বাংলাদেশ, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৬ এপ্রিল ২০২৬, ২:১২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

শিক্ষা জীবন ও মোবাইল ফোনের অপব্যবহার | মোঃ নাহিদ সায়াদাত ফুয়াদ

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মোবাইল ফোন মানুষের জীবনের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। যোগাযোগ, তথ্য আদান–প্রদান এবং জ্ঞানার্জনে মোবাইল ফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে এর ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি মোবাইল ফোনের অপব্যবহার আজ একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। বিশেষত শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন এক ধরনের ‘নীরব শত্রু’ হিসেবে কাজ করছে, যা ধীরে ধীরে শিক্ষাজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ কারণেই অনেক সময় মোবাইল ফোনকে ‘পড়ালেখার ক্যান্সার’ বলা হয়।

মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করার অন্যতম প্রধান কারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, ভিডিও এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক কনটেন্ট শিক্ষার্থীদের সহজেই পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত করে। ফলে তারা পড়াশোনায় একাগ্রতা ধরে রাখতে পারে না। এর পরিণতিতে পাঠ্যবইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং পড়ালেখা ক্রমশ অবহেলিত হয়ে পড়ে।

এছাড়া মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের সময় ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে, যা পড়ালেখা, বিশ্রাম, ঘুম ও আত্মোন্নয়নের কাজে ব্যয় করা যেত। কিন্তু দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের ফলে ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি হয়, যার কারণে পরদিন ক্লাসে মনোযোগ কমে যায় এবং শেখার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল গলম্যান ও কগনিটিভ মনোবিজ্ঞানের গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারে মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যায়। দ্রুত স্ক্রলিং, বারবার নোটিফিকেশন এবং একাধিক কাজ একসঙ্গে করার প্রবণতা মস্তিষ্ককে অস্থির করে তোলে। এর ফলে পড়াশোনা ও কাজের দক্ষতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

১ মস্তিষ্ক ও স্নায়বিক সমস্যা
অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা ও স্নায়বিক অস্বস্তি দেখা দেয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।

২ রেডিয়েশনজনিত ঝুঁকি
মোবাইল ফোন থেকে নির্গত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি দীর্ঘদিন শরীরের সংস্পর্শে থাকলে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

৩ কানের কার্যক্ষমতা হ্রাস
দীর্ঘ সময় কানে ফোন ধরে কথা বললে শ্রবণ স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে, যা ধীরে ধীরে শোনার ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে।

৪ ঘাড়–কাঁধ ও হাতের ব্যথা
একটানা মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং দীর্ঘ সময় টাইপ করার ফলে ঘাড়, কাঁধ, কবজি ও আঙুলে ব্যথা ও জড়তা সৃষ্টি হয়।

৫ সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি
অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে পড়াশোনা, কাজ ও পারিবারিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।

৬ চোখের সমস্যা
দীর্ঘ সময় স্ক্রিন দেখার কারণে চোখ শুষ্ক হয়ে যায়, জ্বালা ও ঝাপসা দৃষ্টি দেখা দেয়, যা ‘স্ক্রিনজনিত চোখের চাপ’ হিসেবে পরিচিত।

৭ ফোননির্ভর উদ্বেগ
ফোন হাতে না থাকলে বা নেটওয়ার্ক সমস্যা হলে অকারণ দুশ্চিন্তা ও অস্বস্তি তৈরি হয়, যা আধুনিক আচরণগত মানসিক সমস্যার একটি রূপ।

