
২০১৯ সালের ৫ আগস্ট। ভারতীয় পার্লামেন্ট একটি আইন পাশ হয়। এই আইন দ্বারা জম্মু কাশ্মীরের কিছু বিশেষ সুবিধা বাতিল করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই কাশ্মীরের জনগণের তা পছন্দ হওয়ার কথা নয়৷ তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে এই আশংকায় আগেভাগেই কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে কোনো চার্জ ছিল না৷ ভবিষ্যতে তিনি কোনো অনিষ্টকর কাজ করতে পারেন এই আশংকায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। এই ধরণের নিপীড়ন মূলক গ্রেফতারের নাম নিবর্তনমূলক আটক বা প্রিভেনটিভ ডিটেনশন। এত কথার অবতারণা যে কারণে সেটা বলছি..
মেহবুবা মুফতিকে আটকের পর আল জাজিরার মেহদী হাসানের শো’তে ভারতীয় একজন আইনজীবীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়৷ তিনি আশ্চর্য হচ্ছিলেন যে, কোনো রকমের চার্জ বা অভিযোগ ছাড়া একজনকে কীভাবে আটক করা যায়? ওই আইনজীবী তখন সংবিধান খুলে দেখান যে, এটা তাদের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রয়েছে৷ আপনি ভবিষ্যতে করতে পারেন এমন কোনো অপরাধের জন্য আপনাকে অগ্রিম গ্রেফতার করা যাবে। একই ধরনের আইন বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে রয়েছে। ৩৩ অনুচ্ছেদের শুরুটা হয় চমৎকার কিছু কথাবার্তা দ্বারা। যেমন কোনো ব্যক্তিকে গ্রাউন্ড বা কারণ জ্ঞাপন না করে গ্রেফতার করা যাবে না এবং তাকে তার পছন্দ মত আইনজীবীর সাথে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। আটককৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হাজির করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ব্যতীত ২৪ ঘণ্টার বেশি তাকে আটক রাখা যাবে না। এরপরেই রয়েছে আসল টুইস্ট। এইসব সুন্দর সুন্দর বিধান নিবর্তনমূলক আটকের ক্ষেত্রে খাটবে না। নিবর্তনমূলক আইনে কাউকে আটক করলে প্রথমত ৬ মাস তাকে আটক রাখা যাবে। এক্ষেত্রে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করারও দরকার নেই অথবা তাকে তার আইনজীবী দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দানেরও দরকার নেই৷ এরপর ৬ মাস অতিবাহিত হলে কী হবে? তখন একটি বোর্ড করতে হবে ৩ সদস্য বিশিষ্ট৷ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক বা বিচারক হবার যোগ্য এমন দুজন আর প্রজাতন্ত্রের সিনিয়র একজন কর্মচারীর সমন্বয়ে একটি বোর্ড হবে। সেই বোর্ড যদি অনুমতি দেয় তাহলে তাকে আজীবন আটক রাখলেও কোনো সমস্যা নেই। অথচ এই নিবর্তনমূলক আটক বাংলাদেশ সংবিধানের ৩২, ৩৩, ৩৫(৩) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার আইন যেমন সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার অনুচ্ছেদ ৯, ১০, ১১ এর লঙ্ঘন৷ এছাড়াও নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক কনভেনশন আইসিসিপিআরের ৯, ১০ এবং ১৪ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন৷ জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি (HRC) নির্বিচারে আটক বিরোধী ওয়ার্কিং গ্রুপ (WGAD) এ ধরণের আটককে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে নিবর্তনমূলক আটকের বিধান যোগ করা হয় ১৯৭৩ সালের ২য় সংশোধনীর মাধ্যমে। অর্থাৎ ৭২ এর মূল সংবিধানে নিবর্তনমূলক আটকের বিধান ছিল না৷ ১৯৭৩ সালে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। দেশে তখন নাশকতা, চোরাচালান, খাদ্যে ভেজাল, মজুদদারি, মুদ্রা জাল করার প্রবণতা বেড়ে যায়। এগুলো রোধ করার জন্য সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ প্রণয়ন করে। এই আইনের ৩ ধারায় সরকারকে নিবর্তনমূলক আটকের ক্ষমতা দেওয়া হয়। লক্ষণীয় বিষয় এই যে, কাউকে আটক করা একান্তই সরকারকে সন্তুষ্টির উপর নির্ভর করে। যেকোনো ক্ষমতাসীন সরকারের হাতে এমন অবাধ ক্ষমতা দিয়ে দিলে সেই সরকার বিরোধীমতকে দমন করতে এই ক্ষমতা ব্যবহার করে থাকে। এই আইন প্রণয়নের পর তাই হয়েছে৷ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন দেশে রাজনীতি করছে কম বেশি সবাইই এই আইনের ভুক্তভোগী। শুধু রাজনীতিবিদরাই না, সাধারণ মানুষ যারাই ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা করেছে তাদের অনেকেই এই আইনের ভুক্তভোগী। রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলে থাকাকালীন এই আইন বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে তাদের দেওয়া কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে এই আইনকেই তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করে।
উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, ১৯৯৬ নির্বাচনের আগে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তারা ক্ষমতায় আসলে এই বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল করবে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তা করেননি৷ এমনকি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে তারা আরেকধাপ এগিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তৈরি করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কুক্ষিগত করেছে। একই কথা খাটে বিএনপির বেলায়ও। তারাও ক্ষমতায় থাকাকালীন এই আইন বাতিল করতে পারতো কিন্তু করে নি৷ অথচ এই আইনের অপব্যবহার আদালতের দ্বারা স্বীকৃত।
উচ্চ আদালতের রায় আছে যে, কোনো রকমের গ্রাউন্ড বা কারণ জ্ঞাপন না করে এ ধরণের নিবর্তনমূলক আটক অসাংবিধানিক। আমরা স্বাধীন হয়েছি আজ থেকে ৫২ বছর আগে। ৫২ বছরে অনেক উত্থানপতন হয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে বার বার। কিন্তু আমরা কিছুতেই বলতে পারবো না যে, আমরা এখনো ১৯৭৩ এই পড়ে আছি। এটা ২০২৫ সাল। ১৯৭৩ এর অরাজক পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যে আইন তৈরি করা হয়েছিল, আজকের দিনে এই আইন থাকার কোনো মানে নেই। একজন মানুষ ভবিষ্যতে অপরাধ করবে তার জন্য আজকেই তার বিচার করতে বসা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন৷ এই আইন বাতিল করা উচিত। তবে যদি সরকার বাতিল করতে নাও চায় তাও এটার সংস্কার করা উচিত। যেমন ভারতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আইন ১৯৮০ এর আটকের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১২ মাস। বাংলাদেশও সংস্কার করে একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ রাখতে পারে। একজন মানুষকে বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের চিহ্ন বহন করে না।
লেখক: প্রভাষক, আইন বিভাগ, গণবিশ্ববিদ্যালয়
(মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন)
মন্তব্য করুন