বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:২৫ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

হাঁটু পানিতে ডুবে আছে গ্রাম!

সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: গ্রামজুড়ে পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে রয়েছে।

কোথাও হাঁটু সমান পানি, কোথাও আবার পানির মধ্যে সড়কের অস্তিত্বই বোঝা যাচ্ছে না। বাড়ির উঠানেও থইথই করছে পানি। পানিতে ডুবে আছে এলাকার অধিকাংশ কবর। এমন পরিস্থিতিতে ঘর থেকে বের হওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে স্থানীয়দের।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আবাদচন্ডিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৩৭ নম্বর আবাদচন্ডিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকা থেকে মির্জাপাড়া পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক ও ওই গ্রামের পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ির চিত্র এমনই। কয়েক দিনের জলাবদ্ধতায় সড়কটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েকটি গ্রামের মানুষ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ চলাচল করেন। কিন্তু বর্তমানে সড়কের ওপর হাঁটুসমান পানি থাকায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন। পানির কারণে বাড়ি থেকে বের হওয়া, বাজার করা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে কোথাও যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

শুধু চলাচলেই নয়, জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। বাড়ির উঠানে পানি জমে থাকায় রান্নাবান্না, খাবার পানি সংগ্রহ, কাপড় ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালির কাজেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পরিবারগুলো।

স্থানীয়দের আরও একটি বড় উদ্বেগ কবরস্থান নিয়ে। এলাকার প্রায় সব কবরই পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক কবরের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাড়ির উঠানে পানি, রাস্তায় পানি, কবরস্থানেও পানি। এভাবে আর কত দিন চলতে হবে? এলাকায় এখন কেউ মারা গেলে তাঁকে দাফন করার জন্য কবর খুঁড়ব কোথায়- সেটাও জানি না।

মুজিবর সরদার, নজরুল ইসলাম বাবু, আজিবর রহমান ও সাইফুল ইসলামসহ কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে মৎস্যঘের গড়ে তোলা এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে অপরিকল্পিতভাবে ঘের করায় পানি বের হতে পারছে না বলে তাঁদের দাবি। সামান্য বৃষ্টিতেই ওই এলাকাজুড়ে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

তাঁদের ভাষ্য, গত বছরগুলোতে এ ধরনের জলাবদ্ধতার সমস্যা তীব্র না হলেও চলতি বছর স্থানীয় প্রভাবশালীদের অপরিকল্পিতভাবে মৎস্যঘের করার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সড়কটি সংস্কার ও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার দাবি জানানো হলেও এখনো এর কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

মিজানুর রহমান, আবুল হোসেন তরফদার ও হাসান সরদারসহ স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে গ্রামটিতে বসবাস উপযোগী ও আবাদচন্ডিপুর মির্জাপাড়া সড়ক চলাচলের উপযোগী করার পাশাপাশি জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রশ্ন, মানুষের চলাচলের রাস্তা, বসতভিটা এমনকি কবরস্থান- সবই যদি পানির নিচে থাকে, তাহলে এলাকার উন্নয়ন বলব কি করে?

আবাদচন্ডিপুর গ্রামের গৃহবধূ নাছিমা বেগম বলেন, ঘরের চারপাশে পানি জমে থাকায় বাড়িতে রান্না করার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। চুলার জায়গাটিও পানিতে তলিয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে দূরে অন্যের বাড়িতে গিয়ে রান্না করে সেই খাবার টেনে বাড়িতে এনে পরিবারের সদস্যদের খাওয়াতে হচ্ছে। এভাবে প্রতিদিন সংসার চালানো খুব কষ্টের হয়ে পড়েছে।

সিয়াম হোসেন, মাহিম, সুরাইয়া ও মাহিসহ স্কুল পড়ুয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, বাড়ির উঠানে পানি, ঘরের মধ্যে পানি উঠবো উঠবো অবস্থা। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তাজুড়ে হাঁটুসমান পানি থাকায় প্রতিদিনই তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পানির মধ্যে জামাকাপড় ও বই-খাতা ভিজিয়ে স্কুলে যেতে হয়। পানি বেশি থাকলে অনেক সময় অভিভাবকেরা তাদের স্কুলে পাঠাতেও চান না। তারা বলে, আমরা নিয়মিত স্কুলে যেতে ও পড়াশোনা করতে চাই। কিন্তু বাড়ি ঘরসহ চলার পথে পানি থাকায় অনেক সময় স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয় না। দ্রুত পানি সারানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।

অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, আমি একটি মামলায় কয়েক দিন সাতক্ষীরা কারাগারে ছিলাম। ওই সময় ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা এখনো প্রত্যাহার হয়নি। এরপরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি জেনে আমাকে ফোন করেছিলেন। পরে পরিষদের সচিব ও চৌকিদারকে সেখানে পাঠিয়ে পরিস্থিতি পর্যেবক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে আমার একটি মৎস্য প্রকল্প রয়েছে। ওই প্রকল্পের কারণে যদি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে আমি তা সমাধান করে দেওয়ার কথা জানিয়েছি। পানি নিষ্কাশনের জন্য আমার জায়গা দিয়ে প্রায় ২০০ ফুট পাইপ বসাতে হবে। পাইপ কেনা হয়েছে, আগামীকালই তা স্থাপন করা হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক বলেন, বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হ্যাটট্রিকসহ ৫ রানে ৭ উইকেট নিয়ে ইতিহাস গড়লেন লঙ্কান অধিনায়ক

নলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬৮ কৃতি শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা

মেকআপ রুমে লিপস্টিক হাতে জয়া, মুগ্ধ নেটদুনিয়া

গাজী নজরুলের নাম দেখে স্পিকার বললেন ‘জিএম তো নাই’, সংসদে হাসির রোল

পাইকগাছায় প্রাতিষ্ঠানিক জলাশয়ে মাছের পোনা অবমুক্ত

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট: ৭০ হাজার থেকে এক লাফে দেড় লাখ হচ্ছে ম্যাচ ফি

উল্টোপথে মন্ত্রীর গাড়ি, দুই মামলায় ৬ হাজার টাকা জরিমানা

হাঁটু পানিতে ডুবে আছে গ্রাম!

কয়রায় ৪শ পরিবারের মাঝে পানির ট্যাংক বিতরণ

শ্যামনগরে সন্তানের অত্যাচার থেকে বাঁচতে থানায় বাবার অভিযোগ

১০

২০২৭ সালে বিশ্ব ইজতেমা দুই পর্বে, তারিখ ঘোষণা

১১

সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জে ‘ঘুষের হাট’, ২ লাখ রাজস্ব আদায়ে ঘুষ ২৩ লাখ

১২

সাতক্ষীরায় তিনটি অস্ত্র ও ১১ রাউন্ড গুলিসহ যুবক আটক

১৩

সব নাগরিকের জন্য আসছে ‘এক-আইডি’, পাওয়া যাবে স্বাস্থ্য–শিক্ষাসহ সব সেবা

১৪

সুন্দরবনের কোলে দ্য এডিটরস’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

১৫

বিডিএফ প্রেসক্লাবে দ্য এডিটরস’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

১৬

তালতলা থেকে কোহিনুরের ম-র-দেহ উদ্ধারের পেছনে অনেক গল্প

১৭

এশিয়ান গেমসে লিটনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল ঘোষণা

১৮

তালায় জলবায়ু অভিযোজন নেটওয়ার্কের অর্ধবার্ষিক সভা

১৯

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

২০
error: Content is protected !!