৮ খারাপ সাইট (পর্নোগ্রাফি) আসক্তি
খারাপ সাইট বা পর্নোগ্রাফি আসক্তি আধুনিক সমাজের একটি মারাত্মক মানসিক ও সামাজিক সমস্যা। অতিরিক্ত পর্ন দেখার ফলে মানুষের নৈতিকতা দুর্বল হয়, মনোযোগ ও একাগ্রতা কমে যায় এবং শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। এটি মস্তিষ্কে কৃত্রিম আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে, যার ফলে ব্যক্তি ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ে। এর প্রভাবে মানসিক অবসাদ, অপরাধবোধ, আত্মসম্মানবোধের ঘাটতি এবং বাস্তব সম্পর্কের প্রতি অনীহা দেখা দেয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়ালেখায় অমনোযোগিতা ও সময়ের অপচয় বাড়ে। তাই সুস্থ মানসিকতা ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য পর্নোগ্রাফি থেকে দূরে থাকা এবং সচেতনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।

৯ প্রজনন স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব
মোবাইল ফোন দীর্ঘ সময় শরীরের কাছাকাছি থাকলে পুরুষ ও নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর গুণগত মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

১০ ঘুমের ব্যাঘাত
রাতে মোবাইল ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্ক অতিরিক্ত সক্রিয় থাকে, যার কারণে অনিদ্রা ও মানসিক ক্লান্তি সৃষ্টি হয়।

১১ মানসিক অবসাদ ও একাগ্রতার অভাব
অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে মানসিক অবসাদ ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, মোবাইল ফোন সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিকর নয়। সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে এটি শিক্ষার একটি কার্যকর সহায়ক মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল লাইব্রেরি, শিক্ষামূলক অ্যাপ এবং গবেষণামূলক তথ্য সংগ্রহে মোবাইল ফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
মোবাইল ফোন নিজে কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা সৃষ্টি করে এর অপব্যবহার। ব্যবহারকারীর সচেতনতার ওপরই নির্ভর করে মোবাইল ফোন শিক্ষার সহায়ক হবে নাকি শিক্ষাজীবনের অন্তরায়। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত সচেতন ও সীমিতভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা এবং পড়ালেখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। অন্যথায় মোবাইল ফোন ধীরে ধীরে পড়ালেখার জন্য সত্যিকার অর্থেই একটি ‘ক্যান্সার’-এ পরিণত হতে পারে।

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ব্লিস হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, ধোয়ার কুণ্ডলীতে রোগী-স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক

পদদলিত করতে ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ-গোলাম আযমের ছবি

অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও গুজব ছড়ানো পেজ বন্ধে বিটিআরসিকে হাইকোর্টের নির্দেশ

হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৩১৬

শিবপুর ইউনিয়ন পরিষদে উন্মুক্ত বাজেট আলোচনা

ডেঙ্গুতে আরও ৭ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৫৯৩ জন

সাতক্ষীরায় শিশু সুরক্ষা নিশ্চিতে মতবিনিময়

টি-টোয়েন্টির অধিনায়কত্ব ছাড়ছেন নিগার সুলতানা

কাকে পাশে নিয়ে জীবন কাটাতে চান মিম?

তালা সরকারি কলেজে ছাত্রদলের পরিচ্ছন্নতা অভিযান

১০

কালিগঞ্জে গৃহবধূসহ দু’জনকে কুপিয়ে জখম

১১

মিলিটারি ট্রেনিং করছেন নুসরাত ফারিয়া

১২

আশাশুনির ২৭ জলাশয়ে ৩৩৩ কেজি মাছের পোনা অবমুক্ত

১৩

নতুন রিশাদ-এবাদতদের খুঁজতে ৮ বছর পর ফিরছে ‘বোলার হান্ট’

১৪

আশাশুনিতে টেপা মাছ খেয়ে প্রাণ গেল গৃহকর্তার, অসুস্থ ৪

১৫

সঞ্চয়পত্রে আজ থেকে চালু নতুন পদ্ধতি

১৬

উৎপাদনে ফিরল চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার

১৭

সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজে নজরুল সাংস্কৃতিক উৎসব

১৮

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আসিফ নজরুলের ‘একক সিদ্ধান্তে’ অংশ নেয়নি বাংলাদেশ

১৯

তেলের দামে উত্তাপ, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের শঙ্কা

২০
error: Content is protected !!