বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
৮ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
২৪ মে ২০২৬, ৭:১৩ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

জলবায়ু সংকট মোকাবেলার প্রাকৃতিক হাতিয়ার ‘কার্বন সিংক’ || তারিক ইসলাম

জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের পরিবেশ সুরক্ষায় ‘কার্বন সিংক’ (Carbon Sink) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই ধারণাটি এখনও বেশ নতুন।

কার্বন সিংক কী?
সহজ কথায়, কার্বন সিংক হলো এমন এক প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম ব্যবস্থা, যা বায়ুমণ্ডল থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস (বিশেষ করে কার্বন ডাই-অক্সাইড) শোষণ করে নিজের মধ্যে জমা বা সংবদ্ধ করে রাখে। এটি মূলত প্রকৃতির একটি নিজস্ব ফিল্টারিং ব্যবস্থা।

প্রকৃতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এবং শোষণের একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য থাকে। যখন কোনো প্রাকৃতিক উপাদান বায়ুমণ্ডলে কার্বন ছাড়ার চেয়ে বেশি পরিমাণে কার্বন শোষণ করে, তখন তাকে কার্বন সিংক বলা হয়।

প্রধান প্রাকৃতিক কার্বন সিংকসমূহ:
বনভূমি ও উদ্ভিদ: সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছপালা বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং তা কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা, পাতা ও মূলের মধ্যে জৈব কার্বন হিসেবে জমা রাখে।

মহাসাগর ও জলাভূমি: পৃথিবীর মহাসাগরগুলো বায়ুমণ্ডলের সিংহভাগ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। এছাড়া সামুদ্রিক শৈবাল ও জলজ উদ্ভিদও বড় ভূমিকা রাখে।

মাটি: মাটিতে থাকা অণুজীব এবং পচনশীল জৈব পদার্থ বিপুল পরিমাণ কার্বন ধরে রাখে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কার্বন সিংকের গুরুত্ব
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা এবং জলবায়ুগত সংবেদনশীলতার কারণে এখানে কার্বন সিংকের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে নিচের ক্ষেত্রগুলোতে এর প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি:

১. সুন্দরবন ও ব্লু কার্বন (Blue Carbon) ভাণ্ডার
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ‘সুন্দরবন’ দেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক কার্বন সিংক। ম্যানগ্রোভ বনের গাছপালা সাধারণ বনের তুলনায় ৪ থেকে ১০ গুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে, যা মাটির নিচে এবং গাছের শিকড়ে জমা থাকে। একে বলা হয় ব্লু কার্বন। সুন্দরবন কেবল কার্বন শোষণই করে না, বরং সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে দেশকে রক্ষা করে।

২. উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলের জলাভূমি
বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ হাওর, বাঁওড়, বিল এবং উপকূলীয় জলাভূমিগুলো বিশাল পরিমাণের কার্বন সিংক হিসেবে কাজ করে। এই পিটল্যান্ড (Peatland) বা কর্দমাক্ত মাটির জলজ উদ্ভিদগুলো পচনের পর পানির নিচে বছরের পর বছর কার্বন জমা রাখে, যা বায়ুমণ্ডলে মিশে যেতে পারে না।

৩. গ্রিনহাউস গ্যাস প্রশমন ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে খুব সামান্য (১ শতাংশের কম) ভূমিকা রাখলেও, জলবায়ু চুক্তির (যেমন প্যারিস চুক্তি) অংশ হিসেবে আমাদের নিজস্ব নিঃসরণ কমানোর এবং বনায়ন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দেশের বনাঞ্চল ও কার্বন সিংকগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করলে তা বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলের সুবিধা পেতে এবং আন্তর্জাতিকভাবে দেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সাহায্য করবে।

৪. কৃষি ও মাটির উর্বরতা রক্ষা
বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে মাটির গুণাগুণ ধরে রাখা জরুরি। মাটিতে অর্গানিক কার্বনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে (যা এক প্রকার কার্বন সিংক) মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ে, রাসায়নিক সারের প্রয়োজনীয়তা কমে এবং টেকসই কৃষি নিশ্চিত হয়।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
দুর্ভাগ্যবশত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড়, নদী ও জলাশয় ভরাট করার কারণে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক কার্বন সিংকগুলো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। সুন্দরবনের ওপর মানবিক চাপ বৃদ্ধি এবং দেশের সামগ্রিক বনভূমির পরিমাণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রার (২৫%) চেয়ে কম হওয়া আমাদের জন্য চিন্তার কারণ।

আমাদের করণীয়:
ম্যানগ্রোভ রক্ষা ও উপকূলীয় বনায়ন: সুন্দরবন রক্ষা ও উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন করে কেওড়া, বাইনসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ লাগানোর ওপর জোর দিতে হবে।

সামাজিক বনায়ন বৃদ্ধি: দেশের গ্রামীণ ও নগর এলাকায় ছাদবাগান, রাস্তার পাশে এবং পতিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগিয়ে কৃত্রিম কার্বন সিংক তৈরি করা সম্ভব।

জলাভূমি সংরক্ষণ: হাওর ও জলাশয় ভরাট বন্ধ করে সেগুলোর প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

কার্বন সিংক শুধু পরিবেশ বিজ্ঞানের কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে একটি সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রাকৃতিক কার্বন সিংকগুলোর সুরক্ষা এবং নতুন বনায়ন সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। সরকার, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সচেতনতাই পারে এই প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচকে টিকিয়ে রাখতে।

লেখক: সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আশাশুনিতে মাদ্রাসাছাত্রকে যৌন নিপীড়ন, প্রধান শিক্ষক গ্রেপ্তার

১

ভাটায় কাজে যাওয়ার শর্তে দাদন নিয়ে পালিয়েছে ছেলে, সর্দার তুলে নিয়ে গেল মাকে

২

খুলনায় নারীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা

৩

সুন্দরবনে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিলের দাবি

৪

১১৪ বলে ডাবল সেঞ্চুরি, ওয়ানডেতে বিশ্ব রেকর্ড ব্রুকের

৫

বঙ্গোপসাগরে ফের লঘুচাপ সৃষ্টির আশঙ্কা, দেশজুড়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা

৬

প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে ঢাকায় ফেরানো হলো জাপানের রাষ্ট্রদূতকে

৭

তালা থানার নতুন ওসি আব্দুল আলিম

৮

মুন্সীগঞ্জ বাজারে জামায়াত নেতার গণসংযোগ

৯

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন দরদির নতুন কমিটি গঠন: সভাপতি নয়ন পাল, সম্পাদক রাকিব

১০

মোংলা বন্দর পরিদর্শন করে যেসব নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

১১

সুন্দরবনের গোলখালী থেকে হরিণের পা মাথা চামড়া ও মাংস উদ্ধার

১২

হরিনগর অনির্বান ক্লাবের উদ্যোগে ১৬ দলীয় কেরাম প্রতিযোগিতা উদ্বোধন

১৩

তালা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মন্তব্যের প্রতিবাদে সভা

১৪

কয়রা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে চিকিৎসক না থাকার অভিযোগ, শিশুর মৃত্যু

১৫

পাটকেলঘাটায় ৮শ লিটার নারকেল তেল জব্দ, যাচাই হচ্ছে ভেজাল কি না

১৬

কয়রায় সরকারি জমি নিয়ে সংঘর্ষ, চিকিৎসাধীন পল্লী চিকিৎসকের মৃত্যু

১৭

বন্ধ হচ্ছে টুজি, চাপে বাটন ফোন

১৮

কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে গোসলে নেমে তিন পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ ২

১৯

কালিগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

২০