
সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ কি শুধু ধান, চিংড়ি আর সুন্দরবনের গল্পে আটকে থাকবে? নাকি আগামী দশকে এই জেলার সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠবে তার তরুণ জনগোষ্ঠী? প্রশ্নটি এখনই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০৩৫ সালের সাতক্ষীরা কেমন হবে, তার অনেকটাই নির্ধারিত হবে আজকের তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা, উদ্যোগ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতায়।
একসময় একটি জেলার অর্থনীতি বলতে বোঝানো হতো কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা কিংবা সরকারি চাকরি। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি বদলে গেছে। এখন একটি তরুণ একটি ছোট শহর বা গ্রামে বসেই বিশ্বের অন্য প্রান্তের প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতে পারে। একটি পরিবার নিজের ঘরকে আবাসন ব্যবসায় পরিণত করতে পারে। একটি নৌকা স্থানীয় তরুণের উদ্যোগে পর্যটন সেবার অংশ হতে পারে। একটি মোবাইল ফোন হতে পারে বাজার, অফিস, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দরজা। সাতক্ষীরার জন্য এই পরিবর্তনের সম্ভাবনা আরও গভীর।
সাতক্ষীরা এমন একটি জেলা যেখানে একই সঙ্গে রয়েছে সুন্দরবন, নদী, উপকূল, কৃষি, চিংড়ি, গ্রামীণ জীবন, সীমান্ত, লোকসংস্কৃতি এবং বৈচিত্র্যময় মানুষের জীবনযাপন। কিন্তু এসব সম্পদকে আমরা এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পদ হিসেবেই দেখি, অর্থনীতির নতুন ভিত্তি হিসেবে দেখি না।২০৩৫ সালের সাতক্ষীরা গড়তে হলে এই দৃষ্টিভঙ্গিই প্রথমে বদলাতে হবে।
চাকরিপ্রার্থী নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী তরুণ
সাতক্ষীরার তরুণদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু চাকরি পাওয়া নয়, চাকরির ধারণাটিকেই নতুনভাবে দেখা। সরকারি বা বেসরকারি চাকরি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একটি জেলার সব তরুণের জন্য চাকরি সৃষ্টি করা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই তরুণদের একটি অংশকে উদ্যোক্তা হতে হবে। একজন তরুণ সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড হতে পারেন। কেউ হতে পারেন নৌযান উদ্যোক্তা। কেউ গড়ে তুলতে পারেন নিরাপদ হোমস্টে। কেউ স্থানীয় খাবারকে পর্যটন পণ্যে রূপ দিতে পারেন। কেউ তৈরি করতে পারেন ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও। কেউ ডিজিটাল মার্কেটিং করতে পারেন। কেউ বিদেশি পর্যটকের জন্য অনুবাদ ও যোগাযোগ সেবা দিতে পারেন। অর্থাৎ একজন তরুণের কর্মসংস্থান শুধু একটি চাকরির আবেদনপত্রে আটকে থাকবে না। সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে এখানেই।
সুন্দরবন শুধু বন নয়, অর্থনীতির জীবন্ত পাঠশালা
সুন্দরবন সাতক্ষীরার সবচেয়ে পরিচিত সম্পদ। কিন্তু সুন্দরবনকে যদি শুধু পর্যটকের কয়েক ঘণ্টার ভ্রমণ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যাবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও স্থানীয় জীবনকে কেন্দ্র করে পর্যটন অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। সাতক্ষীরায় সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে স্থানীয় খাবার, বাউল গান, বনবিবির পালা, মধু সংগ্রহের ঐতিহ্য, নদীভ্রমণ, জ্যোৎস্নার নৌভ্রমণ, গ্রামীণ জীবন এবং স্থানীয় সংস্কৃতি। শ্যামনগরের একটি পরিবার তার বাড়ির একটি অংশ পর্যটকের জন্য প্রস্তুত করতে পারে। একজন তরুণ নৌকা পরিচালনার পাশাপাশি পর্যটককে নদী ও বনের গল্প বলতে পারেন। একজন নারী স্থানীয় খাবার তৈরি করে আয় করতে পারেন। আরেকজন তরুণ অনলাইনে এসব সেবার প্রচার করতে পারেন। তখন পর্যটন শুধু পর্যটকের ব্যয় নয়, স্থানীয় মানুষের আয় হয়ে উঠবে।
জলবায়ু ঝুঁকি থেকে জলবায়ু অর্থনীতি
সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জলবায়ু পরিবর্তনকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও উপকূলীয় ঝুঁকি মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবিত করছে। কিন্তু ২০৩৫ সালের সাতক্ষীরা শুধু জলবায়ু ঝুঁকির জেলা হবে কেন? হতে পারে জলবায়ু অভিযোজনের উদ্ভাবনের জেলা। লবণসহিষ্ণু কৃষি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সৌরবিদ্যুৎ, পরিবেশবান্ধব পর্যটন, জলবায়ু সহনশীল আবাসন, বিকল্প জীবিকা এবং স্থানীয় প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগকে কেন্দ্র করে একটি নতুন অর্থনীতি তৈরি করা সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু অভিযোজন এখন অর্থনীতি ও উদ্ভাবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। সাতক্ষীরার তরুণরা চাইলে সেই বৈশ্বিক আলোচনার অংশ হতে পারেন।
