
শ্যামনগর প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খোলপেটুয়া নদীর অবৈধ দখল, দূষণ ও নাব্যতার পরিস্থিতি দেখতে সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মকসুমুল হাকিম চৌধুরী।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে তিনি আটুলিয়া ইউনিয়নের নওয়াবেঁকি বাজার ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের পোড়াকাটলা এলাকার দুটি পয়েন্ট পরিদর্শন করেন।
শ্যামনগরের খোলপেটুয়া, কপোতাক্ষ, আদি যমুনা ও মাদার নদীসহ অসংখ্য নদী-খাল দখল করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নানা কাজে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শ্যামনগর পৌরশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। নদী দখল ও নাব্যতা সংকট নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জেলা প্রশাসনের তথ্যের ভিত্তিতেই খোলপেটুয়া নদীর দুটি পয়েন্ট পরিদর্শন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পরিদর্শনকালে চেয়ারম্যানের সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন কমিশনের উপপরিচালক (উপসচিব) আবদুল্লাহ আল জাকী, সহকারী পরিচালক (গবেষণা ও পরিকল্পনা) মোঃ আশরাফুল হক এবং সহকারী প্রধান (পানি প্রকৌশল) আহমাদ শামস কাদির।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সহকারী পরিচালক (গবেষণা ও পরিকল্পনা) মোঃ আশরাফুল হক বলেন, আমরা মূলত খোলপেটুয়া নদী পরিদর্শন করেছি। আটুলিয়ার নওয়াবেঁকি বাজার ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের পোড়াকাটলা এলাকার অবৈধ দখলের বিষয়গুলোও দেখেছি।
তিনি বলেন, পরিদর্শনের সময় শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নদী রক্ষায় তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
খোলপেটুয়া নদী শ্যামনগরের উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নদীটির বিভিন্ন অংশে অবৈধ দখল, ভরাট, নাব্যতা সংকট, দূষণ ও পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে নদীর সংকটের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়ও উঠে এসেছে।
এদিকে, নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের গুরুত্বপূর্ণ এই পরিদর্শনের বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে প্রশ্ন ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, সরজমিনে পরিদর্শনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা জানা। সে ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত সংবাদ, সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের তথ্য পরিদর্শনকারী দলের জন্য সহায়ক হতে পারে।
নদীর পাড়ের কয়েকজন বাসিন্দাও বিষয়টিকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন। তাঁরা বলেন, খোলপেটুয়া নদীর দখল, নাব্যতা সংকট ও পানিপ্রবাহের সমস্যাগুলো তাঁদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। সাংবাদিকেরা এসব নিয়ে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করেছেন। কমিশনের কর্মকর্তারা স্থানীয় সাংবাদিক ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বললে নদীর সমস্যাগুলো আরও বিস্তারিতভাবে জানতে পারতেন।
আটুলিয়ার নওয়াবেঁকি খেয়াঘাট ও বাজার এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেছেন, নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বা এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সফর করেছেন এমন ঘটনা আমাদের চোখে পড়েনি। এছাড়াও নদীর সমস্যাগুলো আমরা প্রতিদিন চোখের সামনে দেখি। সাংবাদিকেরা এসব নিয়ে লেখালেখি করেন। কমিশনের কর্মকর্তারা যদি আমাদের বা তাঁদের (স্থানীয় সাংবাদিকদের) সঙ্গে কথা বলতেন, তাহলে নদীর সমস্যাগুলো আরও বিস্তারিতভাবে জানতে পারতেন।
তবে স্থানীয় সাংবাদিকদের অবহিত না করার বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বা তাঁর সফর সঙ্গীদের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কমিশনের এই পরিদর্শন যেন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। খোলপেটুয়া নদীর অবৈধ দখল ও নাব্যতা সংকটের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা এবং নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে- এমনটাই প্রত্যাশা তাঁদের।
খোলপেটুয়া নদী সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দা,ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকদের না জানিয়ে পরিদর্শনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এখন স্থানীয়দের নজর কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। পরিদর্শনের ভিত্তিতে খোলপেটুয়া নদী রক্ষায় কী সুপারিশ করা হয় এবং সেই সুপারিশ মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন