বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
২৯ জুলাই ২০২৬, ২:৪০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

বাঘ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণ || আশিকুজ্জামান

প্রতি বছর ২৯ জুলাই আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস হিসেবে পালিত হয়। দিবসটি আসলেই আমাদের বাঘপ্রীতি বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় বাঘের ছবি, সংরক্ষণের স্লোগান আর শুভেচ্ছা বার্তায়। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি, ক্যামেরা ট্র্যাপ, টহল ব্যবস্থা এবং নতুন নতুন প্রকল্পের কথা তুলে ধরে। কিন্তু বাঘদিবসে সুন্দরবনের পাশে বসবাসকারী মানুষের কণ্ঠ শোনা যায় না।

বাঘকে কেন্দ্র করে যত আলোচনা, ততটা আলোচনা হয় না সেই জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি কিংবা বননির্ভর পরিবারগুলোকে নিয়ে, যাদের জীবন প্রতিদিন সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অথচ বাস্তবতা হলো, স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে বাঘ সংরক্ষণের কোনো পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনে না।

সংখ্যার দিক থেকে অবশ্যই বাংলাদেশ আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বন বিভাগের ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপ অনুযায়ী, ২০১৪ সালে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪’তে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জরিপে পাওয়া গেছে ১২৫টি বাঘ। বর্তমানে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে বাঘের ঘনত্ব প্রায় ২.১৭টি। এই অগ্রগতি নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু একই সঙ্গে হরিণ শিকার, বনদস্যুদের তৎপরতা, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং অবৈধ শিকারের মতো হুমকি এখনো রয়ে গেছে।

অর্থাৎ, শুধু বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি সংরক্ষণের চূড়ান্ত সাফল্যের প্রমাণ নয়; বরং সেই সাফল্য টেকসই করতে হলে বনের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত করতে হবে।

সংরক্ষণ মানে শুধু বনের ভেতরে টহল বাড়ানো নয়। সংরক্ষণ মানে মানুষের আস্থা অর্জন করা। কারণ যে মানুষটি জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন বনে প্রবেশ করেন, তিনিই প্রথম বাঘ দেখেন, বন ধ্বংসের ঘটনা দেখেন, শিকারিদের গতিবিধি দেখেন। রাষ্ট্রের চোখ যেখানে পৌঁছায় না, সেখানে পৌঁছায় স্থানীয় মানুষের চোখ। তাই তাদের দর্শক বানিয়ে রেখে সফল সংরক্ষণের স্বপ্ন দেখা বাস্তবসম্মত নয়।

সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে বননির্ভর মানুষ বনের শত্রু নন; তারা বনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যখন জীবিকার বিকল্প থাকে না, তখন সংরক্ষণ মানুষের কাছে একটি মানবিক উদ্যোগ নয়, বরং অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা ‘টাইগার উইডো’ নিয়ে খুব কম কথা বলি। অথচ সুন্দরবনের বহু নারী বাঘের আক্রমণে স্বামী হারিয়ে শুধু অর্থনৈতিক সংকটেই পড়েন না, সামাজিক অবহেলাও সহ্য করেন। আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসে বাঘের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি এই পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়েও সমান গুরুত্বে কথা বলতে হবে।

বিশ্বজুড়ে এখন সংরক্ষণের দর্শন বদলেছে। আগে সংরক্ষণ মানে ছিল মানুষকে বন থেকে দূরে রাখা। এখন সংরক্ষণ মানে মানুষকে অংশীদার করা। যেসব দেশে স্থানীয় জনগণকে বন ব্যবস্থাপনা, নজরদারি, বিকল্প জীবিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করা হয়েছে, সেসব দেশেই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল এসেছে। সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। ভারত ও নেপাল এক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বাংলাদেশে উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তাব্যূহ, জীবিকার উৎস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা সুন্দরবন। তাই বাঘ রক্ষা, বন রক্ষা এবং মানুষ রক্ষা এই তিনটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটিকে বাদ দিলে অন্য দুটি টিকিয়ে রাখা কঠিন।

আমরা প্রায়ই বলি, ‌‘বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে’ কথাটি সত্য। কিন্তু আরেকটি সত্য হলো, সুন্দরবন কূলের মানুষ বাঁচলে তবে বাঘও বাঁচবে। কারণ স্থানীয় জনগণ যদি সংরক্ষণের সুফল না পায়, যদি তারা নিজেদের এই প্রক্রিয়ার অংশ বলে মনে না করে, তাহলে কোনো প্রকল্প, কোনো আইন বা কোনো আন্তর্জাতিক দিবসই দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।

আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার শুধু বাঘের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে স্থানীয় জনগণ হবে অংশীদার, সুবিধাভোগী এবং সিদ্ধান্তের অংশ। সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে কেবল বনের ভেতরের বাঘ নয়, বনের বাইরের মানুষও।

আশিকুজ্জামান, প্রতিষ্ঠাতা, আইসিডি, asikuzzaman174@gmail.com

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা

১

কালিগঞ্জে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন

২

চুলে নজরকাড়া সাজ, পূর্ণিমা যেন অষ্টাদশী তরুণী!

৩

৭ নভেম্বরকে সামনে রেখে কালিগঞ্জে কৃষকদলের প্রস্তুতি সভা

৪

পারুলিয়ায় শিশু পাচার ও শোষণ প্রতিরোধে সভা

৫

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তায় সামরিক সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার

৬

এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন

৭

২৪ সিনেমার ১৯টিতে ফ্লপ পরীমনি, ৫টিতে গড়পড়তা

৮

সাংবাদিকের ফোন কেড়েছেন, ট্রাইপড ভেঙেছেন পরীমনি

৯

অতিরিক্ত সময়ে ২ গোল হজম করেও পাকিস্তানকে হারাল ভারত

১০

শার্শায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন

১১

দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাউশির জরুরি নির্দেশনা

১২

শ্যামনগরে ‘লবণাক্ততা নিরসন এবং উপকূলীয় কৃষি অভিযোজন’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ

১৩

কপ-৩১-এ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নেবে বাংলাদেশ

১৪

শুরু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, সব ম্যাচ দেখা যাবে বিটিভিতে

১৫

কয়রায় সাইবার নিরাপত্তা বাড়াতে অ্যাডভোকেসি

১৬

তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতা: সন্দেহভাজন ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দ

১৭

আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন রোনালদো

১৮

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

১৯

হাসিনাকে কোনো ট্রাভেল পাস ইস্যু করা হবে না: হুমায়ুন কবির

২০