বাংলাদেশ, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১০ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১ মে ২০২৬, ২:৩২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

উপকূলে নারী শ্রমিকদের সংগ্রাম: কাজ সমান, মজুরি অর্ধেক

 

সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: আজ পহেলা মে। মহান শ্রমিক দিবস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন। কিন্তু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরার শ্যামনগরের এই দিনটি যেন কেবল স্মরণেই সীমাবদ্ধ। এখানে অসংখ্য নারী শ্রমিক প্রতিদিন পুরুষের সমান পরিশ্রম করেও মজুরি পান অর্ধেক। দীর্ঘকাল ধরে এই অর্ধেক মজুরি পেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

১৮৮৬ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সেই আত্মত্যাগের ইতিহাস আজও বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অধিকারের প্রতীক হিসেবে প্রচলিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো উপকূলের এই নারীরা এখনও ন্যায্য মজুরি, সম্মান আর নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত।

শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ, ঈশ্বরীপুর, কৈখালী ও ভুরুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, ধানক্ষেত থেকে শুরু করে কাঁকড়া খামার, মাছের ঘের, নদীতে রেণু আহরণ, এমনকি রাস্তা নির্মাণের কাজেও পুরুষের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন নারীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদে পুড়ে, কাদা-মাটিতে ভিজে তারা দিন পার করেন। কিন্তু দিনের শেষে হিসাব মেলে না।

স্থানীয় নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজের ধরন ও সময় এক হলেও শুধুমাত্র নারী হওয়ায় তারা কম মজুরি পাচ্ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে এই কম পারিশ্রমিকেই কাজ করছেন, কারণ বিকল্প আয়ের সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে, কিছু স্থানীয় ব্যক্তি জানান, এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত একটি চর্চা, যা এখনও পরিবর্তন হয়নি। ফলে বাস্তব চিত্রে নারী-পুরুষের মজুরির এই বৈষম্য এখনো স্পষ্টভাবে বিদ্যমান রয়েছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর উপজেলার ৩৬টি কৃষিব্লকে ২ হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ও ৬০০ হেক্টর জমিতে অন্যান্য সবজি চাষ হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, চাষাবাদের কাজে নিয়োজিত অধিকাংশই শ্রমিকই নারী। মজুরি কম বলে চাষিরা নারী শ্রমিকদেরই বেশি নিয়োজিত করেন।

সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্ব ধানখালী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, একই ধরনের কৃষিকাজে নিয়োজিত নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যে মজুরির ক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈষম্য বিদ্যমান। মাঠে ধান কাটা, রোপণ ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে দৈনিক ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাচ্ছেন, সেখানে একই সময় ও সমপরিমাণ পরিশ্রম করেও নারী শ্রমিকদের দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।

ধানকাটা কাজ করা নারী শ্রমিক শিবানী মন্ডলের কণ্ঠে ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব স্পষ্ট। তিনি জানান, স্বামীর আয়ে সংসার চলে না। তাই বাধ্য হয়ে কাজে বের হন। কিন্তু সারাদিন পরিশ্রম করেও পুরুষের অর্ধেক মজুরি পান। এটাই তার বড় কষ্ট।

একই সুর নারী শ্রমিক আলেয়া বেগমের কণ্ঠেও। তার ভাষ্য, একই সময়, একই কাজ করি। কিন্তু টাকা নিতে গেলে মনে হয় আমরা মানুষ না, আলাদা কিছু।

তার মতো উপজেলার অন্যসব নারী শ্রমিকরা মজুরিবৈষম্যের শিকার হলেও, তাদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই। নারীদের এই সংগ্রাম শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। কাজ শেষে ঘরে ফিরেই শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। রান্না, সন্তান দেখাশোনা, পানি আনা সবকিছুই তাদের একাই সামলাতে হয়।

এবিষয়ে কাচড়াকাটি গ্রামের শ্যামলী মন্ডল বলেছেন, সকাল থেকে মাঠে কাজ করি। বাড়ি এসে আবার রান্না, বাচ্চা সামলাই। দুই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়। এত কষ্টের পরও কেউ আমাদের কাজের মূল্য দেয় না।

স্থানীয় চাষী রফিকুল ইসলামও স্বীকার করেন এই বৈষম্যের কথা‌। তিনি বলেছেন, নারীরা পুরুষের মতোই কাজ করে। কিন্তু আমরা পুরুষদের ৫৫০ টাকা আর নারীদের ৩০০ টাকা মজুরি দেই।

