
শ্যামনগর প্রতিনিধি: সুন্দরবনে ফাঁদ পেতে বন্যপ্রাণী শূকর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বন বিভাগ বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি করে মৃত ওই বন্য প্রাণীটিকে মাটিচাপা দিয়েছে। এতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন এবং বন বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনসংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিনাখালি মুন্ডা পাড়ার ভক্ত মুন্ডা নামের এক বনজীবীর বাড়ি থেকে একটি পূর্ণবয়স্ক মৃত বন্য শূকর উদ্ধার করে বন বিভাগের সিপিজি সদস্যরা। এ সময় ওই বন্য শূকরের মুখে ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। তবে এই বিষয়ে ভক্ত মুন্ডার কোন বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার বাড়িতে গেলেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার বাড়ির লোকজন ও ওই মুন্ডা পাড়ার কেউই এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
নিয়ম অনুযায়ী, বন্যপ্রাণীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো, ম্যাজিস্ট্রেট বা সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমতি নিয়ে সুরতহাল করা এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য ময়নাতদন্ত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) দুপুর তিনটার দিকে বন বিভাগের স্থানীয় সিপিজি সদস্যরা মৃত শূকরটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন এবং কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এবং ময়নাতদন্ত ছাড়াই দ্রুততার সাথে সেটি মাটিতে পুঁতে দেন।
বন বিভাগের এই তড়িঘড়ি কর্মকাণ্ড স্থানীয়দের মনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। তাদের দাবি, ফাঁদ পেতে বন্যপ্রাণী শিকার একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। দ্রুত মাটিচাপা দেওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত শিকারিদের আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে অথবা ঘটনাটি কোনোভাবে বন বিভাগের অভ্যন্তরীছ কোনো দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা প্রকাশ করতে তারা চাননি।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় স্থানীয় আব্দুল হান্নান বলেন, বন্যপ্রাণী হত্যার ঘটনা নতুন নয়, কিন্তু বন বিভাগের এই আচরণ খুবই হতাশাজনক। একটি বন্য প্রাণী মারা গেলে নিয়মানুযায়ী সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করতে হবে এবং মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্ত অপরিহার্য। এসবের কিছুই করা হয়নি। তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চেয়েছেন।
উদ্ধারকারী দলের সিপিজি সদস্য ইসমাইল সানা জানান, গতকাল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মুন্ডা পাড়ার ভক্ত মুন্ডার বাড়ি থাকে মৃত অবস্থায় একটি বন্য শূকর উদ্ধার করি। শূকরটির পায়ে ও মুখে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরে সেটি নিয়ে আমরা বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে সেটি মাটিচাপা দেয়া হয়।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, উদ্ধারকৃত বন্য শূকরটি মাটিচাপা দিয়েছি। তবে কেন ময়নাতদন্ত ছাড়াই ও উচ্চ কর্তৃপক্ষকে না পারেননি। তিনি বলেন, এসিএফ স্যার কয়েকদিন সুন্দরবনের গভীরে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। এজন্য আমরা মাটি চাপা দিয়েছি।
এ বিষয় নিয়ে বনবিভাগ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানলাম, এর আগে জানতাম না। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট স্টেশনকে জানিয়ে দিচ্ছি।
এদিকে, বিষয়টি নিয়ে সংবাদকর্মীরা বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়ার পর নড়েচড়ে বসে তারা। এরপর বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান প্রতিবেদকে ফোনে জানান, গতকাল যেটা বলেছিলাম, ওটা সঠিক নয়। আমরা ময়নাতদন্তের জন্য স্যাম্পল রেখে মাটি চাপা দিয়েছি।
এ ঘটনায় সুন্দরবন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা গবেষক ও সাংবাদিক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী, ফাঁদ পেতে বন্য শূকর শিকার বা হত্যা করা গুরুতর অপরাধ। যদিও বন্যপ্রাণী হত্যার নতুন আইনে এটিকে আরো কঠোর করে জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বন্যপ্রাণীর মৃত্যু হলে ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করা সরকারি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা। এ ঘটনা সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন