বাংলাদেশ, শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৮ আগস্ট ২০২৬, ৮:০২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

প্লাস্টিকের পানির ট্যাংক বিতরণ, কতটা টেকসই সমাধান? || এস এম জান্নাতুল নাঈম

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। লবণাক্ততার বিস্তার, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালীসহ উপকূলের লাখো মানুষ বছরের একটি বড় সময় নিরাপদ পানির সংকটে ভোগেন। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার, বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য উপকূলের বিভিন্ন পরিবারের মাঝে প্লাস্টিকের পানির ট্যাংক বিতরণ করে আসছে। প্রতিবছর সহস্রাধিক ড্রাম বিতরণের মাধ্যমে অসংখ্য পরিবার বর্ষাকালের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুযোগ পাচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি জনবান্ধব উদ্যোগ। তবে একটি প্রশ্ন এখন সময়ের দাবি, এই হাজার হাজার প্লাস্টিকের ট্যাংক ব্যবহারের পর কোথায় যাবে? কবেই বা মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে?

শুধু ট্যাংক বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যে পাত্রে মানুষ দীর্ঘদিন পানীয় পানি সংরক্ষণ করছে, সেটি ফুড-গ্রেড বা পানি সংরক্ষণের উপযোগী কি না, তার উপাদান ও মান কী, কতদিন নিরাপদভাবে ব্যবহার করা যাবে এবং কীভাবে এর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে এসব তথ্যও উপকারভোগীদের জানানো জরুরি। ড্রামের গায়ে বা সরবরাহের সঙ্গে এসব তথ্য, ব্যবহারবিধি ও রক্ষণাবেক্ষণ নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু কোথাও উল্লেখ নেই এবং এসব তথ্য জানানো হয় না উপকারভোগীদের।

সাধারণত ১০-১৫ বছর ড্রামগুলোর স্বকীয়তা বজায় থাকে। মূলত একটি প্লাস্টিকের ট্যাংকের কার্যকর আয়ুষ্কাল নির্ভর করে এর উপাদান, নির্মাণমান, ব্যবহার এবং সংরক্ষণের পরিবেশের ওপর। উপকূলের লবণাক্ত পরিবেশ, তীব্র রোদ এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারে প্লাস্টিকের ট্যাংক একসময় ফেটে যায় বা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাই নির্দিষ্ট মেয়াদ বা ব্যবহারের উপযোগিতা সম্পর্কে নির্মাতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার করা, ঢাকনা ঠিকভাবে বন্ধ রাখা, অতিরিক্ত রোদ থেকে সম্ভব হলে সুরক্ষিত রাখা এবং ড্রামের ভেতরে ময়লা, শেওলা বা অন্য কোনো দূষণ দেখা দিলে যথাযথভাবে পরিষ্কার করা জরুরি। গ্রামে লক্ষ্য করা যায়, তারা ড্রামের পানি দীর্ঘদিন ধরে পান করেন, এই পানিতে ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়, সমাধান হিসাবে তারা ফিটকিরি ব্যবহার করে পানি পান করে থাকেন। এই প্রক্রিয়াটাও সঠিক কি না? তা জানানো জরুরী।

এসব ট্যাংক সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদভাবে অপসারণের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক ট্যাংক খোলা জায়গায় পড়ে থাকে, খাল-নদীতে নিক্ষেপ করা হয় অথবা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জলজ জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। জলবায়ু অভিযোজনের একটি উদ্যোগ যেন ভবিষ্যতে নতুন দূষণের কারণ না হয়, সে বিষয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে।

সমাধান হিসেবে কেবল প্লাস্টিকের ড্রাম বিতরণই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও প্রকৃতিনির্ভর পরিকল্পনা ও সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ উদ্যোগ।

প্রথমত, উপকূলের সরকারি পুকুরগুলো দখলমুক্ত করে পুনঃখননের মাধ্যমে কমিউনিটিভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জলাধার গড়ে তোলা যেতে পারে। অনেক সরকারি পুকুর বর্তমানে লিজ, দখল কিংবা অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আছে। এসব জলাশয় সংস্কার করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উপযোগী করা গেলে একটি গ্রামের শত শত পরিবার দীর্ঘ সময় নিরাপদ পানির সুবিধা পাবে। এটি হবে পরিবেশবান্ধব, কম ব্যয়বহুল এবং বহু বছর ব্যবহারযোগ্য একটি সমাধান।