উপকূলীয় এই অঞ্চলে পুরুষ শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কাজের সন্ধানে শহরে চলে যাওয়ায় কৃষি ও মৎস্য খাতে নারীদের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু সেই নির্ভরতার বিপরীতে তারা পাচ্ছেন না ন্যায্য মূল্যায়ন।

এই বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় শিক্ষার্থীরাও। শ্যামনগর সরকারি মহাসিন ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সামিরা আক্তার ও তার সহপাঠীরা জানান, মেয়েরা এখনও পরিবার ও সমাজে পিছিয়ে। লেখাপড়ার সুযোগ কম, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য বেশি।

এ ধরনের মজুরিবৈষম্য নিরসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় হতাশ উপজেলার নারী শ্রমিকেরা। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর নারী দিবসে সভা ও মানববন্ধনের মাধ্যমে কেবল সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করে। নারীদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সংস্থার সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম চোখে পড়েনি। এমনকি উপজেলায় কত সংখ্যক নারী শ্রমিক নিয়োজিত আছেন, তারও কোনো জরিপ নেই মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কাছে।

দাতিনাখালি বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের পরিচালক শেফালী বেগম জানান, আগে পুরুষরা সুন্দরবনে গিয়ে আয় করতো। এখন সুন্দরবনের অভয়ারণ্যের সাথে নিষেধাজ্ঞার সময়ও বেড়েছে। তাই সংসার চালাতে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তারা সমান মজুরি পায় না। তার মতে, নারীদের পেছনে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। মজুরি বৈষম্য দূর না হলে নারীরা কাজের আগ্রহ হারাবে।

এ প্রসঙ্গে নারীনেত্রী নুরজাহান পারভীন ঝর্ণা বলেছেন, একজন নারী কোনোভাবেই পুরুষের চেয়ে কম কাজ করেন না। নারী-পুরুষ সমানই কাজ করেন। তাই মজুরিবৈষম্য মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি নিয়ে সরকারিভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ করা উচিত।

এ বিষয়ে উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক জানান, পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিকের মজুরি অর্ধেক হওয়া সত্যি দুঃখজনক। তবে এই বৈষম্য নিরসনে সচেতনতামূলক সভা ও মানববন্ধন করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই। উপজেলায় কত সংখ্যক নারী শ্রমিক রয়েছেন বা কাজ করেন তার তথ্যও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কাছে নেই।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাতক্ষীরায় আওয়ামী লী‌গের তিন নেতা গ্রেপ্তার

১

একই জায়গায় আটকে থাকতে চাই না

২

চলন্ত স্লিপার বাসে আগুন, ঘুমের মধ্যেই পুড়ে মরল ৯ যাত্রী

৩

বোয়িংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তি

৪

এশিয়ান গেমসে শ্রীলঙ্কাকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিল বাংলাদেশ

৫

বিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বিশ্ব গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

৬

দুপুরের মধ্যে ১১ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির আভাস

৭

আশাশুনির নয়াবাদে স্বামীর নির্মম নির্যাতনে হাসপাতালে স্ত্রী

৮

কালিগঞ্জ সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভা

৯

কালিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভূমি অফিস পরিদর্শনে এমপি রবিউল বাশার

১০

ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ

১১

পাইকগাছায় কৃষকদলের বিক্ষোভ মিছিল

১২

কালিগঞ্জে যুবদলের আনন্দ মিছিল

১৩

চাঁদা না পেয়ে নির্মাণাধীন বাড়ি ভাঙচুর ও মারপিটের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

১৪

সাতক্ষীরায় এবি পার্টির কমিটি গঠন: আহ্বায়ক শাকিল, সদস্য সচিব শাহীন

১৫

সাতক্ষীরা জেলা শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদের কমিটি গঠন: সভাপতি রাসেল, সম্পাদক গাজী বাবু

১৬

গাছের ডালে ঝুলছিল ১১ ফুটের অজগর, উদ্ধারের পর সুন্দরবনে অবমুক্ত

১৭

৬ লাখ মানুষের জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম চান সাতক্ষীরার যুবরা

১৮

দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে সাতক্ষীরায় স্বেচ্ছাসেবক দলের বিক্ষোভ মিছিল

১৯

সাতক্ষীরায় মানবাধিকার সাংবাদিক নেটওয়ার্ক’র সভা

২০