
ডেস্ক রিপোর্ট: দেশের বাজারে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়ে ২০ সেপ্টেম্বর রাতে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এতে যাত্রী ও পণ্যপরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকায় ঠেকেছে— যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। নতুন এই দরের ফলে প্রতি ১০০ কিলোমিটার যাত্রায় দূরপাল্লার বাসের জ্বালানি খরচ একলাফে প্রায় ৫৭১ টাকা বেড়ে গেছে।
রাতারাতি তৈরি হওয়া এই বাড়তি খরচের ধাক্কা এখন পরিবহন খাতের ওপর। এ পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন উঠেছে— এই বাড়তি ৫৭১ টাকার চাপ শেষ পর্যন্ত কে সামলাবেন; বাস-মালিক, নাকি সাধারণ যাত্রী?
ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করায় পরিবহন খাতে রেকর্ড চাপ তৈরি হয়েছে। বাসের গড় মাইলেজ ৩.৫ কিলোমিটার হিসাব করলে প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি খরচ ৫ টাকা ৭১ পয়সা বেড়েছে। ফলে দূরপাল্লার ১০০ কিলোমিটারের যাতায়াতে বাসের অতিরিক্ত খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫৭১ টাকা, যা দেশের পরিবহন ব্যবসাকে তীব্র সংকটে ফেলেছে
পরিবহন মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, একটি সাধারণ ৪৫ সিটের দূরপাল্লার বাস গড়ে প্রতি লিটার ডিজেলে ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার পথ চলে। আগে ১১৫ টাকা লিটার দরে প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি খরচ হতো ৩২ টাকা ৮৬ পয়সা। দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় এখন প্রতি কিলোমিটারে খরচ দাঁড়াচ্ছে ৩৮ টাকা ৫৭ পয়সায়। অর্থাৎ, প্রতি কিলোমিটারে বাসের শুধু জ্বালানি বাবদ খরচই বাড়ছে প্রায় ৫ টাকা ৭১ পয়সা। সে হিসাবে, ১০০ কিলোমিটার পথের জন্য আগে যেখানে ডিজেল বাবদ খরচ হতো ৩ হাজার ২৮৬ টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩ হাজার ৮৫৭ টাকায়।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গাবতলী থেকে ঘোড়াঘাট হয়ে উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়ের দূরত্ব ৪৩৮ কিলোমিটার। এই রুটে একটি বাসের যাতায়াতে (আপ-ডাউন) ২৫০ লিটারের বেশি ডিজেল প্রয়োজন হয়। ২৫০ লিটার ধরে হিসাব করলে আগে যেখানে তেলের পেছনে খরচ হতো ২৮ হাজার ৭৫০ টাকা, এখন লাগছে ৩৩ হাজার ৭৫০ টাকা। অর্থাৎ রাউন্ড ট্রিপেই তেলের খরচ বাড়ছে ৫ হাজার টাকা। যাতায়াতে গড়ে ৫০ জন যাত্রী থাকলে, প্রতি যাত্রীর পেছনে বাড়তি খরচ ১০০ টাকা। কোনো বাস মাসে ২৫ দিন যাতায়াত করলে শুধু জ্বালানি বাবদই অতিরিক্ত গুনতে হবে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দূরপাল্লার এক বাস মালিক ঢাকা পোস্টকে জানান, তারাকান্দি রুটে যাতায়াতে একটি বাসে গড়ে ৮০ থেকে ৮৫ লিটার ডিজেল লাগে। তেলের দাম বাড়ায় শুধু এই নির্দিষ্ট ট্রিপেই বাড়তি খরচ হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ টাকা। এর সঙ্গে পূর্বাচল ঘুরে টার্মিনালে আসা-যাওয়ার খরচ যুক্ত করলে প্রতিটি গাড়িতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩ হাজার টাকা। ৪৫ আসনের গাড়িতে গড়ে ৩০ জন যাত্রী ধরে জনপ্রতি ২০ টাকা বাড়তি ভাড়া নিলেও যাতায়াতে মিলবে ১ হাজার ২০০ টাকা। যা বাড়তি তেলের খরচ মেটাতেও যথেষ্ট নয়।
ঢাকা-পঞ্চগড় দূরপাল্লার রুটে একটি বাসের যাতায়াতে ২৫০ লিটার ডিজেলে অতিরিক্ত প্রায় ৫ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে। বাসে গড়ে ৫০ জন যাত্রী হিসাব করলে যাতায়াতে যাত্রীপ্রতি অন্তত ১০০ টাকা ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় ক্ষুব্ধ দূরপাল্লার পাশাপাশি লোকাল বাসের মালিকরাও, কারণ নির্ধারিত চার্টের চেয়ে কম ভাড়ায় লোকাল সার্ভিস চালানো এখন অসম্ভব
তিনি আরও বলেন, ‘কিছুদিন আগেই ভাড়া ৫০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এখন নতুন করে আবারও ৫০ টাকা বাড়ালে যাত্রীদের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। বেশি ভাড়ার ভয়ে যাত্রীরা লোকাল বাসে ঝুঁকে পড়তে পারেন, যদিও লোকাল বাসের ভাড়াও ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় পৌঁছে গেছে। এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম না বাড়িয়ে দুই-চার টাকা করে বাড়ালে পরিবহন মালিকরা সমন্বয় করতে পারতেন। মানুষের আয় না বাড়ায় ভাড়ার পুরো চাপ যাত্রীদের ওপর চাপানোও অবাস্তব।’
