বাংলাদেশ, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৫ জুন ২০২৬, ৫:১২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

উপকূলের পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজন প্রকৃতিনির্ভর উদ্যোগ || এস এম জান্নাতুল নাঈম

প্রতি বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের গুরুত্ব নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোও আজ নানা পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা, দাকোপ, মোংলা ও কক্সবাজারের মতো উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীর বেড়িবাঁধ ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং নিরাপদ পানির সংকট মানুষের জীবন-জীবিকাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আমাদের পরিবেশ রক্ষায় নতুন করে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি উপলক্ষ।

উপকূলের পরিবেশ রক্ষার কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে সুন্দরবনের কথা। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগের সময় সুন্দরবন ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই সুন্দরবন ও উপকূলীয় বনাঞ্চল রক্ষা করা মানেই উপকূলের মানুষকে রক্ষা করা।

তবে পরিবেশ সংরক্ষণ বলতে শুধু নতুন করে গাছ লাগানোকে বোঝালে চলবে না। প্রকৃতির নিজস্ব পুনর্জন্ম প্রক্রিয়াকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শ্যামনগরসহ সুন্দরবন সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন জেগে ওঠা চরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া চলমান ছিল। সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের ফল ও বীজ, জেগে ওঠা চরে জমা হয়ে স্বাভাবিকভাবেই নতুন ম্যানগ্রোভ বন জন্ম দিতো। একই সঙ্গে এসব এলাকায় পশুপাখির অবাধ বিচরণ, বীজ বিস্তার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের বিকাশ ঘটতো। প্রকৃতি নিজেই সেখানে নতুন জীবনের ভিত্তি তৈরি করতো।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বনায়নের নামে অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে, যেখানে স্থানীয় পরিবেশ ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার চেয়ে প্রকল্পের লক্ষ্য ও সংখ্যাগত অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক চরাঞ্চলে বাইরের এলাকা থেকে আনা চারা রোপণ করা হচ্ছে, চারপাশে বেড়া দেওয়া হচ্ছে এবং প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় পশুপাখির স্বাভাবিক বিচরণ কমে যাচ্ছে, প্রাকৃতিকভাবে বীজ বিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা বীজ ও ফলের মাধ্যমে স্বাভাবিক বন গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে। পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা হতে হবে স্থানীয় প্রতিবেশ ও প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

উপকূলীয় পরিবেশ সংরক্ষণে তাই প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেখানে প্রকৃতি নিজেই পুনরুদ্ধার হওয়ার ক্ষমতা রাখে, সেখানে সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা উচিত, প্রতিস্থাপন নয়। স্থানীয় প্রজাতির সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক পুনর্জন্মকে উৎসাহ দেওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর হতে পারে।

একই সঙ্গে উপকূলের নদী, খাল ও জলাশয় রক্ষা করাও জরুরি। নদী দখল, দূষণ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে অনেক প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ বাড়াতে হবে।

প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যও উপকূলের জন্য একটি বড় হুমকি। নদী, খাল, চরাঞ্চল ও বনাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য শুধু পরিবেশ দূষণই নয়, জলজ প্রাণী ও বন্যপ্রাণীর জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানোর বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

উপকূলের পরিবেশ রক্ষার সংগ্রামে তরুণদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, পরিবেশ শিক্ষা, জলবায়ু সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পরিবেশ পর্যবেক্ষণের মতো কার্যক্রমে তরুণদের সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতের জন্য আশার বার্তা দেয়। কারণ একটি সচেতন প্রজন্মই পারে পরিবেশ ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক উপকূলের পরিবেশ রক্ষায় শুধু প্রকল্প নয়, প্রয়োজন প্রকৃতিকে বোঝা। প্রকৃতির নিজস্ব পুনর্জন্ম ক্ষমতাকে সম্মান করা, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করাই হতে পারে টেকসই উপকূল গঠনের সবচেয়ে কার্যকর পথ। উপকূল বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, সুন্দরবন বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, আর মানুষ বাঁচলেই টিকে থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ।

এস এম জান্নাতুল নাঈম, পরিবেশ কর্মী

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জুলাইয়ে ‌‘শ্রেষ্ঠ ওসি’ নির্বাচিত হলেন কালিগঞ্জ থানার শহিদুল ইসলাম

কালিগঞ্জে আহছানিয়া ঘোজাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন

মোদির বাসভবনের সামনে থেকে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা আটক

রাত ১টার মধ্যে যেসব অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে প্রচণ্ড ঝড়

কয়রায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী উদযাপন

‘সবকিছু মনে রাখা হবে’, শিক্ষার্থী বিক্ষোভে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ অরিজিৎ সিং

‘কালই জমি দখল নেব, কত ক্ষমতা আছে ঠেকাস’

এনসিপির এক নেতাকে শোকজ, অন্যজনকে অব্যাহতি

নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবিতে বাসভবনের সামনে কংগ্রেস

তালা বাজার বণিক সমিতির সংবাদ সম্মেলন

১০

সব মামলায় জামিন পেলেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি

১১

শ্যামনগর উপজেলা ক্লাইমেট এ্যাকশন ফোরামের ত্রৈমাসিক সভা

১২

বেঁচে থাকার জন্য পলিথিনের খুঁপড়িই শেষ ভরসা প্রতিবন্ধী মা-মেয়ের

১৩

নলতায় উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে অতিরিক্ত ডিআইজি জয়নুদ্দীন

১৪

সাতক্ষীরায় রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী উৎসব

১৫

সরুলিয়ার ছোট কাশিপুরে অভিভাবক সভা

১৬

পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট না হলে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনতে পারেন প্রধানমন্ত্রী

১৭

এমপি গাজী নজরুলের ঘটনায় যা বলছে জামায়াত

১৮

গাজী নজরুলের আরেকটি ভিডিও ভাইরাল

১৯

জামায়াত এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’র ৭ দিন পরও স্ত্রীর বায়োডাটায় লেখা ‌‘আনম্যারিড’

২০
error: Content is protected !!