দ্বিতীয়ত, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পরবর্তী সময়ে শ্যামনগরসহ উপকূলীয় এলাকায় সরকার, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে সহস্রাধিক পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) নির্মাণ করা হয়েছিল। একসময় এসব পিএসএফ নিরাপদ পানির নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে এর বড় একটি অংশ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সামান্য সংস্কার, ফিল্টার, ওয়াশার পরিবর্তন, বালু পরিবর্তন এবং স্থানীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এসব পিএসএফ আবারও সচল করা সম্ভব। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান সম্পদের পুনর্ব্যবহার হবে অনেক বেশি ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং টেকসই উদ্যোগ।

তৃতীয়ত, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা মাটির তৈরি পানি সংরক্ষণের পাত্র বা ‘মেটে আবারও ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে। একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মাটির মেটে ছিল, যাতে পানি স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা ও নিরাপদ থাকতো। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে আধুনিক নকশায় বড় আকারের মাটির পানি সংরক্ষণ পাত্র তৈরি ও বিতরণ করা হলে একদিকে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় কুমাের সম্প্রদায়ের কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে। ব্যবহারের শেষে এসব পাত্র পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না, যা টেকসই অভিযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।

এর পাশাপাশি প্লাস্টিকের ট্যাংক বিতরণের ক্ষেত্রে ফেরত ও গ্রহণ করার ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। নতুন ট্যাংক বিতরণের সময় পুরোনো ও অকার্যকর ট্যাংক সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহারের আওতায় আনা গেলে প্লাস্টিক বর্জ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

অভিযোজন প্রকল্পে কেবল উপকরণ বিতরণ নয়, সেই উপকরণের পুরো জীবনচক্রের ব্যবস্থাপনাও পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।

উপকূলের মানুষের প্রয়োজন সাময়িক সহায়তা নয়, বরং এমন সমাধান যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিরাপদ পানি নিশ্চিত করবে এবং একই সঙ্গে পরিবেশও রক্ষা করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে তাই শুধু প্লাস্টিকের ট্যাংক বিতরণের সংখ্যা বাড়ানো নয়, প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ টেকসই পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। কারণ নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন পরিবেশগত সংকট তৈরি না হয়, সেটা এখন থেকেই ভাবতে হবে।

লেখক: পরিবেশ কর্মী

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ছাগল নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল বৃদ্ধের

এরতেজা হাসানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথম স্পিনার হিসেবে রশিদের ৬ উইকেটের ‘হ্যাটট্রিক’

শিশু রায়য়ানের পাশে দাড়ালেন আলফা, অন্যদেরও এগিয়ে আসার আহবান

প্লাস্টিকের পানির ট্যাংক বিতরণ, কতটা টেকসই সমাধান? || এস এম জান্নাতুল নাঈম

বেনাপোল ইমিগ্রেশন পরিদর্শনে এসবি প্রধান সরদার নুরুল আমিন

ঈশ্বরীপুরে ৫০ হাজার দেশীয় বীজ রোপণ

গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারে পাইলসের অপারেশনের প্রস্তুতি, ইনজেকশনের পর রোগীর মৃত্যু

লিওনেল মেসির বাবা আর নেই

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ সোমবার সকাল ১০টায়, যেভাবে জানা যাবে

১০

‘হাসিনা কার্ড’ খেলবেন, আবার বন্ধুত্বও চাইবেন—এভাবে সম্পর্ক হয় না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১১

‘আমি তাদের হাতেনাতে ধরেছিলাম’, দুই প্রাক্তন স্বামীকে নিয়ে শ্বেতা

১২

তিন কারিগরের হাতে চার মাসে বোনা জামদানিতে জয়া আহসান

১৩

মালয়েশিয়াকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ৮৯ রানের জয় এইচপির

১৪

সরকারি কর্মচারীদের বেতন-গ্রেড নিয়ে নতুন বার্তা

১৫

তালায় ঘাস কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে একজনের মৃত্যু

১৬

নিশ্চিত হাম ও উপসর্গে আরও চারজনের মৃত্যু

১৭

চিঠি নিয়ে হাতেনাতে ধরা, কী করেছিলেন সাই পল্লবীর বাবা-মা?

১৮

তনু হত্যায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর ফের গ্রেপ্তার

১৯

৬ বছরে দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ১৫৭১২

২০
error: Content is protected !!