

১৪

নভেম্বর-ডিসেম্বরে ইউপি ভোটের ‘স্লট’ এখন খুঁজে পাচ্ছে না ইসি!

১৫

প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আইনি ক্ষমতা পেল এপিবিএন

১৬

সেভেন আপের বোতলে ঘাসমারা ওষুধ, খেয়ে প্রাণ গেল ব্যবসায়ীর

১৭

লিগ্যাল এইডের মামলা পরিচালনার বিল ছাড়াতে ঘুষ!

১৮

জবির বাসে সিট দখল বন্ধে নতুন সিদ্ধান্ত, র‍্যাগিং বন্ধে কঠোর নিদর্শনা

১৯

সবুজ বাংলাদেশ বিনির্মাণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে গুরুত্ব দিতে হবে

২০
error: Content is protected !!