আমরা দীর্ঘদিন ধরেই লোকসানে গাড়ি চালাচ্ছি। এখন আবার তেলের দাম বাড়ায় ছোট মালিকদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিয়মিত ভাড়া সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছি। বিষয়টি সরকারকে বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে আজকের মধ্যেই আমরা একটি সিদ্ধান্তের আশা করছি।
মো. সাইফুল আলম, মহাসচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি
মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বাস মালিক মো. কামরুল ইসলাম বাবুল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় বাসভাড়া নতুন করে সমন্বয়ের বিকল্প নেই। ১০০ কিলোমিটারে শুধু ডিজেলের পেছনেই অতিরিক্ত ৫৭১ টাকা খরচ পরিবহন মালিকদের চরম সংকটে ফেলেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি আলোচনা করছে এবং আজই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।’
লোকাল বাসের দূরবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকার চেয়ে লোকাল বাসে সাধারণত অনেক কম ভাড়া নেওয়া হয়। যেমন, ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে নির্ধারিত ভাড়া ৩৩০ টাকা হলেও লোকাল বাসে নেওয়া হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। কিন্তু ময়মনসিংহ পৌঁছাতে দূরপাল্লার বাসের সমান জ্বালানিই খরচ হয়। ফলে ভাড়া কিছুটা বাড়ানো হলেও এই বাড়তি তেলের খরচে লোকাল বাসগুলো মারাত্মক লোকসানে পড়বে।’
পরিবহন মালিকরা বলছেন, ডলারের উচ্চমূল্য ও চালন ব্যয়ের তুলনায় বাসের ভাড়া দীর্ঘদিন সমন্বয় করা হয়নি, তাই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিয়মিত ভাড়া নির্ধারণ জরুরি। অন্যদিকে ক্ষুব্ধ যাত্রীদের দাবি, তেলের দাম বাড়লে দ্রুত ভাড়া বাড়ানো হলেও কমার সময় তা সমন্বিত হয় না। এই অবস্থায় বিআরটিএ-র পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না আসায় শত কোটি টাকার বাড়তি খরচের বোঝা কার ঘাড়েই চাপবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ডলারের দাম যখন ৮৬ টাকা ৩১ পয়সা ছিল, তখনকার হিসাব ধরে বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ডলারের দাম ১২৬ টাকায় উঠলেও ভাড়ার অন্যান্য উপাদানের খরচ সমন্বয় করা হয়নি। ফলে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই লোকসানে গাড়ি চালাচ্ছি। এখন আবার তেলের দাম বাড়ায় ছোট মালিকদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিলিয়ে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নিয়মিত ভাড়া সমন্বয়ের দাবি জানিয়ে আসছি। বিষয়টি সরকারকে বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে আজকের মধ্যেই আমরা একটি সিদ্ধান্তের আশা করছি।’
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় বাসভাড়া নতুন করে সমন্বয়ের বিকল্প নেই। ১০০ কিলোমিটারে শুধু ডিজেলের পেছনেই অতিরিক্ত ৫৭১ টাকা খরচ পরিবহন মালিকদের চরম সংকটে ফেলেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি আলোচনা করছে এবং আজই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
মো. কামরুল ইসলাম বাবুল, বাস-মালিক
এদিকে, সরকারের এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ যাত্রীরা। আশিকুর রহমান নামে এক বাসযাত্রী ঢাকা পোস্টকে বলেন, তেলের দাম বাড়লেই মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর জন্য চাপ দেন, কিন্তু তেলের দাম কমলে ভাড়া কমানোর উদ্যোগ দেখা যায় না। মানুষের আয় তো আর রাতারাতি বাড়েনি। তাই তেলের বাড়তি খরচের পুরোটাই যাত্রীদের ঘাড়েই চাপিয়ে দেওয়া কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।
রাকিবুল ইসলাম নামে আরেক যাত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জের ভাড়া ছিল ৩৫০ টাকা। গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ায় তা ৪০০ টাকা করা হয়। মাত্র চার মাসের মাথায় আবারও যদি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ কীভাবে তা বহন করবে? সরকার তেলের দাম বাড়িয়ে মূলত বাস-মালিকদের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের পকেট কাটছে।’
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ভাড়া সমন্বয়ের পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রোড ট্রাফিকের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের অফিসিয়াল মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট
মন্তব্য করুন