
দেবহাটা প্রতিনিধি: মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার টাউনশ্রীপুরের কৃতিসন্তান ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাস্টার এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাব-সেক্টর কমান্ডার, একজন আদর্শ শিক্ষক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজসংস্কারক এবং নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক।
১৯৩৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি টাউনশ্রীপুর গ্রামের বিখ্যাত মিস্ত্রি বংশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
পিতা ছিলেন মুন্সী খিজির মিস্ত্রি। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে টাউনশ্রীপুর শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৪ সালে মাধ্যমিক পাস করেন। পরে সাতক্ষীরা কলেজে আই.কম এবং কুষ্টিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে বি.কম সম্পন্ন করেন। ১৯৬২ সালে রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষকতা জীবনে তিনি পদ্মশাখরা, ভেটখালী, টাউনশ্রীপুর শরৎচন্দ্র ও সখিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবনেই ভাষা আন্দোলনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মাতৃভাষার দাবিতে নিজ বিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভার নেতৃত্ব দেন।
১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দিয়ে দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ‘ক্যাপ্টেন’ উপাধি লাভ করেন।
তবে, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নিজ এলাকায় মুক্তিবাহিনী গঠন, পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে ‘জয় বাংলা’ পতাকা উত্তোলন এবং টাউনশ্রীপুর ও ভারতের টাকীতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে এই ক্যাম্পই মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের ভিত্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
স্বাধীনতার পর তিনি পুনরায় শিক্ষকতায় ফিরে আসেন। ১৯৮৫ সালে দেশের প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দেবহাটা উপজেলার প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মানবসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ১৯৯০ সালে মৃত্যুর পর চক্ষুদানের অঙ্গীকার করেন।
১৯৯৩ সালের ২৩ জুলাই সখিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদানরত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
পরদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় টাউনশ্রীপুর শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এদিকে, মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাস্টারের ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ৮ আগস্ট (শনিবার) টাউনশ্রীপুর শরৎচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে দিনব্যাপী স্মরণসভা, দোয়া মাহফিল ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানসূচিতে রয়েছে— সকাল ৭টায় পবিত্র কুরআন খতম, সকাল ১০টায় আলোচনা সভা, দুপুর ১টায় কবর জিয়ারত এবং দুপুর ২টায় তবারক বিতরণ।
মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধা, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকাবাসীকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কমিটির সদস্য সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হামিদ এবং আহ্বায়ক মো. আবুল ফজল।
মন্তব্য করুন