
প্রতিদিন পত্রিকার পাতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেওয়ালে চোখ রাখলেই এক ধরনের অস্বস্তি চেপে বসে। বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি অশ্রদ্ধা, শিক্ষকদের লাঞ্ছনা, পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ আর সামান্য স্বার্থের জন্য যেকোনো সীমা অতিক্রম করার প্রবণতা যেন আমাদের নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সামাজিক ব্যাধি ও যুবসমাজের একাংশের নৈতিক অবক্ষয় দেখে বারবার মনে পড়ে কবি আলফ্রেড টেনিসনের সেই অমূল্য বাণী— ‘যে অন্যকে সম্মান করতে জানে না, সে প্রকৃতপক্ষে কিছুই করতে জানে না।’
আজকের যুগে আমরা প্রযুক্তির দিক থেকে চরম উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছি ঠিকই, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধের জায়গায় কতটা পিছিয়ে পড়েছি? সম্মান জানানোর যোগ্যতা কেবল একটি বাহ্যিক শিষ্টাচার নয়; এটি একজন মানুষের রুচি ও শিক্ষার মাপকাঠি। যে তরুণ সমাজ অন্যকে সম্মান দিতে শেখে না, তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সমাজ গঠন আশা করা কঠিন।
আমাদের সমাজে গুণীজনদের অবমূল্যায়ন আরও এক বড় ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বহু বছর আগে জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘যে দেশে গুণের সমাদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মাতে পারে না।’ আজ যখন আমরা দেখি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা বা ‘ভাইরাল’ সংস্কৃতিই মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর প্রকৃত শিক্ষক, গবেষক, বিজ্ঞানী বা গুণী শিল্পীরা নীরবে আড়ালে পড়ে থাকছেন—তখন ড. শহীদুল্লাহর সেই উক্তিটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও প্রখর হয়ে ওঠে। মেধার অবমূল্যায়ন হলে মেধাবীরা হয় দেশত্যাগী হয়, না হয় তাদের মেধার বিকাশ থমকে যায়।
শ্রদ্ধাবোধ ও গুণীজনের কদরের পাশাপাশি আমাদের যুবসমাজে আরেকটি বড় অভাব দেখা যাচ্ছে, তা হলো কৃতজ্ঞতাবোধ। মহাকবি শেখ সাদী (রহ.) তাঁর সুবিমল চেতনার গভীরতা থেকে লিখেছিলেন, ‘একটি কৃতজ্ঞ কুকুরও অকৃতজ্ঞ মানুষের চেয়ে শ্রেয়।’ বর্তমানের আত্মকেন্দ্রিক ও ভোগবাদী সমাজকাঠামো মানুষকে অকৃতজ্ঞ হতে শেখাচ্ছে। পরিবার, সমাজ বা দেশের অবদানের কথা ভুলে গিয়ে কেবল ‘আমি’ কেন্দ্রিক ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকা তরুণ প্রজন্মকে এই অমোঘ বাণী স্মরণ করিয়ে দেয়—কৃতজ্ঞতাহীনতা মানুষের পশুর চেয়েও অধঃপতনের লক্ষণ।
যখন এই অমূল্য নীতিবাক্যগুলো কেবল বইয়ের পাতায় বা পরীক্ষার খাতায় বন্দি না থেকে আমাদের অন্তর ছুঁয়ে যায়, তখনই আমরা অনুধাবন করতে পারি আমাদের ভুলগুলো। মনের গহিন থেকে তখন এই আশাবাদই জেগে ওঠে—মহাজাগতিক এই প্রজ্ঞা ও মহান মনীষীদের মহাজ্ঞান যেন বিশ্বমানবের, বিশেষ করে আমাদের তরুণ প্রজন্মের মহত্তর অঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে।
মানুষ কেবল শরীর বা ক্ষণস্থায়ী বস্তু দিয়ে গঠিত নয়, তার একটি আত্মা রয়েছে। পরমাত্মার সাথে বা সৃষ্টির গভীর সত্যের সাথে আত্মার যখন সত্যিকার মিলন ঘটে, তখনই মানুষের অনুভূতির প্রতিটি কোণে জেগে ওঠে জীবনের আসল স্পন্দন। প্রকৃতির সেই চিরায়ত দৃশ্য—‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’—যেমন আমাদের মনের সুপ্ত সংবেদনশীলতাকে জাগিয়ে তোলে, তেমনই বিবেক জাগ্রত হলে শুরু হয় জীবনকে অর্থপূর্ণভাবে যাপন করার এক অদম্য আকুলতা।
যুবসমাজকে সামাজিক এই অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে হলে আবার ফিরতে হবে নৈতিক ভিত্তির কাছে। পারস্পরিক সম্মান, গুণীর কদর এবং পরম কৃতজ্ঞতাবোধের চর্চাই পারে আমাদের তরুণদের আত্মিক মুক্তি এনে দিতে এবং একটি সুস্থ, সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে।
লেখক: তারিক ইসলাম
সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।
মন্তব্য করুন