
শ্যামনগর প্রতিনিধি: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, উপকূলীয় প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বাড়াতে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান (এনবিএস) নিয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সুইডেন দূতাবাসের অর্থায়নে সিএনআরএসের নেতৃত্বে আইইউসিএন, বেলা, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, সিডিও ও প্রেরণার অংশীদারত্বে বাস্তবায়নাধীন বিফরআরএল প্রকল্পের আওতায় আইইউসিএন বাংলাদেশ এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। সোম ও মঙ্গলবার (২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর) শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জের লিডার্সের হলরুমে প্রশিক্ষণটি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশিক্ষণে শ্যামনগর পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা মৎস্য অফিস, উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, কৃষি অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ, সাংবাদিক ও সিডিওর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কণক।
প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের ধারণা ও ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়ানো। পাশাপাশি এনবিএস কীভাবে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, পর্যেবক্ষণ, যোগাযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে সক্ষমতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দুই দিনের প্রশিক্ষণে জলবায়ু ঝুঁকি, প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানের ধরন ও প্রয়োগের মানদণ্ড, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন, জলবায়ু বিপন্নতা ও ঝুঁকি নিরূপণ, প্রশমন, সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, যোগাযোগ, জেন্ডার-অন্তর্ভুক্তিমূলক এনবিএস, মনিটরিং ও ইন্টিগ্রেশন নিয়ে আলোচনা হয়। বিভিন্ন বিষয়ে দলীয় কাজ ও ব্যবহারিক অনুশীলনও করা হয়।
সেশনে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন আইইউসিএনের পরামর্শক মোঃ আনিসুর রহমান, প্রোগ্রাম অফিসার মোঃ তারেক আজিজ ও প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট ইসরাত জাহান ইমা, সিডিওর নির্বাহী পরিচালক গাজী ইমরাম, সিএনআরএসের সাইট অফিসার তৌহিদ হাসান এবং ডকুমেন্টেশন ও রিপোর্টিং অফিসার মেহজাবিন মৌ।
মাঠে গিয়ে এনবিএসের প্রয়োগ দেখা
প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় দিনে অংশগ্রহণকারীদের শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনীর চুনা ম্যানগ্রোভ বনায়ন এবং রমজাননগরের মানিকখালী খাল পুনঃখনন কার্যক্রম পরিদর্শনে নেওয়া হয়।
চুনা ম্যানগ্রোভ বনায়ন পরিদর্শনের সময় অংশগ্রহণকারীরা উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা নেন।
অন্যদিকে মানিকখালী খাল পুনঃখনন কার্যক্রম পরিদর্শনের মাধ্যমে খালের পানি প্রবাহ, জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও স্থানীয় জীবিকার সঙ্গে পানি ও জলাভূমি ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক সরাসরি পর্যেবক্ষণ করেন তাঁরা।
প্রশিক্ষণে আলোচনায় উঠে আসে, শ্যামনগরের মতো উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস, জোয়ারের পানি, লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা মানুষের জীবন-জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকৃতি-ভিত্তিক কোনো উদ্যোগকে শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের কর্মসূচি হিসেবে না দেখে পানি, কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবিকার পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
এ সময় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নারী, পুরুষ, বয়স্ক, প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ঝুঁকি ও প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের বিষয়েও আলোচনা হয়।
আয়োজকেরা বলেন, উপকূলীয় এলাকায় প্রকৃতি-ভিত্তিক উদ্যোগকে কার্যকর ও টেকসই করতে পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। স্থানীয় জ্ঞান ও অংশগ্রহণের সঙ্গে ম্যানগ্রোভ পুনঃস্থাপন, খাল পুনরুদ্ধার ও জলবায়ু-স্মার্ট কৃষির মতো উদ্যোগ যুক্ত করা গেলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মন্তব্য করুন