বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
২১ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
shimulsheikh862@gmail.com
৬ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৪২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

কমেছে বৈশ্বিক সহায়তা, সংকটে ২ হাজার ২০০ এনজিও

ডেস্ক রিপোর্ট: বিশ্বজুড়ে বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ায় বড় ধরনের অর্থায়ন সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি এনজিও। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই এবং যারা প্রায় পুরোপুরি বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০টি এনজিও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। অর্থায়নের সংকট দীর্ঘ হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি-স্যানিটেশন, জলবায়ু ও অন্যান্য সামাজিক সেবা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বিদেশ-নির্ভরতা পেরিয়ে: বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল।

গবেষণায় এনজিওবিষয়ক ব্যুরো ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি ৪৬টি এনজিওর ওপর জরিপ, জাতীয় পরামর্শ সভা, উত্তরাঞ্চলের ছোট ও মাঝারি এনজিও নিয়ে দলীয় আলোচনা এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। সম্মানিত অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ. কে. এনামুল হক।
এক বছরে বিদেশি সহায়তা কমেছে ২৩ শতাংশ

গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা দ্রুত কমছে। ২০২৫ সালে ধনী দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত মূল্যে ২৩ শতাংশ কমেছে। এক বছরে সহায়তা কমার হিসেবে এটি সবচেয়ে বড় পতন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএআইডি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের আগামী কয়েক বছরের সহায়তা বাজেট কমানোর কারণে এ সংকটকে সাময়িক নয় বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।

বাংলাদেশে এখনো এর পুরো প্রভাব দেখা যায়নি। কারণ আগের অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর অর্থ এখনো ছাড় হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব প্রকল্পে ১০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। তবে, নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা এরই মধ্যে কমে গেছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে এনজিও খাতে ২ হাজার ৬১টি প্রকল্প অনুমোদিত হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে ১ হাজার ৬৫৪টিতে দাঁড়িয়েছে। ফলে পুরোনো প্রকল্পের অর্থ শেষ হয়ে গেলে সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে অনুদাননির্ভর এনজিও

৪৬টি এনজিওর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, বিদেশি অনুদাননির্ভর সেবাধর্মী এনজিওগুলোর বাজেট গড়ে ৪০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকা এনজিওগুলোর বাজেট কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ।

অর্থাৎ যেসব এনজিওর নিজস্ব আয় বা ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক অর্থের উৎস রয়েছে তারা তুলনামূলকভাবে সংকট সামাল দিতে পারছে। কিন্তু অনুদাননির্ভর ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর বিকল্প অর্থের উৎস সীমিত। এ কারণে প্রায় ২ হাজার ২০০ প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

অর্থের সংকট দেখা দিলে প্রথম ধাক্কা মাঠপর্যায়ের সামাজিক সেবায় পড়তে পারে। স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি কমিয়ে দিতে বা কর্মী সংখ্যা কমাতে বাধ্য হতে পারে। কেউ কেউ টিকে থাকার জন্য সামাজিক কার্যক্রম কমিয়ে ক্ষুদ্রঋণ বা আয়মূলক কার্যক্রমে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এনজিওগুলোর যোগাযোগ ও সেবা দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের অর্থে এনজিওকে যুক্ত করার প্রস্তাব

সংকট মোকাবিলায় চারটি বিকল্প অর্থায়নের পথের কথা গবেষণায় বলা হয়েছে। এগুলো হলো—সরকারি ব্যয় ও প্রকল্পে এনজিওকে যুক্ত করা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অর্থ ব্যবহার, সামাজিক ব্যাবসা এবং নতুন ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা।

গবেষকদের মতে, এসব বিকল্পের মধ্যে বড় পরিসরে অর্থ জোগানের সক্ষমতা মূলত সরকারেরই রয়েছে। বিদেশি অনুদানের পরিমাণ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। ২০২৫ সালের সরকারি ক্রয়বিধিতে সরকারি সেবা প্রদানে এনজিওকে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হলেও বাস্তবে এ সুযোগ খুব কম ব্যবহার করা হচ্ছে।

