বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
২১ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১৫ এপ্রিল ২০২৬, ৭:৫৭ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে পঞ্চপাণ্ডবের ঘুষ বাণিজ্যে দিশেহারা জেলেরা!

বিলাল হোসেন: পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে পঞ্চপাণ্ডবের ঘুষ বাণিজ্যে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলেরা।

অনুসন্ধান বলছে, সুন্দরবনে প্রবেশ করতে দফায় দফায় ঘুষ দিতে হয় পাঁচ বন কর্মকর্তাকে।

এ যেন জলে কুমির ডাঙায় বাঘ।

একে তো বনদস্যুদের চাঁদা দিতে দিতে বনজীবীরা নিঃস্ব, তারপর বনবিভাগের ঘুষের চাহিদা মেটানো যেন ‌‘মরার উপর খাড়ার ঘা’।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই ঘুষ বাণিজ্যের সিন্ডিকেট চালান বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ ফজলুল হক, কোবাদক স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ আনিসুর রহমান, কৈখালী স্টেশন কর্মকর্তা শ্যামাপ্রসাদ ও কদমতলা স্টেশন কর্মকর্তা মনিরুল কবির।

জানা গেছে, সাতক্ষীরা রেঞ্জের চার স্টেশনেরও আওতায় ২৯শর মত বিএলসি আছে। এর মধ্য ১৫শ মাছ ও ১৪শ কাকড়া ধরার বিএলসি।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের কদমতলা স্টেশনের অধীনে মুন্সিগঞ্জ টহলফাড়ি, চুনকুড়ি টহল ফাঁড়ি, অভয়ারণ্যের নটাবেকী টহল ফাঁড়ি, হলদিবুনিয়া টহল ফাঁড়ি, কৈখালী স্টেশনের অধীনে টেংরাখালী টহল ফাড়ি, মরা গাং টহল ফাড়ি, অভয়ারণ্য কাছিকাটা টহল ফাঁড়ি, বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের অধীনে কলাগাছিয়া টহল ফাঁড়ি, পুষ্পকাটি টহল ফাঁড়ি, মান্দারবাড়িয়া টহল ফাঁড়ি ও কোবাদক স্টেশনের অধীনে কাটেশ্বর টহল ফাঁড়ি ও দোবেকী টহল ফাঁড়ি রয়েছে।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশনের আওতাধীন অভয়ারণ্য এলাকার মধ্যে মানিকচড়া, পান্তামারি, খাজুর দানা, ইলিশে মারি, পানির খাল, কামান দাঙ্গা, তালপটি, মাঠের খাল, তালতলী, জল ঘাটা, আশা শুনি, বেলা, কয়লা, বাহির মান্দারবাড়িয়া, চড়া মেঘনা, আঁকড়া গোনা, বালি ঝাকি, আঠারো বেকি, ডিঙ্গি মারি, বড়লক্ষী খালি ও হেতাল বুনিয়া এলাকায় জেলেদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মোটা অংকের টাকা ঘুষ নিয়ে জেলে বাওয়ালীদের সেখানে প্রবেশের সুযোগ করে দেন বনকর্মকর্তারা।

এজন্য বনবিভাগকে দফায় দফায় মোটা অংকের টাকা দিতে হয় তাদের।

টাকা না দিয়ে অভয়ারণ্যে প্রবেশ করলে সুনির্দিষ্ট বাহিনী দিয়ে তাদেরকে আটক করে আবার মোটা অংকের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে বন বিভাগের বিরুদ্ধে।

শ্যামনগরের গাবুরার রবিউল ইসলাম, নয়ন, কৈখালির বাবুলসহ একাধিক জেলে জানান, খোলা বনে মাছ কাঁকড়া না পাওয়ায় আমরা মহাজনদের টাকা পরিশোধ করতে পারছি না। প্রতিনিয়তে ঋণে জড়িয়ে পড়ছি। ঋণ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের অভয়ারণ্যে প্রবেশ করতে হয়। এজন্য বনদস্যুদের পাশাপাশি বন বিভাগকেও পর্যাপ্ত ঘুষ দিতে হয়। পাস নিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বন বিভাগের প্রতিটি অফিসে ঘুষের টাকা দিতে হয়। প্রতিগোণে মাছের নৌকা বাবদ ১৪ হাজারেরও বেশি টাকা বন বিভাগকে দিতে হয়। প্রতিগোনে যে মাছ পাওয়া যায়, তাতে অনেক সময় খরচ ওঠে না। কিন্তু বন বিভাগ এবং বনদস্যুদের টাকা পরিশোধ করে তারপরে সুন্দরবনের প্রবেশ করতে হয়।

তথ্য অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মোঃ মশিউর রহমান সাতক্ষীরা রেঞ্জে যোগদানের পর থেকে ঘুষ বাণিজ্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও আগেও ছিল ঘুষ বাণিজ্যের এই রেওয়াজ। কারণ এখানে জেলেরা অবৈধ সুবিধা পাওয়ার জন্যই ঘুষ দেয়। তবে, অভয়ারণ্যে প্রবেশ না করলেও ঘুষ থেকে মুক্তি মেলে না সাধারণ জেলেদেরও।

