বাংলাদেশ, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৩০ অক্টোবর ২০২৫, ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে দেশের ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ: যৌথ বিশ্লেষণ

ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং ১৬ লাখ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথ বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বুধবার (২৯ অক্টোবর) খাদ্য মন্ত্রণালয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার ও সেভ দ্য চিলড্রেনের সঙ্গে একত্রে বহুখাতীয় ও বহুপক্ষীয় এক কর্মশালার মাধ্যমে সর্বশেষ জাতীয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ফলাফল প্রকাশ করে।

২০২৪ সালে একই বিশ্লেষণে দেখা যায়, যে দেশে ২ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ উচ্চ মাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। সরকার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে ২০২৫ সালে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নিশ্চিত করতে আরও জোরদার পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।

ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) হলো একটি বৈশ্বিক মানদণ্ডভিত্তিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি, যা প্রমাণভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করে জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তার অবস্থা ৫টি ধাপে শ্রেণিবদ্ধ করে—মিনিমাল (ফেজ ১), স্ট্রেসড (ফেজ ২), ক্রাইসিস (ফেজ ৩), ইমার্জেন্সি (ফেজ ৪) এবং ক্যাটাস্ট্রোফি/দুর্ভিক্ষ (ফেজ ৫)।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পরিচালিত এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশের ৩৬টি জেলা ও রোহিঙ্গা শিবিরের মোট ৯ কোটি ৬ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশ অর্থাৎ ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ আইপিসি ফেজ ৩ বা তারও উচ্চ পর্যায়ে থাকবে বলে অনুমান করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৬১ হাজার মানুষ ইমার্জেন্সি (ফেজ ৪) অবস্থায় থাকবে এবং তাদের জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন হবে।

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি দেখা গেছে কক্সবাজারে—বিশেষত উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায়—যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ আইপিসি ফেজ ৩ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়াও সুনামগঞ্জ, বরগুনা, বান্দরবান, নোয়াখালী এবং সাতক্ষীরা জেলায় খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বেশি এবং এই এলাকাগুলোর প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ ফেজ ৩ পর্যায়ে শ্রেণিভুক্ত।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে কক্সবাজার ও ভাসানচরে প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯২ জন বিশ্লেষিত শরণার্থীদের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্রাইসিস বা ইমার্জেন্সি অবস্থায় রয়েছে।

জলবায়ুজনিত ধাক্কা বিশেষ করে ২০২৪ সালের বন্যা জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, পুনরুদ্ধার ধীর করেছে; বাজারে অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে; পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের চাহিদা বাড়লেও মানবিক সহায়তার তহবিল কমে গেছে। এসবই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

পুষ্টি পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ৬–৫৯ মাস বয়সী প্রায় ১৬ লাখ শিশু ২০২৫ জুড়ে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে বা ভুগতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৪ হাজার শিশুর অবস্থা মারাত্মক অপুষ্টি (এসএএম), যাদের জরুরি চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন। একই সময়ে প্রায় ১.৪ মিলিয়ন শিশু মাঝারি পর্যায়ের অপুষ্টিতে ভুগবে বলে পূর্বাভাস। এছাড়া ১ লাখ ১৭ হাজার গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীও তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছেন।

এটাই প্রথমবার বাংলাদেশে আইপিসি অ্যাকিউট মালনিউট্রিশন বিশ্লেষণ করা হলো, যা ৭টি বিভাগের ১৮টি বিপদাপন্ন জেলা এবং রোহিঙ্গাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাসুদুল হাসান বলেন, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছে এই সর্বশেষ আইপিসি বিশ্লেষণ। ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং ১৬ লাখের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।

তিনি আরও বলেন, আজকের এই কর্মশালা বিশ্লেষণের ফলাফল শুধু পর্যালোচনা করার জন্য নয়, বরং সেগুলোকে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার এই তথ্যকে নীতি প্রণয়নে ব্যবহার করবে এবং জাতিসংঘ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

বিশ্লেষণে যে সুপারিশগুলো উঠে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে জরুরি সহায়তা প্রদান, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য শক-রেসপন্সিভ সেফটি নেট সম্প্রসারণ, কৃষি ও পশুপালন খাতে জরুরি সহায়তা, বন্যাকবলিত এলাকায় জীবিকা পুনরুদ্ধারে সহায়তা ইত্যাদি।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের বলেন, আইপিসি বিশ্লেষণের ফলাফল বিশেষ করে গ্রামীণ ও উপকূলীয় সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগের কারণ, যাদের জীবিকা কৃষি ও মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি আরও বলেন, আমরা সবাই মিলে খাদ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে, পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়াতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করে যেতে চাই। দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে আমাদের দ্রুত ও সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি যেন কেউ পিছিয়ে না থাকে।

সরকারি সংস্থা, জাতিসংঘ, এনজিও এবং প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতার মাধ্যমে এই আইপিসি বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয়েছে। আজকের কর্মশালায় বিভিন্ন অংশীজন বিশ্লেষণের ফলাফল নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, নীতি সমন্বয় এবং জাতীয় পরিকল্পনায় ফলাফল প্রতিফলনের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জুলাইয়ে ‌‘শ্রেষ্ঠ ওসি’ নির্বাচিত হলেন কালিগঞ্জ থানার শহিদুল ইসলাম

কালিগঞ্জে আহছানিয়া ঘোজাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন

মোদির বাসভবনের সামনে থেকে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা আটক

রাত ১টার মধ্যে যেসব অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে প্রচণ্ড ঝড়

কয়রায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী উদযাপন

‘সবকিছু মনে রাখা হবে’, শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ অরিজিৎ সিং

‘কালই জমি দখল নেব, কত ক্ষমতা আছে ঠেকাস’

এনসিপির এক নেতাকে শোকজ, অন্যজনকে অব্যাহতি

নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবিতে বাসভবনের সামনে কংগ্রেস

তালা বাজার বণিক সমিতির সংবাদ সম্মেলন

১০

সব মামলায় জামিন পেলেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি

১১

শ্যামনগর উপজেলা ক্লাইমেট এ্যাকশন ফোরামের ত্রৈমাসিক সভা

১২

বেঁচে থাকার জন্য পলিথিনের খুঁপড়িই শেষ ভরসা প্রতিবন্ধী মা-মেয়ের

১৩

নলতায় উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে অতিরিক্ত ডিআইজি জয়নুদ্দীন

১৪

সাতক্ষীরায় রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী উৎসব

১৫

সরুলিয়ার ছোট কাশিপুরে অভিভাবক সভা

১৬

পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট না হলে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনতে পারেন প্রধানমন্ত্রী

১৭

এমপি গাজী নজরুলের ঘটনায় যা বলছে জামায়াত

১৮

গাজী নজরুলের আরেকটি ভিডিও ভাইরাল

১৯

জামায়াত এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’র ৭ দিন পরও স্ত্রীর বায়োডাটায় লেখা ‌‘আনম্যারিড’

২০
error: Content is protected !!