বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
১৯ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৩০ জুন ২০২৬, ২:০৭ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

বিলুপ্তির পথে ‘গোলাপ জাম’ || ‎তারিক ইসলাম

‎শহুরে ব্যস্ততা কিংবা আধুনিক ফলের ভিড়ে আমরা অনেকেই হয়তো ভুলে যেতে বসেছি এমন এক ফলের নাম, যা একসময় এদেশের বনে-বাদাড়ে কিংবা বাড়ির আঙিনায় হরহামেশাই দেখা যেত। ফলটির নাম ‘গোলাপ জাম’। শুধু নামেই নয়, এর রূপ এবং সুবাসেও জড়িয়ে আছে এক রাজকীয় আভিজাত্য। কাঁচা অবস্থায় হালকা সবুজ আর পাকলে ঈষৎ হলদেটে বা গোলাপি আভা ধারণ করা এই ফলটি মুখে দিলে সত্যিই মনে হয় কোনো গোলাপের নির্যাস আস্বাদন করা হচ্ছে। অথচ কালের বিবর্তনে আমাদের চেনা প্রকৃতির বুক থেকে এই ফলটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

‎‎উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় গোলাপ জামের বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium jambos। এটি মূলত ‘মির্টাসি’ (Myrtaceae) গোত্রের একটি চিরহরিৎ বৃক্ষ। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এটি ‘রোজ অ্যাপল’ (Rose Apple) কিংবা ‘মালাবার প্লাম’ (Malabar Plum) নামে পরিচিত হলেও, আমাদের উপমহাদেশে এর পরিচয় মূলত ‘গোলাপ জাম’ বা ‘গুলাব জামুন’ হিসেবে। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে এটিকে পরম মমতায় ‘মেওয়া ফল’ বলেও ডাকা হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ফিলিপাইন, চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়ায় এই গাছটি প্রাকৃতিকভাবেই দারুণভাবে মানিয়ে নেয়।

‎ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই গোলাপ জামের রয়েছে এক গৌরবময় অতীত। একসময় মোগল বা সুলতানি আমলের রাজা-বাদশাহদের হেরেমখানা কিংবা অন্দরমহলের অত্যন্ত প্রিয় এবং অভিজাত ফল ছিল এটি। এর তীব্র মিষ্টি সুবাস এবং রসালো স্বাদের কারণে রাজকীয় বাগিচায় এই গাছের ঠাঁই হতো সবার আগে। গ্রীষ্মের দাবদাহ শেষে যখন বর্ষার আগমন ঘটে, ঠিক তখনই বাজারে বা গাছে উঁকি দেয় এই ফল। এটি শুধু খেতেই সুস্বাদু নয়, এর রয়েছে দারুণ কিছু ঔষধি গুণ ও পুষ্টিগুণ। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ ও ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও হাড়ের গঠনে সাহায্য করে।

‎দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই গোলাপ জাম একটি অচেনা নাম। দ্রুত নগরায়ণ, নির্বিচারে গাছ কাটা এবং বাণিজ্যিক ফলের জোয়ারে এই ঐতিহ্যবাহী দেশি ফলটি আজ কোণঠাসা। বাণিজ্যিকভাবে চাষ না হওয়ায় নতুন করে কেউ আর গোলাপ জামের চারা রোপণ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে পুরোনো গাছগুলো মরে যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একটি সুমিষ্ট অধ্যায়।

‎আমাদের দেশীয় ফলের বৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই রাজকীয় ফলের স্বাদ ও ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন নার্সারি বা বোটানিক্যাল গার্ডেনে গোলাপ জামের বংশবৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের মাঝে এর চারা বিতরণ করা প্রয়োজন। একই সাথে, বাড়ির আঙিনায় বা ছাদবাগানে শখের বশে হলেও এই গাছটি রোপণ করে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারি অন্দরমহলের সেই প্রাচীন সুবাস। আমাদের উদাসীনতায় হারিয়ে না যাক প্রকৃতির এই অনন্য উপহার; বেঁচে থাকুক গোলাপ জাম, টিকে থাকুক আমাদের চেনা বাংলার সবুজ ঐতিহ্য।

লেখক: সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘লালনের গান মানবতার জয়গান গাইতে শেখায়’

১

বেতনা পাড়ে যুবদলের বৃক্ষরোপণ

২

প্রেম গোপনেই সুন্দর : কেয়া পায়েল

৩

২০২৭ সালে সরকারি ছুটি ২৯ দিন

৪

স্থানীয় নির্বাচনে কারা পাবেন বিএনপির মনোনয়ন, জানালেন রিজভী

৫

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত: মুক্ত হোক প্রান্তিক কৃষক || ‎তারিক ইসলাম

৬

কালিগঞ্জে ৪ কেজি গাঁজাসহ নারী আটক

৭

এইচএসসিতে উপজেলার শীর্ষে তালা মহিলা কলেজ, আনন্দ র‌্যালি

৮

কেশবপুরে দুই সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে সাংবাদিকের মামলা

৯

কুল্যা ইউপি চেয়ারম্যান পলাশ ও বুধহাটা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জহিরুল গ্রেপ্তার

১০

দেবহাটায় ৩০০ বোতল ফেয়ারডিল সিরাপসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

১১

গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশ উপলক্ষে কালিগঞ্জে প্রস্তুতি সভা

১২

মানিক পশারীর দাফনে বাধা: জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজপথে বীর মুক্তিযোদ্ধারা

১৩

শ্যামনগরে বাসের ধাক্কায় ইজিবাইক চালক নিহত

১৪

বনদস্যু নির্মূল দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি

১৫

আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক সাতক্ষীরা শাখার ব্যবস্থাপকসহ দুই জনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

১৬

এনআইডি হারিয়ে গেলে জিডি ছাড়াই যেভাবে পাবেন নতুন কার্ড

১৭

সালমান এফ রহমানসহ ৬৯ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

১৮

১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ২২৩ টাকা

১৯

র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেললো আফগানিস্তান

২০