গবেষণায় সরকার ও এনজিওর যৌথভাবে সেবা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, এনজিওগুলোর প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছানোর সক্ষমতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জ্ঞান এবং সেবা গ্রহণে মানুষকে সম্পৃক্ত করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে কিছু সেবা সরকার একা দেওয়ার পরিবর্তে এনজিওকে সঙ্গে নিয়ে দিলে ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সেবার কার্যকারিতাও বাড়তে পারে।
সিএসআরেও কমছে অর্থ

বিদেশি অনুদানের বিকল্প হিসেবে সিএসআরকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখা হলেও এখানেও সংকোচন দেখা দিয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর সিএসআর ব্যয় ২০২৫ সালে ৩৪৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ফলে বিদেশি অনুদানের বড় ঘাটতি এককভাবে সিএসআর দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

সামাজিক ব্যবসা ও নতুন আর্থিক ব্যবস্থাও বিকল্প হতে পারে। তবে, ছোট এনজিওগুলোর ক্ষেত্রে বন্ড বা ফলভিত্তিক অর্থায়নের মতো ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় জামানত, ঋণ পোর্টফোলিও ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় যোগ্য এনজিওগুলোর একটি উন্মুক্ত তালিকা তৈরির সুপারিশ করেছে বিআইডিএস। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ক্রয়, সিএসআরসহ বিভিন্ন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া সরকারি ক্রয়বিধিতে এনজিওকে সেবা প্রদানকারী হিসেবে যুক্ত করার বিধান কার্যকর করতে আলাদা নির্দেশিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। ছোট ও মাঝারি এনজিওর জন্য এনজিও ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফের মাধ্যমে তহবিল গঠন, সিএসআর নীতিতে যোগ্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ এবং সামাজিক ব্যাবসার আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বললেন অর্থমন্ত্রী

অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। দেশের প্রয়োজন ও সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী এনজিওগুলোর সক্ষমতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে একটি নীতিকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় এনজিওগুলো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে একদিকে তাদের অর্থায়নের বিকল্প তৈরি হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি দেশের সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

গবেষকদের মতে, বিদেশি অনুদান কমার প্রভাব বাংলাদেশে এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। তবে, নতুন প্রকল্প অনুমোদন কমে যাওয়ার প্রবণতা সামনে বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পুরোনো প্রকল্পের অর্থ শেষ হওয়ার পর ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি প্রকল্প, দেশীয় অর্থায়ন, সিএসআর ও সামাজিক ব্যবসাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে এনজিও খাতে নতুন অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন গবেষকরা।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কমেছে বৈশ্বিক সহায়তা, সংকটে ২ হাজার ২০০ এনজিও

১

তর্কে হেরে গিয়ে জীবনে জেতার আনন্দ || তারিক ইসলাম

২

‘রূপে আছে নেশা, চোখে ছলনা’

৩

পাকিস্তানে ক্ষমতার নতুন লড়াই, প্রদেশ ভাঙার উদ্যোগ সেনাপ্রধানের

৪

হামের উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১ হাজার ৩৯৩

৫

‘জাস্টিস ফর জাকারিয়া’র কমিটি গঠন

৬

‘সকালবেলা নায়িকা, বিকেলবেলা ভিলেন’, দলবদল নিয়ে কোয়েলকে কটাক্ষ

৭

আগামীকাল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ, যেভাবে দেখবেন

৮

দক্ষিণ কাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ইউনিফর্ম ও খাতা বিতরণ

৯

সৌদির দুই বিমানবন্দরে হামলা

১০

জাতীয় কন্যা শিশু দিবস উদযাপনে স্বদেশ’র র‌্যালি ও সমাবেশ

১১

কয়রার ২০ বিদ্যালয়ে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার ক্লাস নিয়ে বিড়ম্বনা!

১২

পাইকগাছায় অবৈধ বন্দোবস্ত বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন

১৩

ইচ্ছে পূরণ হয়নি, যে আক্ষেপ পরীমণির

১৪

বুড়িয়া মণ্ডপে ৩৫ হাজার মুক্তায় সেজেছে ‌‘দুর্গা প্রতিমা’, দর্শনার্থীদের ভিড়

১৫

আবরার হত্যার ৭ বছর: চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে যে উদ্যোগ নিচ্ছে রাষ্ট্র

১৬

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপনে কেন্দ্রীয় কমিটির সভা

১৭

একদিনে ডেঙ্গুতে ১০ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৯৬

১৮

দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক

১৯

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জিতলেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন

২০