
উপকূলীয় প্রতিনিধি: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গা-ঢাকা দেওয়া এবং পরবর্তীতে ভদ্রবেশে ফিরে এসে এলাকাকে মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত করা কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও সাবেক যুবলীগ নেতা মোঃ আব্দুল্লাহ দুই সহযোগীসহ মঙ্গলবার কোস্টগার্ডের হাতে ধরা পড়েছেন।
এরপর মুখ খুলতে শুরু করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক সময় মুন্সিগঞ্জ বাজারের টোকাই হিসেবে পরিচিত ছিল মুন্সিগঞ্জ বাজারের বাসিন্দা মোহাম্মদ আফসার উদ্দিনের ছেলে আব্দুল্লাহ।
ধীরে ধীরে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে সে। নৈশকালীন চুরি, দোকানের তালা কেটে মালামাল লুট ও পকেটমারা ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সে ছাত্রলীগ নেতা বনে যায়।
সাবেক সংসদ সদস্য জগলুল হায়দারের ছেলের প্রশ্রয়ে রাজনীতিতে উত্থান ঘটে তার। এরপর ক্ষমতার প্রভাব যত বেড়েছে, আব্দুল্লাহর অপরাধের ডালপালাও তত বিস্তৃত হয়েছে। ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে সে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি পদ বাগিয়ে নেয়। পরে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে নিয়মিত চাঁদাবাজি, ক্ষমতার দাপটে টেন্ডারবাজি, অন্যের সম্পত্তি দখল এবং বাসস্ট্যান্ড এলাকাকে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল তার মূল কাজ। এই বিশাল অপরাধ জগত গড়ে তোলার পাশাপাশি আব্দুল্লাহ নিজে যেমন ঘোর মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তেমনি পুরো এলাকায় গড়ে তোলে এক সুসংগঠিত মাদক সিন্ডিকেট।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একসময় যে ছেলেটা বাসস্ট্যান্ডে মানুষের পকেট কাটত আর রাতে চাল-ডাল চুরি করত, রাজনীতির নাম ভাঙিয়ে সে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেল।
তার ক্যাডার বাহিনীর অত্যাচারে এলাকার নিরীহ মানুষ দীর্ঘদিন মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি। ৫ই আগস্টের পর সে পালিয়ে গেলে আমরা ভেবেছিলাম শান্তি ফিরে আসবে, কিন্তু সে আবার ছদ্মবেশে ফিরে এসে একই কাজ শুরু করে।
বাসস্ট্যান্ড এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আব্দুল্লাহর কাছে আমাদের জিম্মি হয়ে থাকতে হতো। চাঁদা না দিলে দোকানে তালা লাগিয়ে দিত কিংবা রাতের আঁধারে চুরি করার ভয় দেখাত। কত দোকানদার যে তার হুমকিতে নিঃস্ব হয়ে গেছে তার ঠিক নেই। প্রশাসনের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, এই অত্যাচারীর যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে আব্দুল্লাহর ক্ষমতার দাপট তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। গণরোষ থেকে বাঁচতে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে সে এলাকা থেকে গা-ঢাকা দেয় এবং বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে থাকে। তবে পরিস্থিতির কিছুটা স্থবিরতার সুযোগ নিয়ে সে পুনরায় এলাকায় ফিরে আসে। এবার তার কৌশল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন; নিজেকে আড়াল করতে সে পরিধান করে ভদ্র পোশাকের ছদ্মবেশ।
অপরাধ ধামাচাপা দিতে নিজেকে সাধু সাজিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে সে শুরু করে তার পুরানো মাদকের কারবার।
ভদ্রলোকের মুখোশ পরে এলাকায় এক ভয়াবহ মাদকের জাল বিছিয়ে দেয়। মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকায় অবাধে ছড়িয়ে দিতে থাকে বিষাক্ত ইয়াবাসহ হরেক রকমের মাদকদ্রব্য।
স্থানীয় আজগার আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ভদ্র পোশাকের আড়ালে সে তরুণদের হাতে ইয়াবা তুলে দিয়ে হাজারো পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমার একমাত্র সন্তান নেশায় আসক্ত হয়ে বাড়ি খুবই অত্যাচার করে। এরকম কত শত যুবকের জীবন যে সে নষ্ট করেছে তার হিসাব নেই। ওকে গ্রেপ্তার করায় আমরা কোস্টগার্ডের প্রতি কৃতজ্ঞ।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, শ্যামনগরের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে মোঃ আব্দুল্লাহসহ তার দুই সহযোগীকে প্রশাসন আটক করতে সক্ষম হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে মাদক ব্যবসায়ী জড়িত থাকা অনেকের নাম পাওয়া গেছে। তাদেরকে ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য করুন