সীমান্ত থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর আরেকটি বড় সম্ভাবনার জায়গা। সীমান্তকে শুধু পণ্য প্রবেশ ও বের হওয়ার স্থান হিসেবে দেখলে সম্ভাবনা সীমিত থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বাণিজ্য, পরিবহন, পর্যটন, লজিস্টিকস, হোটেল, খাদ্যসেবা, অনলাইন ব্যবসা এবং দক্ষ জনবল। আগামী দশকে সীমান্ত অর্থনীতি আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। একজন তরুণ ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, অনলাইন বিপণন, ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা কিংবা আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হয়ে এই অর্থনীতির অংশ হতে পারেন।সাতক্ষীরার অবস্থান তাই শুধু ভৌগোলিক পরিচয় নয়। এটি একটি অর্থনৈতিক সুবিধা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দেবে কাজের ধরন
২০৩৫ সালের অর্থনীতির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যে তরুণ আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু মোবাইলের একটি সুবিধা হিসেবে দেখছেন, তিনি হয়তো আগামী দিনের শ্রমবাজারের বড় পরিবর্তনটি বুঝতে পারছেন না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পর্যটন প্রচারণা তৈরি করা যাবে, বিদেশি পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে, কৃষির তথ্য বিশ্লেষণ করা যাবে, ক্ষুদ্র ব্যবসার হিসাব রাখা যাবে, বাজার বিশ্লেষণ করা যাবে এবং নতুন পণ্য ও সেবা তৈরি করা যাবে। তবে প্রযুক্তি নিজে কর্মসংস্থান তৈরি করবে না। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এমন দক্ষ মানুষই নতুন অর্থনীতি তৈরি করবে। তাই সাতক্ষীরার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি, ইংরেজি, যোগাযোগ, উদ্যোক্তা দক্ষতা, ডিজিটাল বিপণন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষা হবে স্থানীয়, বাজার হবে বৈশ্বিক
২০৩৫ সালের তরুণকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করলে চলবে না। তাকে প্রস্তুত করতে হবে বাস্তব পৃথিবীর জন্য। একজন তরুণ সাতক্ষীরায় বসে ঢাকার প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারেন। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য দূরবর্তী কাজ করতে পারেন। অনলাইনে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। পর্যটন সেবা বিদেশি পর্যটকের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে কাজ করতে পারেন। অর্থাৎ আগামী দিনের অর্থনীতিতে ভৌগোলিক দূরত্বের গুরুত্ব কমবে, দক্ষতার গুরুত্ব বাড়বে। সাতক্ষীরার শিক্ষাব্যবস্থাকে তাই স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পর্যটন, কৃষি, মৎস্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবেশ, তথ্যপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নকে শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত করা গেলে তরুণরা শুধু চাকরি খুঁজবে না, নিজেরাই বাজার তৈরি করবে।
একটি জেলার অর্থনীতি বদলায় একটি স্বপ্ন থেকে
সাতক্ষীরা ২০৩৫ কোনো কল্পকাহিনি নয়। এটি একটি পরিকল্পনার নাম হতে পারে। প্রতিটি উপজেলায় তরুণ উদ্যোক্তা কেন্দ্র, স্থানীয় পর্যটন উদ্যোগের জন্য প্রশিক্ষণ, নারীদের ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরির কর্মসূচি, জলবায়ু সহনশীল জীবিকার প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পণ্যের ব্র্যান্ডিং, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, ক্ষুদ্র ঋণ ও বিনিয়োগ সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। সরকার একা এই পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, ব্যবসায়ী, ব্যাংক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পর্যটন উদ্যোক্তা এবং তরুণদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকতার পরিবর্তন। সাতক্ষীরার তরুণকে যদি শুধু বলা হয়, একটা চাকরি করো, তাহলে সে একটি চাকরির পেছনে ছুটবে। আর যদি বলা হয়, একটি কাজ তৈরি করো, তাহলে সে নিজের পাশাপাশি অন্যের জন্যও সুযোগ তৈরি করতে পারে। ২০৩৫ সালের সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাই কী হবে, সেটি এখনই ঠিক করা সম্ভব। সেটি হতে পারে এমন একটি জেলা, যেখানে সুন্দরবন শুধু পর্যটনের গন্তব্য নয়, স্থানীয় অর্থনীতির অংশ; নদী শুধু ভাঙনের কারণ নয়, জীবিকা ও পর্যটনের সম্পদ; সীমান্ত শুধু বাণিজ্যের দরজা নয়, আন্তর্জাতিক সংযোগের কেন্দ্র; প্রযুক্তি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, কর্মসংস্থানের হাতিয়ার। আর সবচেয়ে বড় কথা, যেখানে তরুণরা শুধু ভবিষ্যতের অপেক্ষা করবে না, নিজেরাই ভবিষ্যৎ তৈরি করবে।
সাতক্ষীরা ২০৩৫ এর আসল অবকাঠামো হয়তো বড় কোনো সেতু, ভবন কিংবা মহাসড়ক নয়। আসল অবকাঠামো হবে দক্ষ, সৃজনশীল ও উদ্যোক্তা তরুণদের একটি প্রজন্ম। সেই প্রজন্ম তৈরি করতে পারলে সাতক্ষীরার অর্থনীতির গল্প আর প্রান্তিকতার গল্প থাকবে না। গল্পটি হবে সম্ভাবনার। সাতক্ষীরা ২০৩৫ তখন কোনো দূরের সাল নয়, আজকের তরুণদের হাতে লেখা একটি নতুন অর্থনীতির নাম।
লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা
মন্তব্য করুন