বাংলাদেশ, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১:৪৮ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

‎ফররুখ আহমদের কবিমানস ও বাঙালি মুসলিম নবজাগরণ || ‎তারিক ইসলাম

‎বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ফররুখ আহমদ (১৯১৮ – ১৯৭৪) এক অনন্য ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। তাঁকে সচরাচর ‘মুসলিম নবজাগরণের কবি’ বা ‘রেনেসাঁর কবি’ বলা হয়ে থাকে। তবে তাঁর পরিচয় কেবল কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কবি হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তৎকালীন সামাজিক স্থবিরতা, ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে এক আলোকজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ দেখানোর নামই ফররুখ আহমদ।

‎চল্লিশের দশকের যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ফররুখ আহমদের কাব্যযাত্রার উন্মেষ ঘটে। ১৯৪৩ সালের ভয়াল মন্বন্তর তাঁর তরুণ মননে গভীর রেখাপাত করেছিল। ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ঠ শোষিত মানুষের দুঃখ-কষ্ট এবং একটি হতাশাগ্রস্ত সমাজের আত্মপরিচয়ের সংকট তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন আরবি-ফারসি রূপক, ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যনির্ভর প্রতীকী রূপকল্প।

‎‎ফররুখ আহমদের অমর কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম যুগান্তকারী সৃষ্টি। এর নাম কবিতা এবং বিশ্বখ্যাত ‌‌‘পাঞ্জেরি’-তে তিনি এক রূপক যাত্রার অবতারণা করেছেন। দিকহারা জাহাজের সারেং বা নাখোদার অবয়বে ‘সিন্ধাবাদ’ এবং দিকনির্দেশক হিসেবে ‘পাঞ্জেরি’ চরিত্রটি তৎকালীন নিভু নিভু সম্ভাবনার এক সমাজকে জাগিয়ে তোলার প্রতীক হয়ে ওঠে।

‘রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?
‎এখনো তোমার আসমানী তারা নেভেনি কি সিস্-মেহেলে?
‎তুফান আন্ধার জমাট বেঁধেছে তোমার মাথার ‘পরে…’

এই যে ভোরের আলো দেখার আকুল ব্যাকুলতা, তা কেবল অতীতমুখী কাব্যস্পন্দন ছিল না; বরং তা ছিল পরাধীনতা ও সামাজিক অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক আলোর প্রত্যাশা।

‎অনেক গবেষক ও সমালোচকের মতে, ফররুখ আহমদ ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন, তবে তা অন্ধ অনুকরণে নয়। তিনি কায়কোবাদ, হাতেম তাই কিংবা সিন্দবাদের মতো চরিত্রগুলোকে আধুনিক জীবনবোধের আলোকে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ‘সিরাজাম মুনিরা’ বা ‘হাতেম তা’য়ী’ কাব্যে নৈতিকতা, পরোপকার ও মানবতার বার্তা স্পষ্ট। আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার বাংলা কাব্যে আগে জসীম উদ্দীন বা কাজী নজরুল ইসলামও করেছেন, কিন্তু ফররুখের হাতে তা এক ভিন্ন শৈল্পিক ও ছন্দময় রূপ লাভ করে।

‎সাহিত্যের নানা শাখায় ছিল তাঁর অনায়াস বিচরণ। বিশেষ করে শিশুসাহিত্যে তাঁর ‘পাখির বাসা’, ‘হরফের ছড়া’ বা ‘ছড়ার পাখি’র মতো রচনাগুলো আজ আজও সমান আকর্ষণীয়। ছন্দের নিখুঁত কারুকাজ ও সুরের মূর্ছনা তাঁর ছড়া ও কবিতাকে সাধারণ পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে দেয়।

‎ফররুখ আহমদ কেবল একজন সার্থক কবিই ছিলেন না, ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন আপসহীন ও চরম নীতিবান। আর্থিক অনটন তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী হলেও নিজের কাব্যদর্শন ও সততা থেকে তিনি কখনো সরে আসেননি। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকাতেই এই মহীয়সী কবির জীবনাবাসন ঘটে।

‎বর্তমান বিশ্বায়ন ও সাংস্কৃতিক দ্ব্যর্থতার যুগে নিজ শিকড় ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করা এক বড় চ্যালেঞ্জ। ফররুখ আহমদের সাহিত্য আমাদেরকে সেই আত্মপরিচয়ের মর্যাদা মনে করিয়ে দেয়। আত্মবিস্মৃত সমাজকে স্বাতন্ত্র্য ও আলোর দিশা দিতে ফররুখ আহমদের কাব্যিক দর্শন আজ আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

‎লেখক : সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‎ফররুখ আহমদের কবিমানস ও বাঙালি মুসলিম নবজাগরণ || ‎তারিক ইসলাম

১

তালায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে শাড়ি ও নগদ অর্থ বিতরণ

২

লালনের আখড়াবাড়িতে টাইম বোমা, বিজিবি মোতায়েন

৩

১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু

৪

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ল ‘নিশি’

৫

ইশরাক পদত্যাগ করবেন দুপুরে

৬

শ্যামনগরে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে বিএন‌পি নেতা সৈয়দ ইফতেখার আলী

৭

মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

৮

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন

৯

আশাশুনিতে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে কাজী আলাউদ্দীন

১০

দেবহাটায় পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ

১১

অমর একুশে বইমেলা শুরু ৭ জানুয়ারি

১২

দেবহাটায় যুবককে হত্যা: আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেন ফজলুল হক আমিনী

১৩

সচিবালয় যাচ্ছে শেরেবাংলা নগরে, মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব অনুমোদন

১৪

আকাশে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে যাওয়ায় ঢাকায় জরুরি অবতরণ, রোগীর মৃত্যু

১৫

সাতক্ষীরায় স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যোগে লিফলেট বিতরণ

১৬

হাবিবুল ইসলাম হাবিবের সাথে বাকশিস নেতৃবৃন্দের সৌজন্য সাক্ষাৎ

১৭

কেশবপুর প্রেসক্লাবের নতুন সদস্যদের পরিচিতি ও নবগঠিত কমিটির দায়িত্বভার গ্রহণ

১৮

সংকটে সুন্দরবন ও উপকূলের জীবন-জীবিকা

১৯

সুন্দরবন প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিবের মতবিনিময়

২০