সূত্রগুলো বলছে, অভয়ারণ্যে প্রবেশ ও ফাঁস জাল ব্যবহারের জন্য প্রতি গোনে (১৫ দিন) ৮ হাজার টাকা, চরপাটা ১২ হাজার টাকা, খালপাটা ৫ হাজার টাকা, বরসি দোন ৬ হাজার টাকা ও কাঁকড়ার নৌকার জন্য ৫ হাজার টাকা করে দিতে হয় বন বিভাগের অফিসগুলোতে।

এর বাইরে প্রতিটি স্টেশন থেকে সুন্দরবন প্রবেশের পাস করার পরেও ডিউটি খরচের নামে অবৈধভাবে হাতিয়ে নেয়া হয় নৌকা প্রতি ৫শ টাকা। যে এলাকা দিয়ে অভয়ারণ্যে প্রবেশ করবে সেই এলাকার সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোকে লাইন খরচ দিতে হয় ১ হাজার টাকা করে। এসব টাকা সংশ্লিষ্ট টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তারা জেলেদের কাছ থেকে সরাসরি গ্রহণ করেন।

এই ঘুষ বাণিজ্যের বড় একটি অংশ সরাসরি রেঞ্জের হিসাব রক্ষক মেজবাহের হাত দিয়ে এসিএফ মোঃ মশিউর রহমানের পকেটে পৌঁছায়।

তথ্য অনুসন্ধান আরো জানা যায়, প্রতিটি স্টেশন থেকে এসিএফকে গোণপতি ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী টাকা দিতে না পারলে হয়রানি করা হয় বন বিভাগের সদস্যদেরও।

এছাড়া সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য চিংড়ি প্রতি কুইন্টাল ৫০০ টাকা, কাঁকড়া প্রতি কুইন্টাল ৭৫০ টাকা, সাদা মাছ প্রতি কুইন্টাল ৬৪০ টাকা, রূপচাঁদা, ভেটকি,পাঙ্গাস প্রতি কুইন্টাল ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং নৌকা থেকে মাছ ধরার জন্য জনপ্রতি ১৫ টাকা হারে সরকারকে রাজস্ব দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

কিন্তু জেলেরা জানান, বাস্তবে পাস সই করার সময় কাঁকড়ার পাসে মাথাপিছু ৩৯০ টাকা, চরপাটা পাসে ৩৯০ টাকা আর ফাঁস জালের পাসে মাথাপিছু ৮০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

এদিকে, নৌকা সুন্দরবনে প্রবেশের আগে দিনের বেলায় কঠোরভাবে তল্লাশি চালাতে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। যাতে চারু, বিষ বা কোনো বেআইনি সরঞ্জাম নৌকায় না থাকে। একই সময়ে প্রতিটি নৌকাকে করণীয় ও দণ্ডনীয় বিষয়ক হ্যান্ডবিল, পোস্টার সরবরাহ করতে হবে। কিন্তু অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এসব বিষয়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান বলেন, অভয়ারণ্যে কোন প্রকার মাছ এবং কাঁকড়ার নৌকা ঢোকার সুযোগ নেই। যদি কেউ টাকার বিনিময়ে নৌকা ঢোকার সুযোগ করে দেয়, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব। এছাড়া প্রতিটি স্টেশন থেকে টাকা নেয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘ডিসেম্বরেই মালয়েশিয়ায় বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর ফ্লাইট শুরু’

১

ডা. এম আর খানের ১০ম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত

২

৭ নভেম্বর দেশের সব পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি

৩

ঢাবিতে ভর্তি আবেদন শুরু ১১ নভেম্বর

৪

সাংবাদিকদের সঙ্গে কুশুলিয়ার জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী সিরাজুলের মতবিনিময়

৫

ভারতীয় ভিসা আবেদনে নতুন নির্দেশনা

৬

কালিগঞ্জে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন

৭

চুলে নজরকাড়া সাজ, পূর্ণিমা যেন অষ্টাদশী তরুণী!

৮

৭ নভেম্বরকে সামনে রেখে কালিগঞ্জে কৃষকদলের প্রস্তুতি সভা

৯

পারুলিয়ায় শিশু পাচার ও শোষণ প্রতিরোধে সভা

১০

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তায় সামরিক সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার

১১

এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন

১২

২৪ সিনেমার ১৯টিতে ফ্লপ পরীমনি, ৫টিতে গড়পড়তা

১৩

সাংবাদিকের ফোন কেড়েছেন, ট্রাইপড ভেঙেছেন পরীমনি

১৪

অতিরিক্ত সময়ে ২ গোল হজম করেও পাকিস্তানকে হারাল ভারত

১৫

শার্শায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন

১৬

দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাউশির জরুরি নির্দেশনা

১৭

শ্যামনগরে ‘লবণাক্ততা নিরসন এবং উপকূলীয় কৃষি অভিযোজন’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ

১৮

কপ-৩১-এ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নেবে বাংলাদেশ

১৯

শুরু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, সব ম্যাচ দেখা যাবে বিটিভিতে

২০