
ডেস্ক রিপোর্ট: চারদিন অতিবাহিত হলেও, সুন্দরবনে দস্যুদের হাতে অপহৃত ২১ জেলে উদ্ধার হয়নি। এ ঘটনায় অপহৃত জেলেদের পরিবার, ব্যবসায়ী ও সুন্দরবনগামী জেলেদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
তবে জেলেদের উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বন বিভাগ ও কোস্টগার্ড।
জেলে, মহাজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়- গত শুক্র ও শনিবার (২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের নারকেলবাড়িয়া, আমড়ারিয়া, ভদ্রা ও ভাঙ্গা এলাকায় পৃথকভাবে জেলেদের ওপর হামলা চালায় দস্যুরা।
এ সময় মজনু, করিম শরীফ ও বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা ২১ জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। দস্যুরা একটি মাছ ধরা ট্রলার, পাঁচটি মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামালও লুট করে নিয়ে যায়।
অপহৃতদের বাড়ি বাগেরহাট, বরগুনা ও খুলনা জেলার বিভিন্ন এলাকায়। এদের মধ্যে ১০ জন জেলের নাম পাওয়া গেছে।
তারা হলেন- আরিফ (২৫), সগীর (৩৪), মিঠু (৩০), ফেরদাউস (২৮), ইব্রাহিম (৩৫), ইমরান (২৫), মোস্তাফিজুর (৩৫), আলামিন (২৮), হানিফ (৩৮) ও মারুফ (৪৯)।
অপহরণের পর থেকে স্থানীয় জেলে, জেলে পরিবার ও অপহৃত জেলেদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দস্যুদের ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানিয়েছেন, জেলেদের মুক্তির বিষয়ে তারা দস্যুদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছেন। মুক্তিপণ হিসেবে দস্যুরা মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবি করছেন। তবে এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে রাজি নয় তারা। কারণ নাম-পরিচয় প্রকাশ পেলে পরবর্তীতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মহাজনদের দাবি, জেলেদের মুক্তি নিয়ে দস্যুদের সঙ্গে তাদের দর-কষাকষি চলছে। দাবি করা অর্থ পরিশোধ করা হলে জেলেদের ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে দস্যুরা। দ্রুত মুক্তিপণ দেওয়ার জন্যও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও জানান তারা।
এদিকে অপহরণের ঘটনায় সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া সাধারণ জেলেদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই দস্যু আতঙ্কে বনে যেতে দ্বিধা করছেন। তাদের দাবি, সুন্দরবনে দস্যুদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করে জেলেদের নিরাপদে মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
শরণখোলা মৎস্য আড়তের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান তালুকদার বলেন, সুন্দরবনে দস্যুতা আবারও বেড়েছে। দস্যুদের উৎপাত থাকা সময়টা আমাদের জন্য খুবই আতঙ্কের। কারণ ঠিক-ঠাক মাছ আহরণও করা যায় না। আর যেসব জেলেরা অপহৃত হয়, তাদের পরিবারের সদস্যরা কথাও বলতে পারে না। কারণ জেলেদের মেরে ফেলারও ভয় রয়েছে। তবে সুন্দরবনে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলেও, জেলেদের জীবন-জীবিকা ঝুঁকিতে পরবে বলে মনে করেন তিনি।
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহাবুব হোসেন বলেন, ‘সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান চলছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ড্রোন ব্যবহার করে দস্যুদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপহৃতদের উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, অপহৃত জেলেদের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাদের উদ্ধারে কোস্টগার্ডের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সুন্দরবনে অবস্থানরত জেলেদের রাতে দলবদ্ধভাবে এবং সংশ্লিষ্ট বন অফিসের আশপাশে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন বিভাগের সব স্টেশন, টহল ফাঁড়ি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত বনরক্ষীদের জেলেদের নিরাপত্তায় টহল বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনে মজনু, বড় জাহাঙ্গীর, করিম শরীফসহ কয়েকটি বাহিনীর নাম শোনা যাচ্ছে। এটা জেলে ও সুন্দরবনের জন্য হুমকি (থ্রেট) স্বরূপ। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
চলতি বছর সুন্দরবনের বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর শতাধিক সদস্য কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন ও এসআরবি, খুলনার কাছে আত্মসমর্পণ করে। অন্তত ৫০ জন দস্যু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকও হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ। দস্যু দমনে বার হুঁশিয়ারী ও শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি ঘোষণা করছে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারপরও সুন্দরবনে দস্যুদের প্রভাব ভাবিয়ে তুলছে উপকূলবাসীকে।
মন্তব্য করুন